সিলেটের কৃষিপণ্য রপ্তানিতে নতুন দুয়ার, ৩৮৭ কোটি টাকার প্যাকিং হাউজ-কোল্ডস্টোরেজের উদ্যোগ
মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২১ AM

সিলেটের কৃষিপণ্য রপ্তানিতে নতুন দুয়ার, ৩৮৭ কোটি টাকার প্যাকিং হাউজ-কোল্ডস্টোরেজের উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৬/১০/২০২৬ ১০:২৩:৫৮ AM

সিলেটের কৃষিপণ্য রপ্তানিতে নতুন দুয়ার, ৩৮৭ কোটি টাকার প্যাকিং হাউজ-কোল্ডস্টোরেজের উদ্যোগ


গোয়ালগাদ্দা শিম, জারা লেবু ও নাগামরিচ সিলেটের মাটিতে উৎপাদিত এসব কৃষিপণ্য এরই মধ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের বাজারে যাচ্ছে। হাওরের দেশি মাছও পাড়ি দিচ্ছে দেশের সীমানা। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সংরক্ষণ, প্যাকেজিং ও মান নিয়ন্ত্রণের পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাবে রপ্তানির সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

এই পরিস্থিতি বদলাতে প্রায় ৩৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সিলেটে আধুনিক প্যাকিং হাউজ ও কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে বড়শলা এলাকায় প্রায় পাঁচ একর জমিতে এ অবকাঠামো নির্মাণের প্রাথমিক প্রস্তাব করা হয়েছে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তর এরই মধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরি করে কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমার পাশাপাশি সিলেট থেকেই সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পাঠানোর সুযোগ বাড়বে।

প্রস্তাবিত কমপ্লেক্সে থাকবে এক হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার কোল্ডস্টোরেজ, প্যাকিং ও গ্রেডিং সুবিধা এবং মান যাচাইয়ের জন্য ১০টি পরীক্ষাগার। এর সঙ্গে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, সম্মেলনকক্ষ ও বিদেশি ক্রেতাদের থাকার জন্য অতিথি ভবন রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। পণ্য পরিবহন, লোডিং-আনলোডিং, মান নিয়ন্ত্রণ ও সনদ প্রদানের ব্যবস্থাও থাকবে।

প্রকল্পের প্রস্তুতি এগিয়ে নিতে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ঢাকা ও সিলেটের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা প্রস্তাবিত স্থান পরিদর্শন করে কৃষক, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলবেন। তাঁদের মতামতের ভিত্তিতেই আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্যাকিং হাউজ নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে। চলতি সপ্তাহে বিশেষজ্ঞ দলটির সিলেট সফরের সম্ভাবনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সিলেটের কৃষিপণ্যের প্রবেশে বড় বাধা হলো সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মান নিয়ন্ত্রণের পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব। ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সরাসরি আন্তর্জাতিক কার্গো ফ্লাইট চালু হলেও কৃষিপণ্য সংরক্ষণের উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

রপ্তানির সম্ভাবনাকে সামনে রেখে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে অত্যাধুনিক কার্গো কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক কার্গো ফ্লাইট চলাচল আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। ঢাকার বাইরে দেশের প্রথম বিমানবন্দর হিসেবে এই কার্যক্রম শুরু হলেও ‘কোল্ডস্টোরেজ ও প্যাকিং হাউস’ না থাকায় সিলেট থেকে কৃষিপণ্য রপ্তানি সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে কার্গো ফ্লাইটে ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তৈরি পোশাক বিদেশে যাচ্ছে।

এ অবস্থায় ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে সিলেটে প্যাকিং হাউজ কাম কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের মতে, নারায়ণগঞ্জের শ্যামপুরের আদলে সিলেটে এমন অবকাঠামো গড়ে উঠলে গোয়ালগাদ্দা শিম, নাগা মরিচ, ফরাস ও শিমের বিচি, কচুমুখী ও লতি, জারা লেবু এবং সাতকরাসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে পাঠানো সম্ভব হবে।

সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন জাগো নিউজকে বলেন, ‘এরকম একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য জায়গা বরাদ্দ দিতে কোনো সমস্যা নাই। আপাতত সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে বড়শলায় খাসজমিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে প্রয়োজনে আরও জমি বরাদ্দ দেওয়া হবে।’

কৃষিপণ্যের পাশাপাশি হাওরের মাছ রপ্তানির সম্ভাবনাও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, সিলেট থেকে নিয়মিত সবজি বিদেশে যাচ্ছে এবং হাওরের মাছও দেশের গণ্ডি পেরোচ্ছে। সংরক্ষণ, প্যাকেজিং ও রপ্তানির প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে উঠলে কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তারা লাভবান হওয়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্যের অপচয়ও কমবে।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক ড. ফজলে এলাহী মোহাম্মদ ফয়সাল জাগো নিউজকে বলেন, ‘রপ্তানিকারক ও আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা সরাসরি কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন করাবেন। এতে কৃষকদের জন্য ফসল উৎপাদন ও বিক্রয়ের স্থায়ী বাজার সৃষ্টি হবে।’

তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শাকসবজি ও ফলমূলের সার্বিক উৎপাদন বাড়তে পারে। বিশেষ করে ড্রাগন ফল, সাতকড়া, তেজপাতা ও নাগা মরিচের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিদেশে রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে।

ড. ফজলে এলাহী মোহাম্মদ ফয়সাল আরও বলেন, সিলেটের হাওরের মাছ সংগ্রহ করে ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে মান নিশ্চিত করে প্যাকিংয়ের পর বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে। প্রসেসিং ব্যবস্থা চালু হলে ভবিষ্যতে সিলেটে ডেইরি ও পোল্ট্রি ফার্ম গড়ে ওঠার পথও সুগম হবে।

মাছ, মাংস ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি বৈদেশিক রপ্তানি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে বলেও জানান তিনি।

এদিকে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পরিকল্পনা প্রণয়ন বিভাগের অধীনে সিলেটে প্যাকিং হাউজ কাম কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণের লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগের উপপরিচালক জুলিয়া যেসমিন মিলি।

তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্টেকহোল্ডারদের মতামত নেওয়ার পর খসড়া ডিপিপি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বিমানবন্দরসংলগ্ন বড়শালা এলাকায় সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রায় পাঁচ একর জায়গায় কমপ্লেক্সটি নির্মাণের পরিকল্পনা জানিয়ে জুলিয়া যেসমিন মিলি বলেন, এতে ১০টি ল্যাব, অফিস ভবন, গ্রেডিং রুম, কোল্ডস্টোরেজ চেম্বার, ট্রেনিং সেন্টার ও বিদেশি ক্রেতাদের থাকার জন্য গেস্ট হাউজসহ বিভিন্ন সুবিধা থাকবে। পাশাপাশি সিলেটের হাওরের মাছ রপ্তানির জন্য সার্টিফিকেশন সুবিধা ও একটি সেল সেন্টার যুক্ত করার প্রস্তাবও রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকার শ্যামপুর প্যাকিং হাউজের ভুলত্রুটি বিশ্লেষণ করে সিলেটের স্থাপনাটি আরও আধুনিক ও পরিমার্জিতভাবে নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। চলতি সপ্তাহে বিশেষজ্ঞ দল সিলেট পরিদর্শন করবে।

প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজারও মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে বলে জানান জুলিয়া যেসমিন মিলি। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আন্তর্জাতিক বিধিবিধান মেনে পণ্য রপ্তানির জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি কন্ট্রাক্ট ফার্মিং বা চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর সিলেটে এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, শ্যামপুরের প্যাকিং হাউজ ও কোল্ডস্টোরেজের আদলে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা করে দ্রুত প্রকল্পের কাজ শুরু করা হবে। পরবর্তীতে প্রয়োজন অনুযায়ী এর পরিধি আরও বাড়ানো হবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে সিলেটকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এ লক্ষ্যে কৃষি উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী নেতা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলেটের কৃষিজ, মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা রয়েছে। আধুনিক সংরক্ষণ, প্যাকেজিং ও মান নিয়ন্ত্রণের অবকাঠামো তৈরি হলে উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ার পাশাপাশি কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর