সোমেশ্বরী নদীর বুক চিরে একদিন সেতুটি দাঁড়াবে এমন আশায় কেটেছে বছরের পর বছর। কিন্তু সেই অপেক্ষার এখনও শেষ হয়নি। সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার কায়েতকান্দা গ্রামের সামনে নির্মাণাধীন ৩২০ মিটার দীর্ঘ সেতুটির কাজ নির্ধারিত সময়ের প্রায় পাঁচ বছর পরও অসম্পূর্ণ পড়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় চার ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষের সড়ক যোগাযোগের স্বপ্ন আটকে আছে নদীর ওপারেই। বর্ষা এলেই সেই নদী পার হতে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভরসা এখন নৌকা।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ধর্মপাশা উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ৪৭ কোটি ৮২ লাখ ১৪ হাজার ৮০০ টাকা ব্যয়ে সেতুটি নির্মাণের জন্য তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডকে কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর। চুক্তি অনুযায়ী ২০২১ সালের ৮ জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও সেতুটি পূর্ণতা পায়নি। পরে ২০২৪ সালের নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ বন্ধ করে দিলে নির্মাণকাজে নিয়োজিত শ্রমিকেরাও সেখান থেকে চলে যান।
কায়েতকান্দা গ্রামের সামনে সোমেশ্বরী নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অসম্পূর্ণ সেতুটি যেন নদীর দুই পাড়ের মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষারই প্রতিচ্ছবি। এক পাশে মধ্যনগর গ্রাম, অন্য পাশে কায়েতকান্দা গ্রাম। সরেজমিনে দেখা গেছে, কায়েতকান্দা গ্রামের দিকে সেতুটির পাঁচটি পিলার নির্মাণ করা হলেও সেগুলোর ওপরের কাজ আর এগোয়নি। অপর পাশে মধ্যনগর গ্রামের পাড়ে পাঁচটি পিলারের ওপর সেতুর কাঠামোর কিছু অংশ নির্মাণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকায় সেখানে পড়ে আছে নির্মাণসামগ্রী ও অসম্পূর্ণ কাঠামো।
হাওর-অধ্যুষিত বিচ্ছিন্ন উপজেলা মধ্যনগর। চারটি ইউনিয়নের মধ্যে উপজেলা সদর ইউনিয়নের সঙ্গে অন্য তিন ইউনিয়নের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ নেই। সোমেশ্বরী নদীর ওপর সেতুটির নির্মাণ শেষ হলে চার ইউনিয়নের মধ্যে চালু হবে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ। তখন নদী আর মানুষের পথের বাধা হয়ে থাকবে না। কিন্তু সেই দিন এখনও দূরে।
শুষ্ক মৌসুমে নদী পারাপারের জন্য স্থানীয় মানুষ বাঁশ দিয়ে তৈরি অস্থায়ী পুল ব্যবহার করেন। আর বর্ষায় সোমেশ্বরীর পানি বাড়লে সেই পথও হারিয়ে যায়। তখন নৌকাই হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা।
বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন বলেন, “আমার ইউনিয়ন থেকে উপজেলা সদরের দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। দীর্ঘদিন ধরে সেতুর কাজ বন্ধ থাকায় চার ইউনিয়নের মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।”
বাকাতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আমিনুল এহসান বলেন, “২১ মাস ধরে সেতুর নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপজেলা সদরে যাতায়াতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষায় নৌকায় চলাচল করতে হচ্ছে।”
এলজিইডির ধর্মপাশা উপজেলা প্রকৌশলী শাহাব উদ্দিন বলেন, “সেতুটির প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ শেষ করার জন্য একাধিকবার তাগিদ দেওয়া হলেও কাজ শেষ না করায় কার্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে। ২১ মাস ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে। অবশিষ্ট কাজের জন্য তিন মাস আগে দরপত্র আহ্বান করা হলেও ঠিকাদার নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। দুই সপ্তাহ আগে আবারও দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”
এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান আতাউর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
মধ্যনগর উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জনি রায় বলেন, “সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় উপজেলাবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলব।”
সেতুটির পিলারগুলো দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু থেমে আছে তার পথচলা। নদীর দুই পাড়ে প্রতিদিনের অপেক্ষা কবে শেষ হবে নির্মাণকাজ, কবে সোমেশ্বরীর বুকের ওপর দিয়ে খুলবে সরাসরি সড়কপথ। ততদিন পর্যন্ত বর্ষার নদী পেরোতে নৌকাই সঙ্গী স্থানীয় মানুষের।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
মধ্যনগর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি 








