সবুজ পাতার আড়ালে চা শ্রমিকের দুপুরের খাবার ‘পাতিচখা’
সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৩১ PM

সবুজ পাতার আড়ালে চা শ্রমিকের দুপুরের খাবার ‘পাতিচখা’

কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৭/০৯/২০২৬ ০১:৪১:৫০ PM

সবুজ পাতার আড়ালে চা শ্রমিকের দুপুরের খাবার ‘পাতিচখা’


মৌলভীবাজারের চা-বাগানে দিনের শুরু হয় সূর্যের আলো ফোটার আগেই। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ পেরিয়ে নারী-পুরুষ শ্রমিকেরা পৌঁছে যান বাগানে। কারও মাথায় ঝুড়ি, কারও কাঁধে পাতা রাখার ব্যাগ। এরপর সারি সারি চা-গাছের মাঝে শুরু হয় কচি পাতা সংগ্রহের কাজ।

সকাল থেকে টানা পরিশ্রমের পর দুপুরে যখন কিছুটা বিরতি মেলে, তখনও তাদের খাবারের আয়োজন থাকে অতি সামান্য। বাগানের গাছের ছায়ায় বসে কেউ বের করেন মুড়ি, কেউ পান্তা ভাত। কারও সঙ্গে থাকে আটার মোটা রুটি। আর সেই রুটির সঙ্গে চা-পাতা দিয়ে তৈরি ঝাল ভর্তা—শ্রমিকদের পরিচিত ‘পাতিচখা’।

দৃশ্যটি যেমন চা-বাগানের স্বাভাবিক কর্মজীবনের অংশ, তেমনি এর মধ্যে লুকিয়ে আছে শ্রমিকদের আর্থিক বাস্তবতার কঠিন চিত্র। যে কচি পাতা তুলে তারা দেশের চা শিল্পকে সচল রাখেন, কখনো সেই পাতাই তাদের দুপুরের খাবারের অংশ হয়ে ওঠে।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) দুপুর ২টার দিকে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী শমশেরনগর ইউনিয়নের কানিহাটি চা বাগানে এমন চিত্র দেখা যায়। পাতা তোলা শেষ করে ওজন দেওয়ার পর সেগুলো গাড়িতে তোলার অপেক্ষায় ছিলেন শ্রমিকেরা। বিরতির সময় কথা হয় কয়েকজনের সঙ্গে।

চা শ্রমিক নিয়তী রানী জানান, সংসারের ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের হিসাব মেলানোই তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর ভাষায়, ঘরে চাল জোগাড় করাই যেখানে কঠিন, সেখানে ডাল বা তরকারি অনেক সময় বিলাসিতার মতো হয়ে দাঁড়ায়।

তিনি বলেন, ‘ঘরে চাল থাকে না, ডাল বা তরকারি তো বিলাসিতা। রুটি বানিয়ে নিই, আর চায়ের কুঁড়ি দিয়ে পাতিচখা বানিয়ে খাই। কখনো কাঁচা, কখনো ভেজে নেই। তাতেই দিন চলে যায়।’

শ্রমিকদের কাছে পাতিচখা তাই নিছক একটি খাবার নয়। এটি তাদের দৈনন্দিন টানাপোড়েনেরও প্রতিচ্ছবি। চা-পাতার সঙ্গে কাঁচা মরিচ, রসুন ও পেঁয়াজ মিশিয়ে কেউ কেউ ঝাল খাবার তৈরি করেন। আবার অনেকের দুপুর কাটে পান্তা ভাত, চাল ভাজা কিংবা মুড়ি খেয়ে।

চা-বাগানের শ্রমিকদের কর্মদিবস সপ্তাহে ছয় দিন। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বাগানে কাজ করলেও এরপরও তাদের দায়িত্ব শেষ হয় না। ঘরে ফেরার পর রান্না, পানি সংগ্রহ এবং সন্তানদের দেখাশোনার মতো কাজও করতে হয়।

এক নারী শ্রমিক বলেন, ‘সপ্তাহে ছয় দিন সকালে আটটায় কাজে ঢুকি, বিকেল পাঁচটায় ছুটি। ঘরে ফিরে আবার রান্না, পানি আনা, বাচ্চাদের দেখভাল-সব করতে হয়।’

বাগান বাড়ি থেকে দূরে হলে কাজের জন্য বের হতে হয় ভোরের আগেই। অনেক শ্রমিক কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে কর্মস্থলে পৌঁছান। দিনভর শ্রমের বিনিময়ে তাদের হাতে আসে প্রায় ১৭৮ টাকা। নির্ধারিত পরিমাণ চা-পাতা সংগ্রহ করতে না পারলে মজুরি কমে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

এই আয় দিয়েই খাবার, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও সংসারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে হয়। ফলে প্রতিদিনই পরিবারের খরচের হিসাব কষতে হয় শ্রমিকদের।

মৌলভীবাজারে রয়েছে ৯২টি চা-বাগান। দেশের চা উৎপাদনের একটি বড় অংশ আসে এ অঞ্চল থেকে। চা শিল্পের পাশাপাশি পর্যটনের জন্যও জেলাটির রয়েছে আলাদা পরিচিতি।

তবে বাগানের সবুজ দৃশ্যের আড়ালে শ্রমিকদের জীবনযাত্রা অনেকটাই ভিন্ন। শত বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে চা শিল্পের বিকাশ ঘটলেও এ শিল্পের অন্যতম প্রধান শক্তি চা শ্রমিকদের জীবনমান এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

শ্রমিকদের অনেক বসতঘর পুরোনো ও জরাজীর্ণ। স্যানিটেশন ব্যবস্থাও দুর্বল। স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সীমিত। শিশুদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও শিক্ষার মান নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। এসব কারণে প্রজন্মের পর প্রজন্ম চা-বাগানকেন্দ্রিক জীবনযাপনে থাকা মানুষের একটি বড় অংশ দারিদ্র্য, অপুষ্টি ও সামাজিক নানা সংকটের মধ্যে বসবাস করছেন।

চা-পাতা সংগ্রহের কাজ দূর থেকে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা ততটাই কষ্টসাধ্য। দীর্ঘসময় ঝুঁকে কাজ করতে হয় শ্রমিকদের। গরম, বৃষ্টি কিংবা কাদামাটিও তাদের কাজ থামাতে পারে না।

কাজের দীর্ঘসময় ও শারীরিক পরিশ্রমের কারণে পা ফুলে যাওয়া, হাতে কড়া পড়া কিংবা চামড়া উঠে যাওয়ার মতো সমস্যার কথাও জানান কেউ কেউ। কিন্তু সংসারের প্রয়োজন তাদের পরদিন আবার একই কাজে ফিরতে বাধ্য করে। একদিন কাজ না করলে একদিনের আয় কমে যায়, আর সেই সঙ্গে কমে যায় পরিবারের খাবারের সামর্থ্যও।

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সন্দ্বীপ তালুকদার বলেন, চা শ্রমিকদের পাশে থাকার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘কেউ অসুস্থ হলে খোঁজ নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি কমলগঞ্জ উপজেলার ১২ হাজার ৫৯২ জন চা শ্রমিকের মাঝে প্রতি মাসে ৬৫০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। এটি বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে চা শ্রমিকরা বর্ধিত অর্থ পাবেন।’

শ্রমিকদের ‘পাতিচখা’ খাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পাতিচখা মূলত যারা চা-পাতা তোলার কাজ করেন, তারাই খেয়ে থাকেন। বাড়িতে যারা থাকেন, তারা এটি খান কি না, তা আমার জানা নেই।’

চা-বাগানে শ্রমিকদের কর্মপরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কথা জানান ইউএনও। তিনি বলেন, ‘চা-বাগানে পাতা তোলার কাজে শ্রমিকদের স্যানিটেশনের প্রয়োজন হয়, কিন্তু অনেক জায়গায় সেটি নেই। পাশাপাশি চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও পুষ্টির বিষয়েও বাগান ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব।’

তিনি আরও বলেন, ‘চা শ্রমিকরা খুব কষ্টে জীবনযাপন করেন। তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য সরকার কাজ করছে।’

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর