সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাটে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারির মধ্যেও থামছে না ভারতীয় গরুর অবৈধ বাণিজ্য। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় একটি সংঘবদ্ধ চোরাকারবারী চক্র কিছু অসাধু ব্যক্তির সহযোগিতায় ভারত থেকে গরু এনে স্থানীয় হাটের পুরোনো রশিদ ও প্যাড ব্যবহার করে সেগুলোকে ‘দেশি গরু’ হিসেবে দেখিয়ে একাধিক পুলিশ চেকপোস্ট পার করছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গোয়াইনঘাট উপজেলার বিছনাকান্দি ও রুস্তমপুর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে প্রতিদিন রাতের আঁধারে শত শত ভারতীয় গরু বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। পরে এসব গরু হাদারপার-গোয়াইনঘাট মূল সড়ক ব্যবহার করে সিলেটের বিভিন্ন হাট-বাজারে নেওয়া হচ্ছে। এমনকি দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও পাঠানো হচ্ছে এসব গরু।
অভিযোগ রয়েছে, বঙ্গবীর পয়েন্ট হয়ে গোয়াইনঘাট সদর পর্যন্ত গোয়াইনঘাট থানার অধীনে থাকা প্রধান চেকপোস্টগুলোতে ভুয়া কাগজপত্র কিংবা রশিদ দেখিয়ে ভারতীয় গরুগুলোকে ‘দেশি গরু’ হিসেবে পার করে দেওয়া হচ্ছে। এ কাজে গরু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পুলিশকে ‘মাসিক’ কিংবা ‘ট্রিপ প্রতি’ অর্থ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, কোনো সাংবাদিক কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এলাকায় অবস্থান করলে চেকপোস্টে তৎপরতা সাময়িকভাবে বদলে যায়। তখন ভুয়া কাগজ বা রশিদ দেখিয়ে গরুগুলোকে দেশি গরু হিসেবে উপস্থাপন করে পার করে দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, স্থানীয় সিন্ডিকেটের সঙ্গে রুস্তমপুর ইউপির মেম্বার জালাল উদ্দিন, যুবদল নেতা হেলাল আহমদ ও ফরিদুল, শেবুল সহ গংদের নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা স্থানীয় মাতুরতল বাজারের পুরোনো রশিদ বা প্যাড ব্যবহার করে ভুয়া কাগজ তৈরি করেন। ভারত থেকে আনা গরুগুলোকে স্থানীয় হাটের দেশি গরু হিসেবে দেখাতেই এসব রশিদ ব্যবহার করা হয়।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, চেকপোস্টে দায়িত্ব পালনকারী অনেক পুলিশ সদস্য এসব জাল কাগজপত্রের বিষয়টি জানার পরও অর্থের বিনিময়ে না জানার ভান করে গাড়ি ছেড়ে দেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “রাতে যখন গরু বোঝাই ট্রাকগুলো চেকপোস্ট পার হয়, তখন পুলিশ সদস্যরা গাড়ির কাছে যান এবং কথা বলে ছেড়ে দেন। সাধারণ মানুষ বা গরুর আসল মালিক যদি বৈধ কাগজ দেখায়, তবুও পুলিশ হয়রানি করে, কিন্তু চোরাকারবারীদের বেলায় নিয়ম ভিন্ন।”
এলাকাবাসীর ভাষ্য, গোয়াইনঘাটের সীমান্তবর্তী কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন ভারতীয় গরু আসার বিষয়টি অনেকটা ওপেন সিক্রেট। তাদের প্রশ্ন, সীমান্ত দিয়ে বিপুলসংখ্যক গরু প্রবেশ ও পরিবহন হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা কেন দেখা যাচ্ছে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে এভাবে গরু পাচার হওয়ার ঘটনায় চোরাকারবারীদের সঙ্গে পুলিশের একটি যোগসাজশ রয়েছে। যদিও পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালানোর কথা বলছে, স্থানীয়দের দাবি বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
এদিকে ভুয়া রশিদের মাধ্যমে ভারতীয় গরুকে দেশি গরু হিসেবে দেখিয়ে বাজারজাত করার কারণে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি এতে স্থানীয় খামারিরাও ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ অবস্থায় অবৈধ বাণিজ্য বন্ধে জেলা পুলিশ সুপারসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
অভিযোগের বিষয়ে গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওমর ফারুকের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। প্রথমে তিনি কল রিসিভ করলেও কথা বলা মাত্রই কল রেখে দেন। পরে পুনরায় কল করা হলে তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে তার ফোনে একটি বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী আজকের সিলেটকে জানান, সীমান্ত দিয়ে গরু দেশে প্রবেশের বিষয়ে বিজিবি বলতে পারবে। তবে উপজেলা প্রশাসন নিয়মিত টাস্কফোর্স অভিযান পরিচালনা করছে।
মাতুরতল বাজারের পুরোনো রশিদ বা প্যাড ব্যবহার করে ভারতীয় গরুকে দেশি গরু হিসেবে দেখানোর অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে আমরা অবগত না। আমরা দ্রুত এ বিষয়ে অভিযান পরিচালনা করব।”
আজকের সিলেট/ জেকেএস









