সিলেটে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে, ১৬৩ মণ্ডপে বাড়ছে নিরাপত্তা
রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০০ PM

সিলেটে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে, ১৬৩ মণ্ডপে বাড়ছে নিরাপত্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৪/১০/২০২৬ ০৯:৫৮:০৫ AM

সিলেটে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে, ১৬৩ মণ্ডপে বাড়ছে নিরাপত্তা

সিলেটে শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। ছবি: সোহেল আহমেদ


সিলেটে শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। নগর ও জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে প্রতিমা নির্মাণ, সাজসজ্জা ও আলোকসজ্জার কাজ এগিয়ে চলছে। আগামী ১৬ অক্টোবর (শুক্রবার) মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান এই ধর্মীয় উৎসব। এবার সিলেট জেলা ও মহানগর মিলিয়ে ৬৩৭টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ সিলেট জেলা ও মহানগর শাখার তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৪৭৪টি মণ্ডপের মধ্যে ৪৪৮টি সর্বজনীন ও ২৬টি পারিবারিক। অন্যদিকে সিলেট মহানগরে রয়েছে ১৪৭টি সর্বজনীন ও ১৬টি পারিবারিক মণ্ডপ।

উৎসব নির্বিঘ্ন করতে পূজা উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি এবং সিলেট জেলা ও মহানগর শাখার বর্ধিত সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৮টি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জেলা ও মহানগর শাখার যৌথ উদ্যোগে ১১ সদস্যের একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। সব পূজা কমিটিকে সার্বক্ষণিক ওই সেলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এদিকে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ব্যাপক নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়েছে প্রশাসন। পুলিশ, আনসার, র‌্যাব, বিজিবি ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। সিলেট জেলা ও মহানগর পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা সাদা পোশাকেও মাঠে থাকবেন।

প্রতিটি পূজামণ্ডপকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার পাশাপাশি পাড়া-মহল্লায় নিয়মিত ড্রোন উড়িয়ে নজরদারি করা হবে। প্রয়োজনে পুলিশের সব হটলাইন নম্বর সক্রিয় থাকবে। পূজা কমিটি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘হুয়াটসঅ্যাপ’-এ একটি গ্রুপ খোলার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

সিলেট মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সুব্রত দেব বলেন, মহানগরে এবার ১৬৩টি পূজা মণ্ডপে দুর্গাপূজা হবে। এর মধ্যে কোতোয়ালি থানায় ৪২টি, জালালাবাদে ২২টি, মোগলাবাজারে ১৮টি, শাহপরানে ২৬টি এবং বিমানবন্দর থানায় ৪০টি মণ্ডপ রয়েছে।

তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের শঙ্কা বা ঝুঁকি নেই। পরিবেশ স্বাভাবিক ও সুন্দর রয়েছে এবং প্রশাসন সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করছে। কোনো সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়লে তাৎক্ষণিক প্রশাসনকে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সুব্রত দেব আরও বলেন, প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপ ও আলোকসজ্জার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। নিয়মিত মণ্ডপগুলো পরিদর্শনও করা হচ্ছে। শুক্রবার জেলা ও মহানগরের প্রতিনিধি সভায় কেন্দ্রীয় নির্দেশনাগুলো জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

প্রতিটি মণ্ডপে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, বিদ্যুৎ বিভ্রাট মোকাবিলায় জেনারেটর রাখা, প্রয়োজন অনুযায়ী স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ এবং তাদের নাম-ঠিকানা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মণ্ডপে শুধু ধর্মীয় গান-বাজনা পরিবেশনের বিষয়েও কঠোর নির্দেশনা রয়েছে।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট মৃত্যুঞ্জয় ধর ভোলা বলেন, ১৬ থেকে ২১ তারিখ পর্যন্ত ছয় দিনব্যাপী দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে সিলেট জেলা ও মহানগরে নিরাপত্তা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো শঙ্কা নেই। জেলা ও মহানগর পুলিশের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে এবং তারা পর্যাপ্ত নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছেন।

তার মতে, প্রতিটি মণ্ডপে ২৪ ঘণ্টা স্বেচ্ছাসেবকের মাধ্যমে পাহারা, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা ও বিদ্যুৎ ব্যাকআপ, সাধ্যানুযায়ী সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং মণ্ডপ ও প্রতিমা তৈরির স্থান নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধেও নেওয়া হয়েছে প্রস্তুতি। মণ্ডপ ও আশপাশের এলাকা পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি নিয়মিত মশা নিরোধক ও জীবাণুনাশক স্প্রে করা হবে। উৎসব শান্তিপূর্ণ রাখতে স্থানীয় প্রশাসন, রাজনীতিক, সাংবাদিক, সুশীল সমাজসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে জানান মৃত্যুঞ্জয় ধর। একই সঙ্গে পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীদের সতর্ক ও সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।

সিলেট জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) জাকির হোসাইন বলেন, দুর্গাপূজাকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা ও সার্বিক নিরাপত্তায় ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সিভিল পোশাক ও সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি দায়িত্বে থাকা সদস্যদের বডি-অন ক্যামেরা থাকবে। আনসার সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন। ষষ্ঠী থেকে পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর হবে।

তিনি জানান, প্রতিমা তৈরির স্থানগুলোতে এরই মধ্যে চৌকিদার, আনসার ও স্থানীয়দের সমন্বয়ে নজরদারি চলছে। গুরুত্বপূর্ণ মন্দিরগুলোতে সিসিটিভির মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হবে।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (সিটিএসবি ও মিডিয়া) মো. আফজাল হোসেন বলেন, পূজাকে কেন্দ্র করে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মণ্ডপগুলোতে পুলিশ, আনসার ও ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি র‌্যাবের টহল থাকবে। সিসি ক্যামেরা ও ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি করা হবে।

তিনি বলেন, পূজা উদযাপন পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে নিয়ে সমন্বয় সভা করে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রতিমা তৈরির স্থানগুলো পুলিশের টহল দল ও সিটিএসবির ওয়াচারদের মাধ্যমে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিসর্জনের সময়সূচি, র‌্যালির শৃঙ্খলা, লাইটিং ও পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনায় সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে।

পূজার কেনাকাটায় আসা মানুষের নিরাপত্তা, চুরি-ছিনতাই ঠেকানো এবং মণ্ডপের আশপাশে হকারদের কারণে যানজট কমাতেও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিটি মণ্ডপের স্বেচ্ছাসেবকদের তালিকা যাচাই করে তাদের দায়িত্বও পর্যবেক্ষণ করা হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপপ্রচার কিংবা এআই-নির্ভর বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা ঠেকাতে এসএমপির সাইবার টিম এনএসআই, ডিজিএফআই, এসবি ও পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের সহায়তায় নজরদারি করবে। মণ্ডপ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য যৌথ প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি থানার ড্রোন ব্যবহার করে মণ্ডপ ও আশপাশের এলাকাতেও আকাশপথে নজরদারি চালানো হবে।

আফজাল হোসেন জানান, সিলেটে মোট ১৬৩টি মণ্ডপের তথ্য পাওয়া গেছে। ঝুঁকি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক গুরুত্বপূর্ণ এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। অধিক গুরুত্বপূর্ণ মণ্ডপে স্থায়ী পুলিশ মোতায়েন থাকবে, অন্যগুলোতে চলবে মোবাইল পেট্রোলিং। প্রতিটি মণ্ডপের নিরাপত্তায় প্রায় ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবেন। পাশাপাশি র‌্যাবের টহল দলও মাঠে থাকবে।

সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লা আল মামুন বলেন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই দুর্গাপূজার প্রস্তুতি চলছে। এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা বা ঝুঁকির খবর পাওয়া যায়নি। উৎসব নির্বিঘ্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর