রাতের আঁধারে ৮ হাজার পানগাছ কেটে দিল দুর্বৃত্তরা, কুলাউড়ায় নিঃস্ব ৯ খাসিয়া পরিবার
শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৮ AM

রাতের আঁধারে ৮ হাজার পানগাছ কেটে দিল দুর্বৃত্তরা, কুলাউড়ায় নিঃস্ব ৯ খাসিয়া পরিবার

কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০১/১০/২০২৬ ০৫:৫৯:৪৩ PM

রাতের আঁধারে ৮ হাজার পানগাছ কেটে দিল দুর্বৃত্তরা, কুলাউড়ায় নিঃস্ব ৯ খাসিয়া পরিবার


রাতের নীরবতা ভেঙে কেটে ফেলা হলো বছরের পর বছর ধরে লালন করা পানগাছ। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের নার্সারি খাসিয়াপুঞ্জিতে দুর্বৃত্তদের হাতে এক রাতেই ধ্বংস হয়েছে প্রায় ৮ হাজার পানগাছ। বুধবার দিবাগত রাতে পুঞ্জির ৯টি পরিবারের জুমে ঢুকে গাছগুলো কেটে ফেলার ঘটনায় মুহূর্তেই বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে পরিবারগুলোর জীবিকা। পান চাষই যাদের আয়ের প্রধান অবলম্বন, সেই গাছগুলো হারিয়ে এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত পুঞ্জিবাসী।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ১৩নং কর্মধা ইউনিয়নের নার্সারি খাসিয়া পুঞ্জির বাসিন্দা লিকিন খংপ্ডা, পাইলা পতাম, নাসরিন পতাম, জনি পতাম, নিস্তার পাটুয়াট, শিউলি আজিম, টিউনি আজিম, ডিমান পতাম এবং মাসার তংপের এই ৯টি পরিবারের জুম থেকে রাতের আঁধারে পানগাছগুলো কেটে ফেলা হয়।

পানগাছগুলো শুধু একটি ফসল নয়; পুঞ্জির এসব পরিবারের দীর্ঘদিনের শ্রম, বিনিয়োগ ও জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। একটি পানগাছ থেকে ফলন পেতে প্রায় চার বছর যত্ন নিতে হয়। ফলে এক রাতের এই ঘটনায় শুধু গাছই কাটা পড়েনি, নষ্ট হয়েছে বছরের পর বছর ধরে করা শ্রম ও খরচের ফল।

ক্ষতিগ্রস্ত জুমের মালিক নাসরিন পতাম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘কে বা কারা এই কাজ করেছে জানি না। তবে, যে বা যারা এই কাজ করেছে তারা নিশ্চিত জানে, খাসিয়াদের শেষ করার সহজ কৌশল হলো পান গাছ কেটে ফেলা। খাসিয়ারা সারাদিন জুমে কাজ করে জেনেই রাতের আঁধারে জুমের গাছগুলো কেটে দেওয়া হয়েছে।’

নার্সারি পুঞ্জির মান্ত্রী (প্রধান) জনি পতাম বলেন, ‘আমরা নিরীহ মানুষ। পান চাষ করেই সংসার চালাই। একটি গাছ ৪ বছর যত্ন করার পর পান পাওয়া যায়। অথচ দায়ের এক কোপে ৪ বছরের পরিশ্রম ও খরচ সব শেষ হয়ে যায়। পুঞ্জির নয়টি পরিবারের জীবিকা নির্বাহের পথ নিমিষে ধ্বংস হয়ে গেল।’

তিনি বলেন, তাঁরা খুব ভয়ের মধ্যে আছেন। কারণ পানগাছই তাঁদের একমাত্র আয়ের উৎস। এরই মধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরেজমিন তদন্ত করতে লোক এসেছে। তাঁরা সঠিক তদন্ত করে দুষ্কৃতকারীদের আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন।

পুঞ্জিবাসীদের কাছে রাতের এই হামলা তাই শুধু কয়েক হাজার পানগাছ হারানোর ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে নয়টি পরিবারের ভবিষ্যৎ। নতুন করে পানবাগান তৈরি করতে সময়, শ্রম ও অর্থ সবকিছুর প্রয়োজন হবে। সেই সময় পর্যন্ত পরিবারগুলো কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করবে, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কুবরাজ আন্তঃপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ফ্লোরা বাবলী তালাং বলেন, ‘আমাদের হয়রানির শেষ নেই। কে দেবে আমাদের জীবিকার নিরাপত্তা? এ উত্তর আমার জানা নেই। কেন খাসিয়া আদিবাসীদের জীবিকা বারবার হামলার শিকার হবে? দুষ্কৃতকারীদের বিচার হবে কি না সন্দেহ।’

ঘটনার খবর পেয়ে কুলাউড়া থানা থেকে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম মুন্না বলেন, ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। তারা আসার পর বিস্তারিত জানা যাবে।

এদিকে ঘটনার পর নার্সারি খাসিয়াপুঞ্জিতে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, শুধু ঘটনাটি তদন্ত করলেই হবে না, পানগাছ কাটার সঙ্গে কারা জড়িত তা দ্রুত শনাক্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা আবারও ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের।

স্থানীয়রা আরও বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় সংকট জীবিকা। চার বছর ধরে পরিচর্যার পর যে পানগাছ থেকে আয়ের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা এক রাতেই শেষ হয়ে গেছে। তাই তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পুঞ্জিবাসীর পুনর্বাসনে প্রশাসনের জরুরি সহায়তাও প্রয়োজন।

নার্সারি খাসিয়াপুঞ্জির এই ঘটনায় এখন ক্ষতিগ্রস্ত নয়টি পরিবার শুধু কেটে ফেলা পানগাছের হিসাব চাইছে না; তারা চাইছে নিজেদের জীবিকা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। রাতের আঁধারে কেটে ফেলা সেই পানগাছগুলোর সঙ্গে যেন তাঁদের জীবনের আশাটুকুও হারিয়ে না যায় এ জন্য দ্রুত তদন্ত, জড়িতদের শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর