হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার এমপিওভুক্ত চৌমুহনী খুর্শিদ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজে ৩২ শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠান তহবিল থেকে দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষক-কর্মচারীদের দাবি, কারও প্রায় দুই বছর, আবার কারও বেতন-ভাতা চার বছর পর্যন্ত বকেয়া রয়েছে। দীর্ঘদিন অর্থ না পাওয়ায় তাঁদের অনেকেই আর্থিক সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, স্কুল শাখায় ১৩ জন শিক্ষক, কলেজ শাখায় ১৫ জন শিক্ষক এবং চারজন কর্মচারী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেরই প্রতিষ্ঠান তহবিল থেকে দুই থেকে চার বছর পর্যন্ত বেতন-ভাতা বকেয়া থাকার অভিযোগ রয়েছে।
বকেয়া পাওনা আদায়ে এরই মধ্যে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। তাঁদের ভাষ্য, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির কাছে এ বিষয়ে আবেদন করা হয়েছে। অভিযোগের পর বিভিন্ন সময়ে তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। তবে তদন্তের কার্যক্রম ও এর ফলাফল নিয়ে কয়েকজন শিক্ষক প্রশ্ন তুলেছেন।
শিক্ষক-কর্মচারীদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয়ের উৎস কম নয়। শিক্ষার্থীদের বেতন ও বিভিন্ন অনুদানের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির আওতাধীন দোকান ও মার্কেটের ভাড়া থেকে অর্থ আসে। প্রতিষ্ঠানের জায়গায় থাকা একটি বেসরকারি ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও ভাড়া আদায় করা হয় বলে তাঁদের দাবি। কিন্তু এসব আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব তাঁদের সামনে উপস্থাপন করা হয় না বলে অভিযোগ তাঁদের।
অতীতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে একাধিকবার সংবাদ প্রকাশের কথাও জানিয়েছেন শিক্ষকরা। তাঁদের অভিযোগ, দোকানঘর নামমাত্র ভাড়ায় ইজারা দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সাবেক ম্যানেজিং কমিটির সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বকেয়া পাওনার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের জীববিজ্ঞানের শিক্ষক ফেরদৌস আহমদ বলেন, ‘স্কুলের আয়-ব্যয়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা করা হলে আমাদের কোনো বকেয়া থাকার কথা নয়। আমরা চাই, আমাদের বকেয়া দ্রুত পরিশোধ করা হোক।’
কলেজ শাখার যুক্তিবিদ্যার শিক্ষক ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রায় চার বছর ধরে আমার প্রতি মাসে প্রায় সাত হাজার টাকা করে বকেয়া রয়েছে। আমার মতো কম-বেশি সবারই বকেয়া আছে। প্রতিষ্ঠান চাইলে এসব পরিশোধ করতে পারে।’
নৈশপ্রহরী আশরাফুল আলম বলেন, ‘বছরের পর বছর আমরা ভাতা থেকে বঞ্চিত। এ বিষয়ে আমরা লিখিত অভিযোগও দিয়েছি।’
আশরাফুল আলমের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতাকর্মী জোবেদা খাতুন, এমএলএসএস জেসমিন আক্তার ও আব্দুল মালেকসহ কয়েকজন কর্মচারীও বকেয়া ভাতা না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে চাকরিতে ক্ষতির আশঙ্কায় তাঁরা বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।
প্রতিষ্ঠান পরিচালনা নিয়ে রাজনৈতিক পর্যায় থেকেও অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা ইকরাম বলেন, ‘কমিটির সাবেক লোকজনের কারণে প্রতিষ্ঠানটি দুর্নীতির রাজ্যে পরিণত হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। আমরা আশা করি, খুব দ্রুত এসবের অবসান হবে এবং অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তবে বর্তমান ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি জাকির হোসেনের দাবি, বকেয়া পরিশোধের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে কিছু বকেয়া আমরা পরিশোধ করেছি। বাকিগুলো পরিশোধের বিষয়ে কাজ করছি। স্কুলের আয় খতিয়ে দেখার জন্য আদায়ের অডিট কমিটি গঠন করব। আমরা স্কুলে অভিযোগ বাক্সও স্থাপন করেছি।’
অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যসচিব মোহন মিয়া বলেন, ‘আমি নিজেও বকেয়া পাওনা রয়েছি। কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান তহবিল থেকে তাঁদের বেতন দিতে বাধ্য নয়। তাঁরা রাজস্ব খাত থেকে বেতন পাচ্ছেন। শিক্ষকদের কেউ কেউ বিষয়টি অতিরঞ্জিত করছেন।’
বিষয়টি নিয়ে মাধবপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘তাঁদের বারবার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বিষয়টি সমাধান করতে।’
দীর্ঘদিনের বকেয়া নিয়ে এখন শিক্ষক-কর্মচারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের পূর্ণ হিসাব, তাঁদের প্রকৃত পাওনার পরিমাণ এবং আগের ম্যানেজিং কমিটির সময়কার আর্থিক ব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখা হোক। একই সঙ্গে বকেয়া বেতন-ভাতা দ্রুত পরিশোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি 








