অযত্নে হারিয়ে যাচ্ছে ফয়জাবাদ বধ্যভূমির স্মৃতি, সন্ধ্যা নামলেই মাদকসেবীদের আড্ডা
বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩১ AM

অযত্নে হারিয়ে যাচ্ছে ফয়জাবাদ বধ্যভূমির স্মৃতি, সন্ধ্যা নামলেই মাদকসেবীদের আড্ডা

বাহুবল (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৩০/০৯/২০২৬ ১০:৪৫:৫১ AM

অযত্নে হারিয়ে যাচ্ছে ফয়জাবাদ বধ্যভূমির স্মৃতি, সন্ধ্যা নামলেই মাদকসেবীদের আড্ডা


মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাসের সাক্ষী হবিগঞ্জের বাহুবলের ফয়জাবাদ বধ্যভূমি। একসময় যেখানে শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখার প্রত্যয় নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল স্মৃতিচিহ্ন, আজ সেই স্থানই ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার পরিচর্যার ছাপ। টিলার ঢালে গজিয়ে ওঠা ঝোপ-ঝাড়, ভাঙা স্থাপনা, ক্ষতিগ্রস্ত সিঁড়ি ও অনুপস্থিত আলোকসজ্জায় সন্ধ্যার পর বধ্যভূমিটি পরিণত হচ্ছে অন্ধকার ও নির্জন এলাকায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সুযোগে প্রায় প্রতিরাতেই সেখানে বসছে মাদকসেবীদের আড্ডা।

বাহুবল উপজেলার শেষ প্রান্তে ঢাকা-সিলেট ভায়া মৌলভীবাজার সড়কের পাশে আমতলী চা-বাগানের ৪ নম্বর সেকশনের একটি টিলায় ফয়জাবাদ বধ্যভূমির অবস্থান। মিরপুর বাজার থেকে কিছুদূর এগিয়ে জ্বালানি তেল শোধনাগারের প্রধান ফটকের বিপরীত পাশে টিলায় ওঠার সিঁড়ি। চারপাশে টিলা, গাছপালা আর সবুজের আবরণে ঘেরা জায়গাটি দূর থেকে শান্ত মনে হলেও ভেতরে ঢুকলে চোখে পড়ে দীর্ঘদিনের অযত্নের চিত্র।

সরেজমিনে দেখা যায়, বধ্যভূমির বিভিন্ন অংশে ঘন হয়ে উঠেছে ঝোপ-ঝাড়। টিলায় ওঠার সিঁড়ির কয়েকটি অংশে নেই রেলিং। কোথাও রেলিং থাকলেও তা ভেঙে বা খুলে গেছে। স্মৃতিচিহ্নের বিভিন্ন অংশ ও টাইলসও ভেঙে পড়ে আছে। পুরো স্থাপনায় নেই পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা। ফলে দিনের আলো ফুরিয়ে গেলে দ্রুতই নেমে আসে অন্ধকার।

স্থানীয়দের ভাষ্য, শুধু অবকাঠামোগত ক্ষয় নয়, নিরাপত্তাহীনতাও এখন ফয়জাবাদ বধ্যভূমির বড় সমস্যা। তাদের অভিযোগ, রাতের আঁধারে সেখানে মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। নিয়মিত পাহারা বা নজরদারি না থাকায় অনেকটা নির্বিঘ্নেই চলে মাদক সেবন। এতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানটির পরিবেশ যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি শহীদদের স্মৃতিচিহ্নের নিরাপত্তা নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

স্থানীয় বাসিন্দা কাওছার মিয়া ও হেলাল বলেন, প্রায় প্রতিরাতেই বধ্যভূমিতে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। তারা নির্ভয়ে সেখানে মাদক সেবন করেন। তাঁদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থানে নিয়মিত নিরাপত্তা ও নজরদারি থাকা জরুরি।

স্থানীয়রা জানান, মাঝেমধ্যে আমতলী চা-বাগান কর্তৃপক্ষ বধ্যভূমির আশপাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে। কিন্তু এটিকে স্থায়ী রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেই। ফলে একবার পরিষ্কার করার পর আবারও আগাছা ও ঝোপঝাড়ে ঢেকে যায় বিভিন্ন অংশ। দীর্ঘদিনের এই অযত্নে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনাটিও।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাহুবল উপজেলা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অসংখ্য বাঙালি নারী-পুরুষকে ফয়জাবাদ এলাকায় এনে হত্যা করা হয়েছিল। তাঁদের রক্তে ভেজা সেই স্থানই পরবর্তী সময়ে হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম স্মৃতিচিহ্ন।

দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকার পর ২০০৬ সালে সরকার বধ্যভূমিটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধানে টিলায় ওঠার সিঁড়ি নির্মাণ করা হয়। হত্যাকাণ্ডের স্থানটিতে নির্মাণ করা হয় স্মৃতিচিহ্ন। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান বধ্যভূমিটির উদ্বোধন করেন।

এরপর থেকে বিভিন্ন জাতীয় দিবসে সেখানে নানা কর্মসূচি পালিত হয়ে আসছে। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে প্রদীপ প্রজ্বালনের মতো কর্মসূচিও হয়। বিভিন্ন সময় দর্শনার্থীরাও আসেন ইতিহাসের এই স্থানটি দেখতে। কিন্তু এসব আনুষ্ঠানিক আয়োজনের বাইরে বছরের অধিকাংশ সময়ই বধ্যভূমিটি পড়ে থাকে নীরব ও নির্জন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জাতীয় দিবস এলেই কিছুটা পরিচ্ছন্নতা ও কর্মসূচিকে ঘিরে সেখানে মানুষের উপস্থিতি বাড়ে। কিন্তু এরপর আবারও নেমে আসে নীরবতা। নিয়মিত পরিচর্যা, আলোকসজ্জা ও নিরাপত্তার অভাবে স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে। তাঁদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে একসময় মুক্তিযুদ্ধের এই গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্নের অনেক কিছুই হারিয়ে যেতে পারে।

ফয়জাবাদ বধ্যভূমির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উজ্জ্বল রায় বলেন, বধ্যভূমিটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বরাদ্দ কিংবা নিয়মিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কাঠামো নেই।

তিনি বলেন, রাতে সেখানে মাদকসেবীদের উপস্থিতির কারণে স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগের ইউএনওরাও বধ্যভূমিটির মেরামতের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মেরামত করার পরও মাদকসেবীসহ অন্যরা সেগুলো নষ্ট করে বা খুলে নিয়ে যায়।

ইউএনও উজ্জ্বল রায় আরও বলেন, এ ধরনের বধ্যভূমিতে নিয়মিত পাহারার জন্য নাইট গার্ডের ব্যবস্থা নেই। তবে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠির মাধ্যমে জানানো যায়। বধ্যভূমিটি কীভাবে সংরক্ষণ ও নিরাপদ রাখা যায়, সে বিষয়টি তাঁরা দেখবেন।

স্থানীয়দের কাছে ফয়জাবাদ বধ্যভূমি শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি মুক্তিযুদ্ধের সেই ভয়াবহ সময়ের নীরব সাক্ষ্য। এখানে এসে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু অব্যবস্থাপনা, অন্ধকার, মাদকসেবীদের আড্ডা ও স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি সেই স্মৃতির পরিবেশকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

তাই স্থানীয়রা বধ্যভূমিটির সংস্কার ও নিয়মিত পরিচর্যার পাশাপাশি পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, সীমানা সুরক্ষা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, জাতীয় দিবসকেন্দ্রিক সাময়িক পরিচ্ছন্নতার বদলে বছরজুড়ে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় নজরদারি নিশ্চিত করে বধ্যভূমিটিকে মাদকসেবীদের আড্ডামুক্ত করা হবে।

তাঁদের মতে, যে মাটিতে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় অসংখ্য বাঙালি নারী-পুরুষের রক্ত ঝরেছে, সেই মাটির স্মৃতি কেবল ফলক বা স্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। যথাযথ সংরক্ষণ, নিরাপত্তা ও পরিচর্যার মধ্য দিয়েই নতুন প্রজন্মের কাছে ফয়জাবাদ বধ্যভূমির ইতিহাস আরও জীবন্ত করে তোলা সম্ভব।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর