ধান বাঁচলেও খড় বাঁচেনি, হাওরে গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে কৃষক
বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩১ AM

ধান বাঁচলেও খড় বাঁচেনি, হাওরে গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে কৃষক

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৩০/০৯/২০২৬ ১০:৪২:১৫ AM

ধান বাঁচলেও খড় বাঁচেনি, হাওরে গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে কৃষক


ধান ঘরে তুলতে পেরেছেন, কিন্তু গোয়াল ভরার মতো খড় তুলতে পারেননি সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকদের এবারের বোরো মৌসুমের গল্পটা যেন এমনই। অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বন্যার পানির মধ্যেই কোনোমতে ধান কেটে ঘরে তুলেছেন তাঁরা। কিন্তু পানিতে তলিয়ে থাকায় খড় সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। এখন গবাদিপশুর মুখে খাবার তুলে দিতে প্রতিদিন হাওরের পানিতে নেমে জলাবন বা এড়াইল কেটে আনছেন কৃষকেরা।

হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনে বোরো ধান আর গবাদিপশু পালন পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ভালো ফলন হলে একদিকে যেমন বছরের খাবারের সংস্থান হয়, অন্যদিকে কৃষকের সংসারের খরচ ও গবাদিপশুর খাদ্যের ব্যবস্থাও হয়। কিন্তু গত এপ্রিলে অতিবৃষ্টি ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে হাওরের বোরো ফলন ডুবে যাওয়ায় এবার সেই চক্রে ছন্দপতন ঘটেছে।

ফসলের সঙ্গে এবার কৃষকের ঘরে ওঠেনি প্রয়োজনীয় খড়ও। ফলে বোরো কাটার পর যে খড় দিয়ে কয়েক মাস গরু-মহিষের খাদ্যের জোগান মেটানোর কথা, সেটি এখন নেই। বিকল্প হিসেবে হাওরের পানির মধ্যে জন্মানো জলাবন বা এড়াইলই হয়ে উঠেছে গবাদিপশু বাঁচিয়ে রাখার অন্যতম ভরসা।

জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জে গবাদিপশু আছে ৬ লাখ ১০ হাজার ৯৯০টি। এর মধ্যে গরু ৫ লাখ ৪০ হাজার, মহিষ ২১ হাজার ১০০টি ও ছাগল আছে ৪৯ হাজার ৮৯০টি। বিপুলসংখ্যক এসব গবাদিপশুর খাদ্য জোগান নিয়ে তাই উদ্বেগ বাড়ছে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে।

গত শনিবার সকালে নৌকাযোগে শনি হাওর ঘুরে দেখা যায়, চারদিকে থইথই পানি। সেই পানির বুকেই স্থির ভাসছে জলাবন হিসেবে পরিচিত আগাছাজাতীয় বড় বড় ঘাস-লতা। একের পর এক নৌকা নিয়ে সেখানে যাচ্ছেন কৃষকেরা। কেউ পানির মধ্যে নেমে, আবার কেউ নৌকা থেকেই জলাবন কেটে সংগ্রহ করছেন। গবাদিপশুর জন্য এই জলাবনই এখন তাঁদের কাছে যেন পানির ওপর ভেসে থাকা একমাত্র আশ্রয়।

তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর ও জামালগঞ্জ এই তিন উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত শনি হাওর। প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রামের কৃষক সেখানে জলাবন বা এড়াইল সংগ্রহ করতে আসেন। জলাবন কাটতে আসা লোকজন জানান, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাওরে জলাবন সংগ্রহকারীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে।

টইটম্বুর পানির মধ্যে নৌকায় করে জলাবন কাটছিলেন নূর ইসলাম, মুকুল রায় ও আলী নূরসহ কয়েকজন কৃষক। তাঁদের কথায় উঠে আসে এবারের বোরো মৌসুমের ক্ষতির চিত্র। তাঁরা বলেন, ‘বছর গেছে খারাপ। খড় তুলতে পারিনি। হাওরের জলাবন গরুর জান বাঁচাইছে।’

খড়ের অভাবে শুধু গোখাদ্যের জোগান নয়, গবাদিপশু ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে অনেকের জন্য। তাহিরপুরের দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের শাহগঞ্জ গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, খড়ের অভাবে মহিষগুলো চার মাস আগে নেত্রকোনার কলমাকান্দায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠিয়েছিলেন। কিছুদিন আগে সেগুলো আবার বাড়িতে নিয়ে এসেছেন।

তাহিরপুরের মহালিয়া হাওর উন্নয়ন কমিটির সভাপতি মো. সিরাজুল হক বলেন, ফলনমরা বছর হওয়ায় বেশির ভাগ মানুষ খড় ঘরে তুলতে পারেননি। গোখাদ্যের অভাবে অনেকেই গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন।

স্থানীয় পর্যায়েও এখন সরকারি সহায়তার দাবি উঠছে। জামালগঞ্জের বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুব্রত সামন্ত সরকার বলেন, ‘কৃষকের কথা চিন্তা করে সরকারের পক্ষ থেকে গোখাদ্য সহায়তার বিষয়টি ভাবা দরকার।’

প্রাণিসম্পদ বিভাগও সংকটের বিষয়টি স্বীকার করছে। সুনামগঞ্জ প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মিজানুর রহমান মিয়া বলেন, জেলায় প্রায় ছয় লাখের বেশি গবাদিপশু আছে। গোখাদ্যের সংকটের সময় সহায়তার জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু গোখাদ্য কিনতে বরাদ্দ যা আসে, তা যৎসামান্য।

ফলে হাওরে এবার বোরো ধানের ক্ষতির প্রভাব শুধু কৃষকের গোলায় আটকে নেই; তার আঁচ পড়েছে গোয়ালঘরেও। পানিতে ডুবে যাওয়া খড়ের জায়গা নিয়েছে জলাবন, আর সেই জলাবন সংগ্রহ করেই গবাদিপশু টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন কৃষকেরা। তবে হাওরের পানি নামার আগ পর্যন্ত এই বিকল্প খাদ্যের জোগান কতটা টিকবে, আর খড়ের সংকটে কতজন কৃষক শেষ পর্যন্ত গবাদিপশু ধরে রাখতে পারবেন সেটিই এখন বড় দুশ্চিন্তার বিষয়।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর