বড়লেখায় সড়কের মাঝেই দুর্ঘটনার ফাঁদ, দেবে গেছে গ্যাসের ম্যানহোল
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৫ PM

বড়লেখায় সড়কের মাঝেই দুর্ঘটনার ফাঁদ, দেবে গেছে গ্যাসের ম্যানহোল

বড়লেখা (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৫/০৯/২০২৬ ০৪:৫৩:৩৪ PM

বড়লেখায় সড়কের মাঝেই দুর্ঘটনার ফাঁদ, দেবে গেছে গ্যাসের ম্যানহোল


সড়কের বুক চিরে নেমে গেছে গভীর এক ফাঁদ। পিচের সমতল থেকে অনেকটা নিচে দেবে গেছে গ্যাসের ম্যানহোলের ঢাকনা। দূর থেকে সহজে বোঝারও উপায় নেই। ফলে বড়লেখা পৌর শহরের ব্যস্ততম সড়কের মাঝখানে প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে চলছে মোটরসাইকেল, রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন। একই পথ দিয়ে যাতায়াত করা শিক্ষার্থী ও পথচারীদেরও পেরোতে হচ্ছে দুর্ঘটনার শঙ্কা নিয়ে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাটি চোখের সামনে থাকলেও কার্যকর সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সমস্যাটির কথা জানার কথা স্বীকার করলেও এখনো কাজ শুরু হয়নি। তাই স্থানীয়দের প্রশ্ন আর কত দুর্ঘটনার পর সংস্কারে নড়বে কর্তৃপক্ষ?

সরেজমিনে দেখা গেছে, পৌর শহরের মধ্যবাজার এলাকায় ভূমি অফিসসংলগ্ন প্রধান সড়কের মাঝখানে গ্যাসলাইনের একটি ম্যানহোলের ঢাকনা আশপাশের পিচের স্তর থেকে অনেকটা নিচে দেবে গেছে। চারপাশের সড়কও ভেঙে অসমান হয়ে পড়েছে। দূর থেকে নিচু অংশটি স্পষ্ট না হওয়ায় চালকদের সেখানে পৌঁছে হঠাৎ ব্রেক করতে হচ্ছে, অথবা ঝুঁকি নিয়ে পাশ কাটিয়ে যেতে হচ্ছে।

এই সড়কের পাশেই রয়েছে রোকেয়া খাতুন লাইসিয়াম স্কুলসহ পৌর শহরের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সকাল ও ছুটির সময়ে শিক্ষার্থীদের বহনকারী রিকশা, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও অন্যান্য ছোট যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়। দেবে যাওয়া ম্যানহোলের কাছে যানবাহন হঠাৎ গতি কমানো কিংবা দিক পরিবর্তন করায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বিড়ম্বনাও বাড়ছে। কম বয়সী শিক্ষার্থীদের নিয়ে এ স্থান পার হওয়ার সময় উদ্বেগে থাকতে হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

বৃষ্টির সময় ঝুঁকি আরও বাড়ে। ম্যানহোলের চারপাশে পানি জমে গেলে সড়কের সমতল অংশ আর দেবে যাওয়া জায়গার পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে স্কুল ছুটির সময় শিক্ষার্থী, পথচারী ও ছোট যানবাহনের বাড়তি চাপ যুক্ত হওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়।

শুধু স্থানীয় যানবাহন নয়, এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন কুলাউড়া-শাহবাজপুর আঞ্চলিক রুটের পাশাপাশি ঢাকা-সিলেটসহ বিভিন্ন গন্তব্যের দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল করে। কাছেই রয়েছে উপজেলা ভূমি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং একাধিক এলাকার সংযোগ সড়ক। ফলে দিনভরই এ পথে যানবাহন ও পথচারীর চাপ থাকে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও চালকদের ভাষ্য, সড়ক সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের সময় পিচের স্তর উঁচু হলেও গ্যাসের ম্যানহোলগুলো আগের উচ্চতায় থেকে গেছে। ফলে সড়কের মাঝখানে তৈরি হয়েছে গভীর নিচু অংশ। বিশেষ করে রাতে কিংবা বৃষ্টির সময় সেখানে পানি জমলে বিপদ আরও বাড়ে। চালকেরা সামনে এসে হঠাৎ গর্ত দেখতে পেয়ে ব্রেক কষলে পেছন থেকে আসা যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কাও থাকে।

ম্যানহোলের নিচে থাকা গ্যাসলাইনের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন স্থানীয়দের একাংশ। তবে গ্যাসলাইনে কোনো ফাটল বা তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণঝুঁকি রয়েছে কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানায়নি।

অটোচালক ছায়দুল আহমদ নিজের দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘গত মাসে রাত আনুমানিক ১১টার দিকে বড় একটি বাসের পেছনে প্রায় ৩০ কিলোমিটার বেগে অটো চালাচ্ছিলাম। বাসটির বড় চাকা ম্যানহোলের ওপর দিয়ে চলে গেলেও আমার অটোর ছোট চাকা হঠাৎ দেবে যাওয়া অংশে পড়ে যায়। হার্ড ব্রেক করেও নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারিনি। পেছন থেকে একটি মোটরসাইকেল এসে ধাক্কা দেয়। অটোরিকশার ব্যাপক ক্ষতি হয়, দুই যাত্রীও আঘাত পান।’

তিনি অভিযোগ করে বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলার খেসারত চালক ও যাত্রীদের দিতে হচ্ছে।

ব্যবসায়ী আহমেদ আলী বলেন, দেবে যাওয়া ম্যানহোলের কারণে ছোট যানবাহনগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে। শহরের প্রাণকেন্দ্র হওয়ায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীও এ সড়ক ব্যবহার করে। বৃষ্টি হলে সেখানে পানি জমে যায়। তখন গর্ত বোঝার কোনো উপায় থাকে না। পাশে আরও একটি ঝুঁকিপূর্ণ ম্যানহোল আমরা কয়েকজন ব্যবসায়ী মিলে ইট-বালু দিয়ে সাময়িকভাবে ঠিক করেছি। কিন্তু এভাবে তো স্থায়ী সমাধান হবে না।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) বড়লেখা উপজেলা শাখার দুর্ঘটনা ও অনুসন্ধানবিষয়ক সম্পাদক আব্দুল হামিদ বলেন, ‘সড়কের ওপর ম্যানহোলের ঢাকনা দেবে যাওয়ার কারণে নিয়মিত ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। আমরা এটি সংস্কারের জন্য বারবার দাবি জানাচ্ছি, অথচ এতদিনেও স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষকে ম্যানহোলগুলো সড়কের সমান লেভেলে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। বিষয়টি নিয়ে পৌর প্রশাসকের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে।’

ট্রাফিক সদস্য রুহুল আমিন বলেন, ‘প্রায় এক বছর ধরে ম্যানহোলটি পিচের স্তর থেকে নিচে দেবে আছে। এখানে ছোট-বড় দুর্ঘটনা প্রতিদিন ঘটছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানটি দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন।’

হাজীগঞ্জ বাজার বণিক সমিতির সদস্যসচিব আব্দুল হক জানান, বিষয়টি তারা অনেক আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। দ্রুত মেরামতের আশ্বাসও পাওয়া গেছে। তবে আশ্বাসের পরও কেন কাজ শুরু হয়নি, সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।

জালালাবাদ গ্যাস আঞ্চলিক বিতরণ কার্যালয়ের (বড়লেখা-জুড়ী) মার্কেটিং বিভাগের কর্মকর্তা মিনহাজুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি নজরে আসার পর আমরা দেবে যাওয়া ম্যানহোল সংস্কারের জন্য হেড অফিসে একাধিকবার যোগাযোগ করেছি। ধারাবাহিক কাজের চাপের কারণে হয়তো দেরি হচ্ছে। আমরা আবারও যোগাযোগ করছি, যাতে দ্রুত সংস্কার করা হয়।’

বড়লেখা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক নাঈমা নাদিয়া বলেন, ‘দেবে যাওয়া ম্যানহোলের বিষয়টি অনেক আগেই আমাদের নজরে এসেছে। জালালাবাদ গ্যাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করা হয়েছে, কিন্তু এখনো সংস্কার হয়নি। আমি আবারও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করব।’

ব্যস্ত সড়কের মাঝখানে দেবে যাওয়া ম্যানহোলটি এখন শুধু একটি ভাঙাচোরা অংশ নয়; প্রতিদিনের চলাচলের সঙ্গে মিশে থাকা এক অনিশ্চিত ঝুঁকি। সংস্কারের আশ্বাস মিললেও স্থায়ী সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছেন চালক, পথচারী, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর