নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সারা বছর বাজার তদারকি জোরদারের কথা জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তাঁর ভাষ্য, রমজানকেন্দ্রিক নয়, বছরজুড়েই বাজার স্থিতিশীল রাখাকে সরকারের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি পর্যালোচনা সংক্রান্ত সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাজারে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হতে দেওয়া হবে না। বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনো ব্যবসায়ী অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়ালে কিংবা অতিরিক্ত মুনাফার চেষ্টা করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী সংগঠন, আমদানিকারক, উৎপাদক ও সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সভায় ব্যবসায়ী নেতাদের উদ্দেশে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বাড়া স্বাভাবিক। তবে বাজার ব্যবস্থাপনা শুধু ওই সময়ের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। সারা বছর পণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখা এবং মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখাই সরকারের লক্ষ্য।
সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতির কারণ হিসেবে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বিভিন্ন শিল্পের উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে প্রতিবন্ধকতা এবং ঝড়-বৃষ্টিসহ প্রতিকূল আবহাওয়ার প্রভাবও কয়েকটি এলাকার বাজারে পড়েছে।
শীত মৌসুম সামনে থাকায় শিগগিরই নতুন সবজি বাজারে আসতে শুরু করবে এবং এতে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বাণিজ্যমন্ত্রী ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে নিয়মিত বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানান। তাঁর মতে, কোনো পণ্যের দামে দুই-চার টাকার ওঠানামা সামগ্রিক হিসাবে বড় না হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে বাজার নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। তাই শুধু দাম নিয়ন্ত্রণ নয়, বাজারের ওপর মানুষের আস্থা ধরে রাখাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে নজরদারি বাড়ানোর কথা জানান মন্ত্রী।
পাশাপাশি আমদানিকারকদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে পণ্যের মজুত, আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হবে। বাজার ও ব্যবসা স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করবে বলে জানান তিনি।
নিত্যপণ্যের মূল্য সহনীয় রাখতে বিদ্যমান কর কাঠামোর বিভিন্ন দিক পর্যালোচনার কথাও বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। দেশে উৎপাদিত পণ্য এবং যেসব পণ্যের এলসি ইতোমধ্যে খোলা হয়েছে বা জাহাজীকরণের পর্যায়ে রয়েছে, সেগুলোর তথ্যও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব নিয়েও সভায় কথা বলেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে দেশের অর্থনীতিকেও সেই চাপ বহন করতে হয়। সরকার ভোক্তাদের ওপর পুরো চাপ একসঙ্গে না দিয়ে এর একটি অংশ বহন করলে শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয় রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থার ওপর পড়ে। এ কারণে জ্বালানির দক্ষ ও সাশ্রয়ী ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।
সভায় বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের পক্ষ থেকে নিত্যপণ্যের চাহিদা, আমদানি, সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। সেখানে জানানো হয়, আগের বছরের তুলনায় নিত্যপণ্যের আমদানি ও এলসি খোলার পরিস্থিতি ইতিবাচক।
কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মসুর ডালের বার্ষিক চাহিদা প্রায় সাত লাখ মেট্রিক টন। গত বছরের ১ জুলাই থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪২ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল আমদানি হয়েছিল। চলতি বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ছয় হাজার মেট্রিক টনে।
ভোজ্যতেলের কাঁচামাল সিড আমদানিতেও প্রবৃদ্ধির তথ্য তুলে ধরা হয়। গত বছরের একই সময়ে দুই লাখ ৭৩ হাজার টন সিড আমদানি হলেও চলতি বছর তা বেড়ে তিন লাখ ৮৬ হাজার টনে পৌঁছেছে।
দেশে চিনির বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২০ থেকে ২১ লাখ টন। এর মধ্যে শুধু রমজান মাসেই প্রায় তিন লাখ টন চিনির প্রয়োজন হয়। কমিশনের উপস্থাপনায় সামগ্রিকভাবে নিত্যপণ্যের আমদানি ও পাইপলাইন পরিস্থিতি ইতিবাচক রয়েছে বলে জানানো হয়।
পণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে ট্রেসেবিলিটি কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। এর মাধ্যমে উৎপাদন থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত সরবরাহের বিভিন্ন ধাপ পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে।
ডিম ও পোল্ট্রিসহ গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপণ্যকে এই কার্যক্রমের আওতায় অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
সভায় ব্যবসায়ী নেতারা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন, সরবরাহ ও বাজারদর নিয়ে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন এবং বাজার স্থিতিশীল রাখতে পরামর্শ দেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, পর্যাপ্ত পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা, যৌক্তিক মূল্য বজায় রাখা এবং ভোক্তাদের আস্থা ধরে রাখাই সরকারের লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সমন্বিত ভূমিকার প্রয়োজন রয়েছে। ব্যবসায়ী নেতাদের পরামর্শ বাজার ব্যবস্থাপনা ও নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান নাসির উদ দৌলা, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম এবং ডাল, তেল, খেজুর, ডিম ও চিনি আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
অর্থনীতি ডেস্ক 








