বন সংকুচিত, লোকালয়ে বাড়ছে বন্যপ্রাণীর আনাগোনা
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৬ AM

বন সংকুচিত, লোকালয়ে বাড়ছে বন্যপ্রাণীর আনাগোনা

শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১২/০৯/২০২৬ ১০:৩১:০৮ AM

বন সংকুচিত, লোকালয়ে বাড়ছে বন্যপ্রাণীর আনাগোনা


বনাঞ্চল সংকুচিত হওয়া ও খাবারের উৎস কমে যাওয়ায় মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে লোকালয়ে বন্যপ্রাণীর আনাগোনা বাড়ছে। খাবার কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে মানুষের বসতিতে চলে আসা এমন ২০টি বন্যপ্রাণী গত এক মাসে উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন।

চলতি বছরের ১ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব প্রাণী উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া প্রাণীর তালিকায় রয়েছে অজগর, লজ্জাবতী বানর, উল্টোলেজি বানর, শঙ্খচিল, তক্ষক এবং বিভিন্ন প্রজাতির বিরল সাপ।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল জানান, আগস্টজুড়ে শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন স্থান থেকে ২০টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে অনেক প্রাণী ছিল আহত, ক্লান্ত কিংবা অসুস্থ। উদ্ধারের পর প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও পরিচর্যা শেষে সুস্থ প্রাণীগুলোকে বন বিভাগের সহায়তায় নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করা হয়েছে।

ফাউন্ডেশন সূত্র জানায়, ২ আগস্ট হাইল হাওর থেকে একটি অজগর উদ্ধারের মধ্য দিয়ে মাসের উদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়। ৩ আগস্ট আরামবাগ থেকে একটি বেত আঁচড়া এবং উত্তর ভাড়াউড়া থেকে আরেকটি অজগর উদ্ধার করা হয়। পরদিন ৪ আগস্ট পূর্বাশা আবাসিক এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় আরও একটি বেত আঁচড়া।

৬ আগস্ট হাইল হাওর থেকে একটি মৃত অজগর উদ্ধার করা হয়। ১২ আগস্ট শাহীবাগ থেকে একটি শঙ্খচিল এবং ১৩ আগস্ট ৫ নম্বর পুল এলাকা থেকে একটি অজগর উদ্ধার করা হয়। ১৪ আগস্ট হাইল হাওর থেকে উদ্ধার করা হয় আরও একটি অজগর।

উদ্ধার তালিকায় এরপর যুক্ত হয় তক্ষক, দাঁড়াশ সাপ, লজ্জাবতী বানরসহ বিরল প্রজাতির সাপ। ১৫ আগস্ট রূপশপুর থেকে একটি তক্ষক, নোয়াগাঁও থেকে একটি দাঁড়াশ সাপ, উত্তর ভাড়াউড়া থেকে একটি লজ্জাবতী বানর এবং বারিধারা আবাসিক এলাকা থেকে একটি বিরল প্রজাতির সাপ উদ্ধার করা হয়।

১৯ আগস্ট মাঝেরগাঁও থেকে একটি শঙ্খিনী সাপ উদ্ধারের পর ২১ আগস্ট শ্যামলী আবাসিক এলাকা থেকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট অবস্থায় একটি উল্টোলেজি বানর উদ্ধার করা হয়। ২৫ আগস্ট পূর্বাশা আবাসিক এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় আরও একটি শঙ্খিনী সাপ।

২৬ আগস্ট ভাড়াউড়া বাগান রোড থেকে একটি অজগর এবং সিন্দুরখান ইউনিয়নের কুঞ্জবন এলাকা থেকে বিরল সাইবোল্ডস ওয়াটার স্নেক উদ্ধার করা হয়। মাসের শেষ দিকে ২৮ আগস্ট ভাড়াউড়া ৫ নম্বর বস্তি কোয়ার্টার, ২৯ আগস্ট সাতগাঁও-খিলগাঁও এবং ৩০ আগস্ট ইছবপুর থেকে আরও তিনটি অজগর উদ্ধার করা হয়।

পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ বলেন, লোকালয়ে বন্যপ্রাণী চলে এলে আতঙ্কিত হয়ে অনেক সময় মানুষ সেগুলো হত্যা করেন। অথচ এসব প্রাণী প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই প্রাণীগুলোকে না মেরে নিরাপদে উদ্ধার করে উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল বলেন, তিনি নিজে এবং পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব বিভিন্ন সময় মানুষের ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও হাইল হাওর থেকে বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেন। অনেক প্রাণী আহত, ক্লান্ত কিংবা অসুস্থ অবস্থায় পাওয়া যায়। সেগুলোকে চিকিৎসা ও পরিচর্যার মাধ্যমে সুস্থ করে বন বিভাগের সহায়তায় আবার প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ আশপাশের বনাঞ্চল একসময় বন্যপ্রাণীর জন্য সমৃদ্ধ আবাসস্থল ছিল। কিন্তু মানুষের বসতি, রিসোর্ট, কৃষিজমি এবং অবাধ প্রবেশের কারণে সময়ের সঙ্গে বনাঞ্চল সংকুচিত হয়েছে। এর ফলে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র ও খাদ্যের উৎসও কমেছে। এমন পরিস্থিতিতেই প্রাণীগুলো লোকালয়ের দিকে চলে আসছে।

তাদের আশঙ্কা, বন ধ্বংসের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বন্যপ্রাণীর পাশাপাশি পুরো বাস্তুতন্ত্রও হুমকিতে পড়বে। খাদ্যশৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রায়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদ সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল ঢাকা মেইলকে বলেন, মানুষের দখল ও অযত্নে প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ায় বন্যপ্রাণীরা লোকালয়ে চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটি প্রাণীরই আলাদা ভূমিকা রয়েছে। বন ও পরিবেশ রক্ষা করা না গেলে এসব প্রাণী একসময় পৃথিবী থেকে হারিয়ে যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, বন্যপ্রাণী উদ্ধার শুধু প্রাণ রক্ষার কাজ নয়; এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যেও সচেতনতা তৈরি করা সম্ভব।

বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, উদ্ধার করা প্রাণীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। পরে প্রাণীর শারীরিক অবস্থা ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর