সিসিকের বর্জ্যে সম্পদে রূপান্তরের কথা থাকলেও জমছে আবর্জনার পাহাড়
শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ১১:০৭ AM

সিসিকের বর্জ্যে সম্পদে রূপান্তরের কথা থাকলেও জমছে আবর্জনার পাহাড়

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৬/০৬/২০২৬ ০৮:৫০:৪৩ AM

সিসিকের বর্জ্যে সম্পদে রূপান্তরের কথা থাকলেও জমছে আবর্জনার পাহাড়


প্রায় ১০ লাখ মানুষের শহর সিলেট সিটি করপোরেশনে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ টন বর্জ্য উৎপাদন হয়। এই বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করতে দেশের প্রথম ম্যাটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটির (এমআরএফ) মাধ্যমে বর্জ্য পৃথকীকরণ করছে সিসিক। গত দেড় বছর ধরে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ টন বর্জ্য পৃথক করা হচ্ছে।

তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হলেও পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ডাম্পিং স্টেশনের তীব্র দুর্গন্ধে নাকাল স্থানীয় বাসিন্দারা। পাশাপাশি বর্জ্য পৃথকীকরণ প্রক্রিয়া থেকে নির্গত কালো রঙের বিষাক্ত তরল আশপাশে ছড়িয়ে পড়ছে বলে দাবি করছেন তারা। এতে চাষাবাদ ও মাছের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

অন্যদিকে পুরো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। আধুনিক মেশিনে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে প্লাস্টিক ও পলিথিন আলাদা করা হচ্ছে। এর মধ্যে গড়ে ৬০ থেকে ৭০ টন প্রক্রিয়াজাত প্লাস্টিক ও পলিথিন লাফার্জ সিমেন্ট কারখানায় পাঠানো হচ্ছে। অবশিষ্ট বিপুল পরিমাণ প্রক্রিয়াজাত বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনের ভেতরেই স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে অপ্রক্রিয়াজাত বর্জ্যও সেখানে ফেলা হচ্ছে। ফলে প্রতিদিনই বর্জ্যের পাহাড় আরও বড় হচ্ছে।

অবশ্য সিটি করপোরেশন বলছে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উন্নয়নের সূচনা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও প্রকল্প নেওয়া হবে। তাদের দাবি, কারিগরি সহযোগিতার অংশ হিসেবে প্রতিদিনের প্লাস্টিক ও পলিথিন লাফার্জে সরবরাহ করা হচ্ছে। এগুলো আলাদা করে বিট বানিয়ে বিক্রির মতো অবকাঠামো ও জনবল বর্তমানে সীমিত। পর্যাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনিক্যাল জনবল নিয়োগে সময় প্রয়োজন।

পরিবেশবান্ধব উপায়ে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে সিলেট সিটি করপোরেশন ও লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশ যৌথভাবে ম্যাটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটি (এমআরএফ) প্রকল্পটি চালু করে। প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে দক্ষিণ সুরমার লালমাটিয়া ডাম্পিং গ্রাউন্ডে আধুনিক বর্জ্য পৃথকীকরণ প্লান্ট স্থাপন করা হয়। ২০২৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি এটি উদ্বোধন করা হলেও কার্যক্রম শুরু হয় গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে।

প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল নগরীর বর্জ্য পৃথক করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান উদ্ধার, পরিবেশ দূষণ হ্রাস এবং ডাম্পিং স্টেশনের চাপ কমানো। কিন্তু উদ্বোধনের প্রায় দেড় বছর পর বাস্তবতা ভিন্ন চিত্রই তুলে ধরছে।

প্ল্যান্টে পৃথক করা বর্জ্যের বড় একটি অংশ এখনো ডাম্পিং স্টেশনে জমা হচ্ছে। অন্যদিকে প্ল্যান্ট থেকে নির্গত কালো বিষাক্ত তরল এবং ডাম্পিং স্টেশনের বর্জ্য বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে আশপাশের কৃষিজমি ও জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

২০২২ সালে সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিব ডাম্পিং স্টেশন স্থানান্তরের বিষয়ে তৎকালীন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে একটি পত্র দিয়েছিলেন।

সিসিকের তথ্যমতে, সিলেটে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে ২৫০ থেকে ৩০০ টন আসে বাসা-বাড়ি ও গৃহস্থালি থেকে। এসব বর্জ্য পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সংগ্রহ করে ডাম্পিং স্টেশনে নিয়ে যান। অবশিষ্ট প্রায় ১৫০ টন বর্জ্য ড্রেন, ছড়া, ভাঙারি ব্যবসায়ী ও মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। এসব বর্জ্য পরবর্তীতে বিভিন্ন চ্যানেলের মাধ্যমে আবার ডাম্পিং স্টেশনে এসে পৌঁছায়।

সিসিক আরও জানায়, আধুনিক প্ল্যান্টের মাধ্যমে বাসা-বাড়ি ও রেস্টুরেন্টের অন্তত ১৫০ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা হয়। সেখান থেকে গড়ে প্রায় ৫০ টন প্লাস্টিক ও পলিথিন আলাদা করা হয়, যা লাফার্জ সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অবশিষ্ট বর্জ্য আবার ডাম্পিং স্টেশনে স্তুপ করে রাখা হয়। লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশ এই প্ল্যান্টের কারিগরি সহযোগিতা ও রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে। এর বিনিময়ে প্রতিদিন উৎপন্ন পলিথিন-প্লাস্টিক সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় নিয়ে যাওয়া হয়।

প্ল্যান্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন তিন শিফটে শ্রমিকরা কাজ করেন। প্রায় ৩০০ টন বর্জ্য পৃথক করা হয়। এরপর চারটি ট্রাকে করে পলিথিন ও প্লাস্টিক লাফার্জ সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে পাঠানো হয়। প্রতিটি ট্রাকে প্রায় ১৬ টন বর্জ্য পরিবহন করা হয়। পৃথকীকরণের পর অবশিষ্ট বর্জ্য কার্যকর ব্যবস্থাপনার অভাবে ডাম্পিং স্টেশনের ভেতরেই স্তূপ আকারে জমা হচ্ছে। এখানে ৯ জন ড্রাইভার, ৪ জন সুপারভাইজার এবং ২০ থেকে ২৫ জন শ্রমিক কাজ করছেন। তেল, বিদ্যুৎ ও বেতনসহ মাসিক ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা।

সরেজমিনে দেখা যায়, ডাম্পিং স্টেশনের বিভিন্ন স্থানে খোলা আকাশের নিচে বর্জ্যের বিশাল স্তুপ পড়ে আছে। চারপাশে তীব্র দুর্গন্ধে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে বর্জ্য থেকে নির্গত কালো রঙের তরল পদার্থ ড্রেনের মাধ্যমে পাশের কৃষিজমি ও নিচু এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে, যা খাল-বিলেও মিশছে। ফলে আশপাশের এলাকায় ফসলি জমির পরিমাণ কমে গেছে এবং কোথাও কোথাও আগের মতো উৎপাদনও হচ্ছে না।

তবে সিসিকের দাবি, নিয়মিতভাবে তরল পানি বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। শুধু অতিবৃষ্টির সময় সামান্য পানি আশপাশে যেতে পারে।

পারাইরচক এলাকার বাসিন্দা জামাল মিয়া বলেন, বৃষ্টির সময় ডাম্পিং স্টেশনের পানি জমিতে ঢুকে পড়ে। এতে ধানের চারা নষ্ট হয় এবং জমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে। আগে যেখানে ভালো ফসল হতো, এখন সেখানে উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। আশপাশের বিল ও জলাশয়ে মাছও আগের মতো পাওয়া যায় না।

সিসিকের প্রধান বর্জ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ একলিম আবদীন বলেন, দেড় বছর আগের এক স্টাডি অনুযায়ী প্রতিদিন ২০০ টন বর্জ্য আসত, যা বর্তমানে প্রায় ৪৭৫ টনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে আমরা ৩০০ টনের বেশি বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিবহন করছি। কিছু বর্জ্য ভাঙারি চ্যানেলে চলে যায়, কিছু ড্রেন ও ছড়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে কলোনি ও নতুন এলাকায় এই সমস্যা বেশি।

তিনি জানান, এমআরএফ প্ল্যান্টে প্রতিদিন ১৫০ টনের বেশি বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত হয় এবং সেখান থেকে প্রায় ৫০ টন প্লাস্টিক ও পলিথিন আলাদা করা হয়। এগুলো লাফার্জে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, বাকি অংশ ডাম্পিংয়ে ফেলা হচ্ছে।

সব বর্জ্য একসঙ্গে রেখে সম্পদে রূপান্তর সম্ভব কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বায়োমাইনিংয়ের মতো প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে, তবে এতে বড় বিনিয়োগ ও সময় প্রয়োজন।

বিষাক্ত তরল পানির বিষয়ে তিনি জানান, অতীতে একবার অতিবৃষ্টির সময় পানি বাইরে গিয়েছিল, পরে তা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। নিয়মিত লিকেজ হওয়ার কোনো তথ্য তার কাছে নেই।

লাফার্জের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা টেকনিক্যাল সাপোর্ট ও রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে। প্রতিদিন ৫০ টন প্লাস্টিক সরিয়ে নেওয়ায় বর্জ্যের চাপ কিছুটা কমছে, যা ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন তারা।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর