ঈদুল আজহার আর দিন দশেক বাকি আছে। কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই চলছে নানান প্রস্তুতি। তবে ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে গত বছরের বকেয়া অর্থ পুরোপুরি না পাওয়ায় সরবরাহকারীরা অর্থসংকটে রয়েছেন। একই সঙ্গে অতিরিক্ত গরম, সংরক্ষণে দুর্বলতা ও পরিবহন জটিলতায় এবারও বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে চামড়া সংরক্ষণে প্রশিক্ষণ প্রদান, পর্যাপ্ত লবণ সরবরাহ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহায়তার মতো নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিবছর ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে দেশে কয়েক লাখ পশু কোরবানি হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অর্থকরী কাঁচামাল হলো গরুর চামড়া। কিন্তু কয়েক বছর ধরেই কাঁচা চামড়ার বাজারে অস্থিরতা, সিন্ডিকেট, লবণ সংকট, পরিবহন জটিলতা ও ট্যানারি শিল্পের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না এই চামড়ার প্রত্যক্ষ উপকারভোগী এতিমখানা, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী।
প্রতি বছর সরকার কাঁচা চামড়ার ন্যূনতম দাম নির্ধারণ করলেও বাস্তবে সেই দাম কার্যকর হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। মাঠপর্যায়ে নজরদারির অভাব, মৌসুমি ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণে ঘোষিত মূল্য অনেক সময় কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। এবার আগেভাগে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সংরক্ষণ প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত লবণ সরবরাহ, মোবাইল মনিটরিং টিম এবং সরাসরি ট্যানারির সঙ্গে সংগ্রাহকদের সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে আশা করা হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারও যদি সরকার কার্যকর তদারকি ও বাজার নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় না হয়, তাহলে ঈদের পর চামড়ার বাজারে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। এতে একদিকে যেমন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, অন্যদিকে হাজার হাজার চামড়া অব্যবস্থাপনায় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, স্বচ্ছ বাজারব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা গেলে দেশের চামড়া শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
প্রসঙ্গত, এ বছর গরুর কাঁচা চামড়ার দর ঢাকার ভেতরে প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকার বাইরে গরুর কাঁচা চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৫৭ থেকে ৬২ টাকা। সারাদেশে খাসির চামড়ার প্রতি বর্গফুট ২৫-৩০ টাকা এবং সারা দেশে বকরির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুটে ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারের প্রস্তুতি কতটা?
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ ও সঠিক ব্যবহারে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। চামড়া যেন নষ্ট না হয় এবং দেশের সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্পে যথাযথভাবে ব্যবহার করা যায়, সে লক্ষ্যে সারাদেশে বিনামূল্যে লবণ সরবরাহসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঈদের আগে বাকি জুমায় দেশের সকল মসজিদে খতিব ও ইমামদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যাতে তারা খুতবা ও বক্তব্যে চামড়া সংরক্ষণের গুরুত্ব এবং সঠিক পদ্ধতিতে চামড়া ছাড়ানোর গুরুত্ব তুলে ধরেন। পাশাপাশি জেলা প্রশাসকদের তত্ত্বাবধানে মাদ্রাসা, এতিমখানা, লিল্লাহ বোর্ডিং এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। বিভাগীয় কমিশনারদের বিশেষ মনিটরিং টিম গঠন এবং জেলা প্রশাসকদের প্রশিক্ষণ-পরবর্তী মাঠপর্যায়ে সক্রিয় তদারকির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কাঁচা চামড়ার গুণগত মান রক্ষায় সরকার ইতোমধ্যে দেশব্যাপী মাদ্রাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে বিনামূল্যে লবণ সরবরাহের জন্য ১৭ কোটির অধিক টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ে ৫০ হাজার টাকা এবং জেলা পর্যায়ে ৭৫ হাজার টাকা করে মোট ২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
চামড়া সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৩ লাখ পোস্টার ও ৮ লাখ লিফলেট বিতরণ করা হবে। টেলিভিশন, রেডিও, জাতীয় পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমেও প্রচার কার্যক্রম চালানো হবে। ঈদের তিন দিন আগে থেকে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে সচেতনতামূলক তথ্যচিত্র প্রচার করা হবে।
এছাড়া কোরবানির ২ থেকে ৪ ঘণ্টার মধ্যে সঠিকভাবে চামড়ায় লবণ প্রয়োগ, প্রতি গরুর চামড়ায় ৮ থেকে ১০ কেজি এবং প্রতি ছাগলের চামড়ায় ৩ থেকে ৪ কেজি লবণ ব্যবহার, বায়ু চলাচলসমৃদ্ধ স্থানে চামড়া সংরক্ষণ, স্থানীয় পর্যায়ে ৭ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত চামড়া সংরক্ষণে উৎসাহ প্রদান, পশুর হাটে পর্যাপ্ত লবণ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, অপপ্রচার ও চামড়া বিনষ্টকারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সড়ক ও মহাসড়কের পাশে পশুর হাট না বসানো এবং কোরবানির বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নির্দেশনাও রয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।
ট্যানারি মালিকরা অর্থসংকটে
সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরীতে এখনও অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরতে পারেনি। আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়া, ব্যাংকঋণ সংকট এবং পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতার কারণে বেশ কয়েকটি ট্যানারি আর্থিক চাপে রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ট্যানারিগুলো পর্যাপ্ত মূলধন না থাকায় ঈদের সময় বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া কিনতে পারে না। এবারও বাজারে চাহিদা কমে গেলে দাম পড়ে যেতে পারে। আড়তদাররা বলছেন, চামড়া সংরক্ষণের খরচ অনেক বেড়েছে। কিন্তু বিক্রির নিশ্চয়তা নেই।
দুশ্চিন্তায় মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো
দেশের বহু কওমি মাদ্রাসা ও এতিমখানার পরিচালন ব্যয়ের একটি বড় অংশ আসে ঈদুল আজহার সময় প্রাপ্ত চামড়া বিক্রির অর্থ থেকে। সারা বছরের বিভিন্ন ব্যয় মেটাতে এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বাজারদর কমে গেলে প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রাজধানীর একটি মাদ্রাসার শিক্ষক বলেন, আগে একটি গরুর চামড়া থেকে ভালো টাকা পাওয়া যেত। এখন অনেক সময় পরিবহন খরচও ওঠে না। ফলে সংগ্রহে আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, ‘কোরবানির চামড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ। যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে দেশের চামড়া শিল্প, রপ্তানি আয় এবং এতিমখানা, মাদ্রাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিংগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু সামান্য অসচেতনতার কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়। এ পরিস্থিতি রোধে সরকার এবার ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। কোরবানির একটি চামড়াও যেন নষ্ট না হয়- এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বারোপ করেছেন। আমরা এটিকে একটি জাতীয় দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি।’
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা যদি পরিকল্পনাগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে ইনশাআল্লাহ এ বছর একটি চামড়াও নষ্ট হবে না এবং দেশের এই মূল্যবান সম্পদ সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।’
কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মঞ্জুরুল হাসান বাংলানিউজকে বলেন, এখনো অনেক ট্যানারি মালিক চামড়া সরবরাহকারীদের টাকা পরিশোধ করেনি। ফলে চামড়া সংগ্রহের প্রস্তুতিতে ধীরগতি রয়েছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যে অর্থ ছাড় হলে প্রস্তুতি আরও জোরদার করা হবে বলে আশা করছেন তিনি।
তিনি বলেন, কোরবানির চামড়া সংরক্ষণে ব্যবহৃত লবণের দাম কেজিপ্রতি দুই থেকে তিন টাকা বেড়েছে। তবে লবণের কোনো বিকল্প না থাকায় বাড়তি খরচের প্রভাব শেষ পর্যন্ত চামড়ার দামের ওপর পড়তে পারে।
সরকার নির্ধারিত দামের বিষয়ে মঞ্জুরুল হাসান বলেন, বাস্তবে বাজার পরিস্থিতি কেমন হবে, তা বোঝা যাবে ঈদের দিন। প্রতি বছরই সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে চামড়া বিক্রির অভিযোগ ওঠে, বিশেষ করে রাতের বেলায় সংগ্রহ করা চামড়ার ক্ষেত্রে।
তার ভাষ্য, জবাইয়ের চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে চামড়ায় লবণ দিতে না পারলে পচন ধরার ঝুঁকি থাকে। দিনের বেলায় দ্রুত সংরক্ষণ সম্ভব হলেও রাতে অনেক সময় বিলম্ব হয়। এতে চামড়ার মান কমে যায় এবং ব্যবসায়ীরা ন্যায্যমূল্য দিতে চান না।
মৌসুমি ব্যবসায়ীদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, অনেকেই পর্যাপ্ত লবণ মজুত না রেখেই কাঁচা চামড়া কিনতে নামেন। এতে লবণসংকট, শ্রমিকস্বল্পতা ও জায়গার অভাবে চামড়া নষ্ট হওয়ার ঘটনা ঘটে। অতিরিক্ত গরমে এবারও চামড়া দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও মনে করছেন তিনি।
চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এবারও প্রায় লাখখানেক চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে। তবে রাজধানীর পোস্তা এলাকায় গুদাম কমে যাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী এখন সাভারের হেমায়েতপুর এলাকায় গুদাম ভাড়া নিচ্ছেন। সেখানে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) পুরোপুরি চালু না হওয়ায় পরিবেশগত ঝুঁকিও রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন মঞ্জুরুল হাসান।
বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোটার্স এসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আশরাফ উদ্দিন আহমদ খান বাংলানিউজকে বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির চামড়া সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কিশোরগঞ্জ, যশোর ও কুলাউড়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে চামড়াসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে সভা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, কোরবানির পর পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে সঠিকভাবে লবণ দিতে পারলে চামড়া নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে যাবে। মাঠপর্যায়ে সরকারি নির্দেশনাও পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
আশরাফ উদ্দিন আহমদ খান আরো জানান, সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে টানা তিন মাস নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিলে যেন শিল্পাঞ্চলে ডিজেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়, সে বিষয়েও জ্বালানি বিভাগকে অনুরোধ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এনএসআই ও প্রশাসনের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে শিল্পমালিকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেদার ইন্সটিটিউটের শিক্ষকেরাও মাঠপর্যায়ে চামড়া সংরক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।
চামড়া খাতের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে আশরাফ খান বলেন, প্রতিবছর কিছু প্রস্তুতি নেওয়া হলেও বাস্তবায়নের ঘাটতির কারণে বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়।
গত বছর ২০ শতাংশের বেশি চামড়া নষ্ট হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এবারও অতিরিক্ত গরম ও বৃষ্টির কারণে ঝুঁকি রয়েছে। সরকারের সহায়তা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে, অন্যথায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে।
চামড়া ব্যবসায়ী বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি আফতাব খান বলেন, ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের সঙ্গে বৈঠক করেই এবার চামড়ার দাম বাড়ানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি আরও ভালো থাকলে দাম আরও বাড়তে পারত।
তিনি বলেন, সারা বছরের মোট কাঁচা চামড়ার প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশই আসে কোরবানির ঈদে। তাই এই সময় চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য সরকার মাদ্রাসাগুলোতে বিনা মূল্যে লবণ বিতরণ করেছে।
আবতাফ খান জানান, কোরবানির পর সাত থেকে আট ঘণ্টার মধ্যে লবণ দিতে না পারলে চামড়ার মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অতিরিক্ত গরম, যানজট ও যোগাযোগ সমস্যার কারণে প্রতিবছরই ১০ থেকে ১৫ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়।
তিনি বলেন, শুধু দাম বাড়ালেই হবে না, স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত চামড়া লবণজাত করতে হবে। ঢাকার বাইরের চামড়া স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণ করা গেলে দরপতন ও পচনের ঝুঁকি কমবে। তবে দ্রুত বেশি দামের আশায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বাইরের চামড়া ঢাকায় নিয়ে আসেন, এতে দীর্ঘ পথে পরিবহনের কারণে চামড়া নষ্ট হয় এবং বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ট্যানারি মালিকদের বকেয়া অর্থ দ্রুত পরিশোধের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কেউ পুরো টাকা দেন, কেউ আংশিক দেন, আবার কেউ দেন না। যারা টাকা পরিশোধ করেন না, তাদের কারণেই ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েন।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও সালমা ট্যানারির স্বত্বাধিকারী মো. সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, সরকার কোরবানির চামড়া সংরক্ষণে লবণ বিতরণের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা ইতিবাচক। তবে বাস্তবায়নে দুর্বলতা থাকায় অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। মাদরাসা ও এতিমখানার শিক্ষার্থীরা চামড়া সংগ্রহ করলেও সঠিকভাবে লবণ প্রয়োগের অভিজ্ঞতা না থাকায় সময়মতো সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না। এতে চামড়া নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
তিনি বলেন, সাধারণত শিক্ষার্থীরা রাত পর্যন্ত চামড়া সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত থাকে। পরে ক্লান্ত অবস্থায় তাদের দিয়েই চামড়ায় লবণ দিতে বলা হয়। কিন্তু অভিজ্ঞতার অভাবে অনেক সময় ঠিকভাবে লবণ প্রয়োগ হয় না। ফলে সকালে দেখা যায় লবণ পড়ে আছে, কিন্তু চামড়া ঠিকমতো সংরক্ষণ হয়নি। গত বছরে এমন পরিস্থিতি হয়েছিল।
মো. সাখাওয়াত উল্লাহর মতে, শুধু লবণ বিতরণ করলেই হবে না, মাদরাসা ও এতিমখানাগুলোতে এ কাজ তদারকির ব্যবস্থাও রাখতে হবে। চামড়া সংগ্রহের পাশাপাশি প্রশিক্ষিত আলাদা দল দিয়ে তাৎক্ষণিক লবণ প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে ক্ষতি অনেকটা কমানো সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের (বিস) গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির খান বলেন, সরকার প্রতিবছরই চামড়া খাতে নানা উদ্যোগ নিলেও সেগুলোর বেশির ভাগ বাস্তবায়নের অভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না। তবে এবার ঘোষিত উদ্যোগগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে চামড়ার দাম বৃদ্ধি ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সাধারণত ব্যাংকঋণ থেকে বঞ্চিত হন। এবার সময়মতো ঋণ পেলে তাঁরা দ্রুত চামড়া সংগ্রহ করতে পারবেন এবং বিক্রেতাদেরও ন্যায্য দাম দেওয়া সম্ভব হবে।
সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতাকে চামড়া খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সময়মতো সংগ্রহ ও সংরক্ষণ না হওয়ায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়। শুধু সংরক্ষণ নয়, আন্তর্জাতিক বাজার ও ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’–এর সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানোর ওপরও জোর দেন তিনি।
ড. মাহফুজ কবির বলেন, গরম ও বৃষ্টির কারণে চামড়া দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য প্রশাসনকে মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে সংকট তৈরি করবে বা দেরি করবে, তাদের বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
এদিকে কোরবানির ঈদ সামনে রেখে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে চলছে জোর প্রস্তুতি। কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) সংস্কারের পাশাপাশি অকেজো ও পুরোনো যন্ত্রপাতি বিশেষ করে মোটর ও পাম্প মেরামত ও প্রতিস্থাপনের কাজ চলছে। সংস্কার করা হচ্ছে কঠিন বর্জ্য রাখার ডাম্পিং স্টেশনও। একই সঙ্গে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল মজুত করছেন ট্যানারি মালিকেরা।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব প্রস্তুতিতে কিছুটা ধাক্কা দিয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়া এবং জ্বালানি সংকটে প্রায় ১৫ দিন ট্যানারিগুলোর উৎপাদন বন্ধ ছিল। এতে ঈদকে ঘিরে প্রস্তুতিতে ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ট্যানারি মালিকেরা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন-এর চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে চামড়া শিল্পনগরীর প্রস্তুতি ধাপে ধাপে এগোচ্ছে। তবে শিল্প মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক এখনো বাকি রয়েছে। এসব বৈঠকের পরই সার্বিক প্রস্তুতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট হবে।
তিনি বলেন, গত বছরের মতো এবারও মসজিদ, মাদরাসা ও এতিমখানায় বিনা মূল্যে লবণ বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো কোরবানির চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারে এবং ন্যায্যমূল্য পায়। প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ খাতে প্রায় ২০ কোটি টাকার লবণ বিতরণ করা হবে।
বিসিক চেয়ারম্যান আরও বলেন, গত বছর প্রথমবার এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এবার সেটিকে আরও কার্যকর করতে লবণ বিতরণের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম যুক্ত করা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও বিসিকের সমন্বয়ে মাদরাসা ও এতিমখানা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং কসাইদের চামড়া সংরক্ষণ ও লবণ প্রয়োগের সঠিক পদ্ধতি শেখানো হবে। দক্ষ কসাইদের সম্পৃক্ত করে এই প্রশিক্ষণ পরিচালনা করা হবে, যাতে মাঠপর্যায়ে কার্যকর দক্ষতা তৈরি হয়।
উল্লেখ্য, দেশে এবার কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। এটি এ বছরের সম্ভাব্য চাহিদার চেয়ে ২২ লাখেরও বেশি। এ বছর চাহিদা এক কোটি এক লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি পশুর। এবার কোরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি গরু ও মহিষ, ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি ছাগল ও ভেড়া এবং ৫ হাজার ৬৫৫টি অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী। এ বছর সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে। রাজধানী ঢাকায় থাকবে ২৭টি হাট। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৬টি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১১টি হাট বসবে। এসব হাটে ২০টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম দায়িত্ব পালন করবে।
এবারও অনলাইনে মিলবে কোরবানির পশু। গত কয়েক বছর ধরেই অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির পশু। বিষয়টি ধীরে ধীরে বেশি জনপ্রিয়ও হয়ে উঠছে। এবারও অললাইনে বসবে পশুর হাট।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
আজকের সিলেট ডেস্ক 








