উচ্চ রক্তচাপের নীরব মহামারি, অকালে ঝরছে শত শত প্রাণ
রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ১০:৫৭ AM

উচ্চ রক্তচাপের নীরব মহামারি, অকালে ঝরছে শত শত প্রাণ

আজকের সিলেট ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭/০৫/২০২৬ ০৯:০৯:৪৭ AM

উচ্চ রক্তচাপের নীরব মহামারি, অকালে ঝরছে শত শত প্রাণ


অসংক্রামক রোগগুলোর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ (হাইপারটেনশন) একটি দীর্ঘস্থায়ী জীবনব্যাপী রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী, বিশ্বে ১৪০ কোটি মানুষ (৩০-৭৯ বছর) উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে, যাদের বেশিরভাগ বাস করেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে।

উচ্চ রক্তচাপের ফলে অনেকে হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং কিডনি রোগের মতো অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। আর এতে মৃত্যু বহুগুণ বাড়ছে। বিশ্বে প্রতি বছর ১ কোটিরও বেশি মানুষ উচ্চ রক্তচাপের কারণে মারা যায়। এ সংখ্যা সকল সংক্রামক রোগে মোট মৃত্যুর চেয়েও বেশি। বাংলদেশেও উচ্চ রক্তচাপজনিত কারণে প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছেন শত শত মানুষ। বাংলাদেশেও উচ্চ রক্তচাপের নীরব মহামারি চলছে।

সবশেষ ‘বাংলাদেশ এনসিডি স্টেপস সার্ভে, ২০২২’ এর তথ্য অনুযায়ী প্রতি ৪ জনে ১ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ (২৩.৫ শতাংশ) উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপজনিত অসুস্থতা এবং অকালমৃত্যুর বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে অসংক্রামক রোগজনিত অকালমৃত্যু এক-তৃতীয়াংশে কমিয়ে আনা সংক্রান্ত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (লক্ষ্য ৩.৪) অর্জন কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।

এমন বাস্তবতায় সারা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও রোববার পালিত হচ্ছে বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এই দিবসটি পালন করা হয়।

উচ্চ রক্তচাপকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়, কারণ এর কোনো স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না, অথচ এটি স্ট্রোক ও হৃদরোগ এবং অকালমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।

এই বছরের বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস এর মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে, ‘একসঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করি: নীরব ঘাতককে জয় করি’।

বিশ্বব্যাপী উচ্চ রক্তচাপ পরিস্থিতি
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে উচ্চ রক্তচাপ বিষয়ক ২য় বৈশ্বিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩০-৭৯ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর ৩৩ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত এবং ১৯৯০ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৬৫ কোটি থেকে বেড়ে ১৪০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে।

এ সময়ে উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ ধনী দেশগুলো থেকে কমে নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বব্যাপী উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত মানুষের মধ্যে মাত্র ৩২০ মিলিয়ন (২৩ শতাংশ) মানুষ তাদের রক্তচাপ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে।

প্রতিবেদনের তথ্য মতে, শুধুমাত্র কানাডা, কোস্টারিকা, আইসল্যান্ড এবং দক্ষিণ কোরিয়াতে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের হার ৫০ শতাংশের বেশি। ৯৯টি দেশে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের হার ২০ শতাংশেরও কম। ২০১১ সালে উচ্চ রক্তচাপজনিত কারণে ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী মোট মৃত্যুর ১৬ শতাংশ এবং অসংক্রামক রোগের জন্য দায়ী অন্য যেকোনো ঝুঁকির থেকে বেশি।

বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ পরিস্থিতি
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) 'হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে-২০২৫' এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে শীর্ষ ১০টি রোগের তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের (৩০-৭৯ বছর বয়সী) অর্ধেকই (৫৩ শতাংশ পুরুষ, ৪৫ শতাংশ নারী) জানে না যে তাদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের মধ্যে চিকিৎসা গ্রহণের হার মাত্র ৩৯ শতাংশ (৩৫ শতাংশ পুরুষ, ৪২ শতাংশ নারী)। নিয়মিত ওষুধ সেবনের মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে মাত্র ১৬ শতাংশ (১৫ শতাংশ পুরুষ, ১৬ শতাংশ নারী) অর্থাৎ প্রতি ৭ জনে ১ জন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ২ লক্ষ ৮৩ হাজার ৪০০ মানুষ হৃদরোগজনিত রোগে মৃত্যুবরণ করেছে, যার ৫২ শতাংশের (৪৮ শতাংশ পুরুষ, ৫৬ শতাংশ নারী) জন্য দায়ী উচ্চ রক্তচাপ।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞদের মতামত
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে করণীয় জানতে চাইলে পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট (ইলেক্ট) ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, উচ্চ রক্তচাপ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রথমেই আমাদেরকে খাবারে লবণ কম খেতে হবে, শাকসবজি প্রচুর পরিমাণে খেতে হবে, কমপক্ষে আধা ঘণ্টা শারীরিক পরিশ্রম কিংবা ব্যায়াম করতে হবে, নিয়মিত সঠিক সময়ে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে হবে।

এখন অনেকেই মোবাইল ফোনের আসক্তিতে রাত জাগে, প্রয়োজনের তুলনায় কম সময় ঘুমায়। পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম না হওয়ায় অনেকেই মানসিক উত্তেজনা বা চাপে থাকে। ধূমপানের কারণেও উচ্চ রক্তচাপ হয়, তাই ধূমপান কিংবা তামাকপণ্যের ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে এই কয়েকটি বিষয় মেনে চলার পরামর্শ দেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, কারও যদি মাথা ও ঘাড় ব্যথা হয়, মাথা ঘুরায়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত এবং রক্তচাপ পরীক্ষা করা দরকার। উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত হলে নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, কারও যখন উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত হয়, তখন ওষুধ খেয়ে নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। লাইফস্টাইল পরিবর্তন করলে কিছুটা কমে কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সারাজীবন ওষুধ খেতে হয়। অর্থাৎ একদিকে প্রতিরোধ আরেকদিকে চিকিৎসা নিতে হবে। দেশের প্রায় প্রতি চারজনে একজন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে। বিপদের কথা এদের অধিকাংশই জানে না, তাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে। যারা জানে তাদের অর্ধেক ওষুধ খাচ্ছে। দেশে যত উচ্চ রক্তচাপের রোগী আছে তার মাত্র ১৬ শতাংশের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে।

তিনি আরও বলেন, দেশে উচ্চ রক্তচাপ শনাক্তের একটা গ্যাপ আছে, আবার যাদের শনাক্ত হচ্ছে, তাদেরকেও সঠিকভাবে চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে যারা চিকিৎসা নিচ্ছেন তাদের অনেকের রক্তচাপও নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। অর্থাৎ আমাদেরকে তিনটা বিষয়ে নজর দিতে হবে, এক গণহারে উচ্চ রক্তচাপের স্ক্রিনিং কার্যক্রম চালাতে হবে। দুই শনাক্ত রোগীদের সারা জীবন ওষুধ খেতে হয় এবং এটা অনেক ব্যয়বহুল, আবার ওষুধ না খেলে রোগটা নিয়ন্ত্রণে থাকবে না, তাই সরকারকে যাদের সামর্থ্য নাই তাদেরকে বিনা পয়সায় ওষুধ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের এ অধ্যাপক জানান, ওষুধ দেওয়ার পর রোগীর উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, নিয়মিত সেটা ফলোআপ করতে হবে। এই কয়েকটি কাজ করতে পারলে ধীরে ধীরে ওভারঅল কন্ট্রোল রেট বাড়বে, যেটা আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ৭০ শতাংশের উপরে নিয়ে যাওয়া, সেটা অর্জন করতে পারব। এটা করতে পারলে স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটিকে যে অকালমৃত্যু হচ্ছে তাও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর