রাজনীতির শক্ত ‘ঘাটি’ সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকা ছেড়ে সিলেট-৪ আসনে (জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কঠিন পরীক্ষা ছিল আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে। অনেকটা চ্যালেঞ্জও ছিল। তবুও সকল প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে প্রতিরোধের দেয়ালকে বশে এনে নাটকীয়ভাবে বিজয়ী হন তিনি।
এই পথ পাড়ি দিতে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি দিয়েছেন ভোটারদের। শুনিয়েছেন নানা আশার কথা। ভোটাররাও তাদের কথা রেখে জনগণের প্রতিনিধি বানিয়ে সংসদে পাঠিয়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে। এখাানেই শেষ না। প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েই পেয়েছেন মন্ত্রীত্ব।
একই অবস্থা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের। আরিফুল হক চৌধুরীর ‘শক্ত ঘাটিতে’ দলীয় মনোনয়ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামেন তিনি। ২০১৮ সালে সংসদ নির্বাচনে এ আসনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অভিজ্ঞতা থাকলেও এবারের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলের জোটের একমাত্র প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমানকে কোনোভাবেই দুর্বল করে দেখার সুযোগ ছিল না।
তবে নিজের মেধা, বিচক্ষণতা দূরদর্শি চিন্তা-চেতনায় মুগ্ধ হয়ে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে সংসদে গেছেন এই রাজনীতিবিদ। আরিফুল হক চৌধুরীর মতো তিনিও পেয়েছেন মন্ত্রীত্ব। খন্দকার মুক্তাদির ও আরিফুল হক চৌধুরীর দুজনের একটা জায়গায় মিল রয়েছে। দুজনেই বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা। এবার এই দুই উপদেষ্টার সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ।
ভোটারদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের সময়। শুরু হয়েছে নতুন হিসাব। ভোটের মাঠে এ দুই সংসদ সদস্যের মূল ১৭টি বিষয়ের উপর দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা বাস্তবায়ন হবে, কতটা বদলাবে নগর ও গ্রাম জনপদের চিত্র? এটাই এখন দেখার বিষয়।
মঙ্গলবার বিকেলে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও আরিফুল হক চৌধুরী। খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির পেয়েছেন বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় ও আরিফুল হক চৌধুরী পেয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয়।
সিলেট-৪ আসনে নির্বাচনী প্রচারণায় আরিফুল হক চৌধুরী লিখিত কোন ইশতেহার প্রকাশ না করলেও ভোটের মাঠে ছয়টি প্রধান খাতকে অগ্রাধিকার দেন। প্রথমত তিন উপজেলা জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জকে সমন্বিত করে সিলেট উত্তর সিটি গঠন এবং পরিকল্পিত নগরায়নের মাধ্যমে আধুনিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা।
দ্বিতীয়ত পর্যটন উন্নয়ন। জাফলং, বিছানাকান্দি ও ভোলাগঞ্জকে কেন্দ্র করে পরিবেশবান্ধব আধুনিক শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি। তৃতীয়ত সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনের জন্য কোয়ারি পুনরায় চালুর প্রতিশ্রুতি। যা সীমান্তবর্তী এলাকার অর্থনীতিকে চাঙা করবে বলে তাঁর মত।
চতুর্থত অবকাঠামো ও জনসেবা উন্নয়ন, যার মধ্যে বিশুদ্ধ পানির সংকট নিরসন, কৃষি উন্নয়ন এবং সীমান্ত অঞ্চলের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর কথা রয়েছে। তাছাড়া রয়েছে রাস্তাঘাট নির্মাণ ও অবকাঠামো উন্নয়নও বেকারত্ব দূর করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রুতিশ্রুতি।
আরিফুল হকের প্রতিশ্রুতিগুলো মূলত অঞ্চলভিত্তিক সমন্বিত উন্নয়নকেন্দ্রিক। উত্তর সিলেটকে একটি পরিকল্পিত নগর কাঠামোয় গড়ে তোলাই ছিল তাঁর প্রচারের প্রধান বার্তা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পর্যটন সংশ্লিষ্টদের একাংশ মনে করেন, পর্যটন ও পাথর শিল্পের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে। তবে পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলেও তাঁরা মনে করেন।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা বলেন, আমরা প্রতিবারই সীমান্ত এলাকাগুলোতে সনাতনী পদ্ধতিতে পাথর বালু উত্তোলন করার কথা শুনি। এবারও শুনেছি। এটি যদি করা হয় তাহলে অবশ্যই স্থানীয়ভাবে বেকারত্ব দূর হবে। কিন্তু বাস্তবে এমন সনাতনী পদ্ধতিতে বালু পাথর তুলতে আমরা দেখি না।
তিনি বলেন, এখন যিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তিনি ম্যাজিক ম্যান হিসেবে খ্যাত। পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে তিনি কোনো নতুনত্ব আনতে পারেন।
অন্যদিকে সিলেট-১ আসনে নির্বাচনের সময় খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির তাঁর ঘোষণাপত্রে মোট এগারোটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেন। প্রথম অগ্রাধিকার কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন। শ্রমঘন শিল্প স্থাপন, আইটি ও ইনোভেশন হাব, ফ্রিল্যান্সারদের জন্য কো ওয়ার্কিং স্পেস, ওয়ান স্টপ ক্যারিয়ার ও জব সেন্টার এবং স্টার্টআপ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড গঠনের পরিকল্পনা দেন তিনি।
দ্বিতীয় অগ্রাধিকার কৃষি আধুনিকায়ন। সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, পানি নিষ্কাশন, এগ্রো প্রসেসিং ইউনিট ও কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের কথা বলেন। তৃতীয় অগ্রাধিকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পর্যটন উন্নয়ন। জৈন্তা, মণিপুরি ও খাসি সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং লোকসংগীত উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর ঘোষণায়।
চতুর্থ অগ্রাধিকার চা শিল্প ও শ্রমিক কল্যাণ। ন্যায্য মজুরি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি চা বাগানে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। পঞ্চম অগ্রাধিকার নারীবান্ধব শহর গঠন। পাবলিক টয়লেট, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ কর্মসূচি, নারী পরিচালিত বাস ও ডে কেয়ার সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
ষষ্ঠ অগ্রাধিকার স্বাস্থ্যখাত উন্নয়ন। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এর সক্ষমতা বৃদ্ধি, সদর হাসপাতাল পূর্ণমাত্রায় চালু এবং আইসিইউ সেবা সাশ্রয়ী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। সপ্তম অগ্রাধিকার শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন। বিদ্যালয়ে জবাবদিহিতা কাঠামো গঠন ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদারের কথা বলা হয়েছে। অষ্টম অগ্রাধিকার নগর উন্নয়ন ও পরিবেশ। জলাবদ্ধতা নিরসন, খাল পুনরুদ্ধার এবং ক্রীড়া সুবিধা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
নবম অগ্রাধিকার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন। সড়ক ও রেলপথ আধুনিকায়ন এবং সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এর সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দশম অগ্রাধিকার সামাজিক নিরাপত্তা। কিশোর গ্যাং ও মাদকবিরোধী টাস্কফোর্স গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। একাদশ অগ্রাধিকার ইমাম ও মোয়াজ্জিনদের কল্যাণে নীতিমালা প্রণয়ন ও হাদিয়া বৃদ্ধির উদ্যোগ।
সিলেট চেম্বারের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ফালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির রাজনীতিদি ও ব্যবসায়ী। তিনি মন্ত্রীত্ব পাওয়ায় আমরা বেশ আশাবাদি। সিলেটে ব্যবসার পরিবেশ ফিরে আসবে। তবে এটি শুধু সিলেটের নয় সারা দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল করবে।
তিনি বলেন, আরিফুল হক চৌধুরীও একজন সফল নেতা সিলেট নগরকে আধুনিক নগর তৈরি করে এবার গ্রামাঞ্চলের নেতা হয়েছেন। দুজনই সিলেটের মানুষের কথা চিন্তা করেন। তাদের দায়িত্ব বেড়েছে আমরা খুবই আনন্দিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাদের উপর আস্থা রেখেছেন।
সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলনের সমন্বয়ক আব্দুল করিম কিম বলেন, মন্ত্রীত্বে অধিষ্ঠিত হওয়ায় এখন তাঁদের সামনে সুযোগ যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি দায়ও বেড়েছে। উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাজেট, প্রশাসনিক সমন্বয় ও সময়সীমা নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রতিশ্রুতির সংখ্যা নয়, বাস্তবায়নের দৃশ্যমান অগ্রগতিই হবে আসল পরীক্ষা।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
নিউজ ডেস্ক 








