পর্যটনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে 'ভঙ্গুর যোগাযোগ ব্যবস্থা'
সোমবার, ০১ জুন ২০২৬, ১০:৪৯ AM

পর্যটনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে 'ভঙ্গুর যোগাযোগ ব্যবস্থা'

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১/০৬/২০২৬ ০৯:৫০:১৯ AM

পর্যটনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে 'ভঙ্গুর যোগাযোগ ব্যবস্থা'


ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভঙ্গুর যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এবারের ঈদুল আজহায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সিলেটের পর্যটন খাতে| সড়ক পথের পাশাপাশি ঢাকা-সিলেট রেলপথেও টিকিট সংকট ও যাত্রায় দীর্ঘ সময় লাগার কারণেও উল্লেখযোগ্য পর্যটক কমেছে| সবমিলিয়ে এবারের ঈদে ব্যবসার লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৫০ শতাংশ পূরণ হয়েছে বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিবছর ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের অন্যতম পর্যটন নগরী সিলেটে পর্যটকদের ঢল নামলেও এবার চিত্রটা ভিন্ন| এবারের ঈদে হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলোতে আগাম বুকিং ৬০-৬৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে| মূলত ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট ও নির্মাণ কাজ জনিত দুর্ভোগ, ট্রেনের টিকিট সংকটে সিলেটমুখী পর্যটনখাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে| এছাড়া আকাশ পথে বিমানের ভাড়া ব্যয়বহুল হওয়ার কারণও অন্যতম|

রিসোর্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এবার ঈদে হোটেল-মোটেলে বুকিং অনেক কম ছিল| ঈদের ছুটিকে সামনে রেখে সাধারণত দুই সপ্তাহ আগে থেকেই সিলেটের অধিকাংশ আবাসিক হোটেল ও রিসোর্টে অগ্রিম বুকিং শুরু হয়| কিন্তু এবার সেই চিত্র একেবারেই ভিন্ন ছিল|

তারা বলছেন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে সংস্কারকাজ, যানজট ও দীর্ঘ সময়ের যাত্রা এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে| আগে যেখানে ঢাকায় থেকে সিলেটে পৌঁছাতে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লাগত, এখন অনেক ক্ষেত্রে সময় লাগছে ১০-১২ ঘণ্টারও বেশি| এতে পরিবার নিয়ে ভ্রমণে আগ্রহ কমছে|

জানা গেছে, এই ঈদে যারা সিলেটে ঘুরতে এসেছেন, তাদের বড় অংশই নিজ¯^ গাড়ি বা রিজার্ভ পরিবহনে দিনে এসে দিনেই ফিরে গেছেন| অন্যদিকে বিমানে ভ্রমণ করতে সক্ষম উচ্চ আয়ের পর্যটকদের উপস্থিতি থাকলেও সেই সংখ্যাও খুবই সীমিত| যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সিলেটের হোটেল ও পর্যটন ব্যবসায়|
সরেজমিনে দেখা গেছে, জাফলং, সাদা পাথর, লালাখাল, শ্রীপুর, রাতারগুল, পান্তুমাই, মায়াবতী ঝরনা, ডিবির হাওর, বিছানাকান্দি, লোভাছড়া, চেরাপুঞ্জি, হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.) এর মাজারে পর্যটক থাকলেও অন্য বছরের তুলনায় অনেক কম|

ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক তাহারিমা সুলতানা হাসি বলেন, ঈদের পরদিন রাত ১০টায় রওয়ানা দিয়ে সকাল সাড়ে ৮টায় সিলেটে এসে পৌঁছেছি| সাধারণত রাতে ঢাকা থেকে সিলেট আসতে সর্বোচ্চ ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা লাগে| কিন্তু যানজট ও নির্মাণকাজের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকা পড়তে হয়েছে| দিনে যারা আসছেন তাদের ১৩-১৪ ঘণ্টার মতো সময় লাগছে|

হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে আসা পর্যটক রাবেল আহমদ বলেন, রিজার্ভ মাইক্রেবাসে সিলেট এসেছি| শুধু সড়কপথে বিল¤ে^র কারণে পুরো ট্যুর শিডিউল পরিবর্তন করতে হয়েছে| এমনিতেই ছুটি কম| যাতায়াত দুর্ভোগের কারণে সময় অনেক নষ্ট হয়েছে| এখন মাজার জিয়ারত ও সাদা পাথর ঘুরেই চলে যাবো|

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, সিলেটের পর্যটনখাত মূলত দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল| তাই যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক না থাকলে সরাসরি এর প্রভাব পড়ে পুরো খাতে| তারা দ্রুত মহাসড়কের দুর্ভোগ কমানো, ট্রেনের টিকিট সংকট নিরসন ও পর্যটনবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন| ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, চলমান দুর্ভোগ অব্যাহত থাকলে আগামী শীত ও ঈদের মৌসুমগুলোতেও পর্যটক উপস্থিতি প্রত্যাশার তুলনায় কম থাকবে|

সিলেট হোটেল মোটেল অ্যাসোসিয়শনের সাধারণ সম্পাদক নওশাদ আল মুক্তাদির বলেন, এবারের ঈদে আশানুরুপ পর্যটক আসেননি| ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৫০ শতাংশ পূরণ হয়েছে| মূলত ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভঙ্গুর যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এই প্রভাব পড়েছে| এছাড়াও বিমানে উচ্চ মূল্যের টিকিট ও ট্রেনের যাত্রায় দূর্ভোগের কারণও রয়েছে| সবমিলিয়ে এবার পর্যটনখাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে|

ট্যুরিজম ডেভেলপার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি মোহাম্মদ খতিবুর রহমান, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দুর্ভোগ বড় প্রভাব ফেলছে| ছয় লেন প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় বিভিন্ন স্থানে যানজট লেগেই আছে| স্বাভাবিক সময়ে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে এখন ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগছে| বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও শায়েস্তাগঞ্জ অংশে দীর্ঘ যানজটের কারণে অনেক যাত্রী ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল করছেন|

সিলেট হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমাত নুরী জুয়েল বলেন, ঈদকে ঘিরে সিলেটের হোটেল-মোটেলগুলোতে ৩০-৩৫ শতাংশ আগাম বুকিং হয়েছে| অথচ ঈদ মৌসুমে সাধারণত শতভাগ বুকিং থাকে| এবার খুব বেশি পর্যটক আসেননি|

তিনি বলেন, মধ্যবিত্ত পরিবারের পর্যটকদের সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যাতায়াত দুর্ভোগ ও ট্রেনের টিকিট সংকট| এসব কারণে গত কয়েক বছর ধরেই মধ্যবিত্ত পর্যায়ের পর্যটকের সংখ্যা কমছে| যারা গাড়ি নিয়ে আসার সক্ষমতা আছে তারাই বেশি আসছে|

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ছয়লেন প্রকল্পের সিলেট অংশের প্রকল্প ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী দেবাশীষ রায় বলেন, বিগত সরকারের সময়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কোনো কাজই করা হয়নি| সিলেটের বর্তমান জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম যোগদানের পরে কাজে গতি এসেছে| বর্তমান সরকারের দায়িত্বগ্রহণের পরে কাজের গতি আরও বেড়েছে|

তিনি বলেন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সিলেট অংশে ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত ১৭টি মামলা রয়েছে| সম্প্রতি ভূমি অধিগ্রহণের ছয়টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে| আরও কয়েকটি মামলা চলতি জুন মাসের মধ্যে শেষ হবে| বাকিগুলোও আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ হতে পারে| যদি ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা শেষ হয়, তবে ২০২৯ সালের মধ্যে পুরো প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ শেষ হয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর