মোহাম্মদ মহসীন : বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা হতে যাচ্ছে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ ও একই সঙ্গে অনুষ্ঠিতব্য গণভোটে। এই নির্বাচনে প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতি চালু করা হচ্ছে, যার আওতায় প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের পাশাপাশি কারাগারে বিচারাধীন অভিযুক্ত ভোটাররাও নির্ধারিত বিধিমতে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। এটি দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় একটি যুগান্তকারী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। এতদিন বাস্তব সীমাবদ্ধতার কারণে তারা সরাসরি ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে ভোট দিতে পারতেন না। পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রবাসী নাগরিকদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় রাষ্ট্র ও প্রবাসীদের মধ্যে গণতান্ত্রিক সংযোগ আরও সুদৃঢ় হবে।
বাংলাদেশের সংবিধান ও বিদ্যমান নির্বাচন আইন অনুযায়ী শুধু দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই ভোটাধিকার হারান। ফলে কারাগারে থাকা কিন্তু এখনও দণ্ডপ্রাপ্ত নন- এমন বিচারাধীন অভিযুক্তরা আইনত ভোটার হিসেবে গণ্য। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ ও গণভোটে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত বিধিমালা অনুযায়ী এই বিচারাধীন ভোটারদের জন্যও পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা নাগরিক অধিকার ও আইনের শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
দায়িত্বজনিত কারণে নির্বাচনী এলাকার বাইরে অবস্থানরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মী, প্রবাসী নাগরিক এবং কারাগারে বিচারাধীন ভোটারদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতেই পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ আরও বিস্তৃত হলো।
পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাটি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO), সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী বিধিমালা এবং নির্বাচন কমিশনের জারি করা নির্দেশনার আলোকে বাস্তবায়িত হচ্ছে। বিধি অনুযায়ী, নির্ধারিত শ্রেণিভুক্ত ভোটাররা যাচাই-বাছাই শেষে নির্দিষ্ট ফরমে ডাকযোগে তাদের ভোট প্রদান করবেন। কারাগারে বিচারাধীন ভোটারদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে গোপনীয়তা বজায় রেখে ব্যালট পূরণ ও প্রেরণের বিধান রাখা হয়েছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬-এর সঙ্গে গণভোট আয়োজন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রবাসী ও বিচারাধীন ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে নির্বাচন ও গণভোটের প্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্র আরও শক্তিশালী হবে এবং ভোটের সার্বজনিকতা বাস্তব রূপ পাবে।
পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে- ব্যালট প্রস্তুত, প্রেরণ, গ্রহণ ও গণনা- কঠোর বিধিনিষেধ ও তদারকি আরোপ করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রবাসী ও কারাগারের ভোটারদের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। এতে নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
যেহেতু বাংলাদেশে এই প্রথম পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতি চালু হচ্ছে, তাই বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকাই স্বাভাবিক। প্রবাসীদের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ডাকব্যবস্থা এবং বিচারাধীন ভোটারদের ক্ষেত্রে কারা প্রশাসনের সমন্বয়- এই দুটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব দাবি করে। দক্ষ ব্যবস্থাপনা, সময়ানুবর্তিতা ও কঠোর তদারকির মাধ্যমেই এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ ও গণভোটে পোস্টাল ব্যালটের প্রবর্তন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আইনসম্মত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। প্রবাসী নাগরিক ও কারাগারে বিচারাধীন অভিযুক্তদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই ব্যবস্থা গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনাকে আরও সুদৃঢ় করতে পারে।
(লেখক- প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, সিলেট)
আজকের সিলেট/এপি
---------------- 








