মোস্তফা কামাল : যুদ্ধে বিজয়ী হতে না পারা গভীর বেদনার, অর্জনের পর বিজয় হাতছাড়া হয়ে যাওয়া পরাজয়ের চেয়েও কলঙ্ক ও গ্লানির। একাত্তরের লাখো শহীদের রক্তঝরা, অগ্নিঝরা বিজয় এক দিনে হাতছাড়া হয়নি। তা হয়েছে বিজয় অর্জনের পর ধাপে ধাপে। যে যেভাবে পেরেছে বিজয়কে নিজের কবজায় নিয়েছে।
অথচ জীবন হাতে নিয়ে যুদ্ধ করা মানুষগুলো কোনো পদক, খেতাব, ভাতার আশা করেননি। যুদ্ধকালের সেই কঠিন দিনগুলোতে অস্ত্র হাতে বা পাশে রেখে তাঁরা গেয়েছেন ‘একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’। তাঁদের চোখে-মুখে ছিল-হয় মৃত্যু, নয় একটি অনিন্দ্যসুন্দর নতুন দেশ। এ দুয়ের মাঝে অন্য কোনো বিকল্প ছিল না তাঁদের।
ভাবতেন, মৃত্যুর পর লাশটা স্বজনদের কাছে যাবে কি না বা কবরের মাটি পাবে কি না? আর বেঁচে থাকলে কিভাবে সাজাবেন নতুন দেশটাকে।
একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর ঠিকই এলো, পরাস্ত হলো হানাদাররা। এলো বিজয় বসন্ত। যুদ্ধে অসংখ্য সঙ্গী ও স্বজন হারানোর ব্যথায় কাতর হয়েও বিজয় আনন্দে আত্মহারা হয়ে আশায় বুক বাঁধলেন তাঁরা।
তবে সময়ের সঙ্গে তাঁরা গুরুত্ব হারালেন। গণমানুষের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম, লাখো শহীদের আত্মাহুতি, অগণিত মানুষের কঠোর আত্মত্যাগ ফিকে হতে থাকল। অর্জিত সেই বিজয় বসন্ত ছারখার হয়ে গড়াতে থাকল ‘রোদন ভরা বসন্ত’ হয়ে। চোরাবালিতে পড়ে সেই বিজয়ের অনেক কিছুই পরিণত হয়েছে বেদনা-অপ্রাপ্তির ইতিহাসে। ক্ষেত্রবিশেষে বিজয় হারানোর উপলব্ধিও হারিয়ে যাওয়ার খাদে পড়ে যায়।
‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটি বারবার উচ্চারণ করা হলেও, মুক্তিযুদ্ধের অমূল্য বিজয়সম্ভারের উপকরণগুলো ম্লান। বিজয়কে স্বাধীনতা- সার্বভৌমত্বের বিষয় না করে, রাজনীতির পণ্য বানিয়ে ‘গদির খেলায়’ পরিণত করার কুফলে ভুগছে একটি জাতি এবং দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো। যার পরিণামে রাজনীতির পৈশাচিক চিৎকার ও আস্ফাালনে কম্পমান থাকা দেশটির নিয়তি এখন কঠিন জটিলতার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে।
মুক্তিযুদ্ধের নীতি ছিল আত্মশক্তির ওপর দাঁড়িয়ে স্বাধীন জাতীয় বিকাশের ধারায় আগোয়ান হওয়া। রক্তার্জিত স্বাধীনতার সুযোগ বাস্তবায়নে যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব থাকা প্রয়োজন, সে ক্ষেত্রে ঘাটতি যুদ্ধের পর থেকেই। এ ছাড়া ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের পর রাতারাতি ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে আবির্ভূত হওয়া সিক্সটিন ডিভিশনের যোদ্ধারের আস্ফাালন চলেছে সময় সময়। এর ফলে ইতিহাস চর্চা রূপ নেয় দলীয় রাজনৈতিক চর্চায়। সেই সঙ্গে কাউকে একচেটিয়া স্তুতি-বন্দনায় মাথায় তোলা, কাউকে নিন্দা-কুৎসায় পায়ে নামানোর নোংরামি। সাধারণ মানুষ আর সেনাবাহিনী মিলে করা যুদ্ধটিকে কেউ কেউ নিজেদের হাতের মুঠোয় নেওয়ার খেলায় সফল হন। নির্জলা সত্য হচ্ছে, তাঁরা বা তাঁদের অনেকেরই সন্তানরা যুদ্ধের ময়দান মাড়াননি। যুদ্ধে অন্যতম ভূমিকা রাখা মধ্যবিত্তদের হিসাবের খাতায় রাখা হয়নি। প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীকে এনে ঠেকানো হয়েছে কেবলই রাষ্ট্রের বেতনভুক কর্মচারীতে। বলতে গেলে তাদের ইতিহাস থেকেই খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধ ইতিহাসের সাক্ষী রাখতেও আপত্তি। অথচ দীর্ঘমেয়াদি শোষণ, বৈষম্য এবং দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণের পাশাপাশি প্রতিরোধ গড়েছে বাঙালি সেনা, পুলিশ, আনসার, ইপিআর, বিমান, নৌ সদস্যরা। বিদ্রোহী বাঙালি সেনা সদস্যদের নেতৃত্বেই গঠিত হয়েছিল মুক্তিবাহিনী। মুক্তিযুদ্ধের মূল সামরিক বাহিনী তাঁরাই। পূর্ব পাকিস্তানে থাকা সেনা, পুলিশ, ইপিআর ও আনসার সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিতে কারো নির্দেশের অপেক্ষা করেননি। তাঁরা স্থানীয় জনগণকে সংগঠিত করেই ছেড়ে দেননি। নিজেরা ফ্রন্টে থেকে বিভিন্ন জায়গায় পাক সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামেন। মুক্তিবাহিনীর কার্যক্রম আরো জোরদার করতে পূর্ব বাংলাকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে প্রতিটি সেক্টরে একজন সেক্টর কমান্ডার দায়িত্ব পালন করেন।
মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর সফিউল্লাহ, মেজর চিত্তরঞ্জন দত্ত, মেজর মীর শওকত আলী, উইং কমান্ডার বাশার, মেজর কাজী নুরুজ্জামান, মেজর আবু ওসমান চৌধুরী, মেজর জলিল, কর্নেল তাহেররা ছিলেন সেই কমান্ডার। এক পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধকে সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে রূপ দিতে আরো গতিশীল ও আক্রমণাত্মক করতে মুক্তিবাহিনীর তিনটি ব্রিগেড (জেড ফোর্স, কে ফোর্স, এস ফোর্স) গঠন করা হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের সেক্টরভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেয় এই ফোর্সগুলো। সেই সঙ্গে চলে গেরিলা প্রশিক্ষণ। পাকিস্তানি দুর্ধর্ষ বাহিনীকে একে একে বিধ্বস্ত করে তোলেন গেরিলা যোদ্ধারা। রেললাইন ও ব্রিজ ধ্বংস এবং শত্রুর রসদ সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করে ক্রমেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে কাবু করে তোলেন তাঁরা।
সেক্টর কমান্ডারদের দক্ষ নেতৃত্ব, যুদ্ধের কৌশল ও সামরিক পারদর্শিতা দ্রুত যুদ্ধের বাঁক ঘুরিয়ে দেয়। সেনা সদস্যরা কেবল সামরিক যুদ্ধ পরিচালনাই করেননি, সাধারণ জনগণকেও উদ্বুদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধে শামিল করে নেন। মুক্তিবাহিনীতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা গ্রামের তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতিরোধ কৌশলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে মাঠে-ঘাটে নাস্তানাবুদ করে তোলেন। এর অবধারিত ফলাফলে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ৯৩ হাজার সৈন্যের আত্মসমর্পণ। বিশ্বের ইতিহাসে যাকে বলা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সামরিক আত্মসমর্পণ। অথচ সেই বিজয়কে চোখের সামনে জনাকতেক রাজনীতিক ও তাঁদের খাস পছন্দের লোকদের বিজয় করে ফেলা হয়। তাঁরাই হয়ে যান যুদ্ধের হর্তা-কর্তা-বিধাতা। দেওয়া হতে থাকে মুক্তিযোদ্ধার সনদও। যুদ্ধের অনেক পরে জন্ম নেওয়া অনেকে এই সনদ বাগিয়ে পরে অনেক প্রাপ্তি হাসিল করে নেন। এ নিয়ে বহু সমালোচনা, হাস্যকর কাণ্ডকীর্তি চললেও তাঁদের দমানো যায়নি। হাছিল করা ওই সনদে মন্ত্রী, এমপি, সচিবসহ নানা পদ-পদবি বাগাতেও তাঁরা লজ্জিত হননি। সিনা টান করে ভাতাসহ নানা উপরি হাতাতেও বিবেকে বাধেনি। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ নিয়ে কেউ কেউ আশাবাদী হয়ে এর একটা বিচার বা বিহিত চাচ্ছিলেন। এর জেরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম, বীরপ্রতীক বলেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ না করেও মুক্তিযোদ্ধার সনদ নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি ও আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানের কতজনের চাকরি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় হয়েছে, তার একটি তালিকাও হয়েছিল।
এর আলোকে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরিপ্রাপ্তরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কিনা, চাকরি ন্যায্যভাবে হয়েছে কি না—তা খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছিলেন উপদেষ্টা। প্রাসঙ্গিকভাবেই তাঁদের নেওয়া অবৈধ সুযোগ, বিশেষ করে অর্থ ফেরত আনার কথাও শোনা গিয়েছিল। এর একটা বিশেষ প্রেক্ষিতও ছিল। কারণ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বিশেষ ইস্যু ছিল মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের সন্তানদের কোটা। ‘মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝখানে ছিল জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল—জামুকা। মুক্তিযোদ্ধা কারা হবেন-না হবেন সেটা জামুকা নির্ধারণ করে দিত। মুক্তিযোদ্ধার তালিকা রিভিউ করে ন্যায্যভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানটা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গও আসে। গেল সরকারের সময় মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা এক লাখ ৮৩ হাজারের সামান্য বেশি। বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা তালিকা নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের অনিয়ম হয়েছে। ভুয়া বা অমুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ঠিক কত, সে বিষয়ে এখনো পরিষ্কার তথ্য নেই। দেশে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা নিয়েই যেখানে অস্পষ্টতা, সেখানে ভুয়ার সংখ্যা বের করা আরো পরের বিষয়। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে ২০২১ সালে প্রকাশিত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় এক লাখ ৪৭ হাজার ৫৩৭ জনের নাম ছিল। ২০১৪ সালের আগে যেসব মুক্তিযোদ্ধার নাম তালিকায় আসেনি, তাঁদের আবেদনের সুযোগ দিলে সারা দেশে অসংখ্য আবেদন জমা পড়ে। এমনকি সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম তালিকাভুক্তির আবেদন করেন। তবে ২০১৪ সালেই পাঁচজন সচিবের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল করে সরকার, যা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। তখন সনদ বাতিলের পাশাপাশি তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনে অনন্য ঘটনা। এর চেয়ে গৌরবোজ্জ্বল, ত্যাগের ও বীরত্বের মহিমা জাতির কাছে আর নেই। সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধারা তা-ই ফিরে পেতে চান।
ছিনতাই হওয়া বিজয়ের মহিমা ফেরাতে, আগাছা দূর করতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রায় আট হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদ বাতিল করেছে। কিন্তু প্রতারণা বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে সনদ নেওয়ার অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ক কোনো সিদ্ধান্তও হয়নি। এমনকি তাঁদের মধ্যে যাঁরা সরকারি ভাতা গ্রহণ করেছেন সেই টাকা ফেরত আনার ব্যবস্থাও হয়নি। এ নিয়ে লজ্জা- যন্ত্রণা পোহান প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা। ভুয়াদের লজ্জার বিষয় নেই। আর নেই বলেই অবৈধভাবে চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর লোভে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিতেও বিবেকে বাধেনি সচিব থেকে শুরু করে চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলী, ব্যাংকারসহ বিভিন্ন শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদেরও। লজ্জার লেশমাত্র দেখা যায়নি মুক্তিযুদ্ধের বিদেশি সহযোগী বন্ধুদের মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননা ক্রেস্টের স্বর্ণ চুরি করতেও। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে সরকার স্বাধীনতার চার দশক পূর্তি উপলক্ষে সাত পর্বে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু স্বনামধন্য ৩৩৮ বিদেশি ব্যক্তিত্ব ও সংগঠনকে অন্য উপহারসামগ্রীর সঙ্গে একটি করে ক্রেস্ট দিয়েছিল। ওই ক্রেস্টে সোনার জায়গায় দেওয়া হয়েছে পিতল, তামা ও দস্তামিশ্রিত ধাতু। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। তদন্ত কমিটিও হয়েছিল। ঘটনা প্রমাণের পর চলে হম্বিতম্বি। ক্রেস্ট সরবরাহকারী দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিকের নামে মামলাও হয়। অরাজনৈতিক এ সরকারের আমলে কত কিছু নিয়েই কথা হয়। মহান বিজয় দিবসে এসে এসবের একটি বিহিতের আশা করা কি বেশি কিছু?
(লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন।)
---------------- 








