রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৪ অপরাহ্ন

৪২ বছর ধরে ট্রেনের বগিতে বগিতে পান-সিগারেট বিক্রি, ৭০ বছরেও থামেনি নূরুল হকের জীবনসংগ্রাম

বানিয়াচং (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০১/১১/২০২৬ ০৯:৫৩:৫৮ পূর্বাহ্ন

৪২ বছর ধরে ট্রেনের বগিতে বগিতে পান-সিগারেট বিক্রি, ৭০ বছরেও থামেনি নূরুল হকের জীবনসংগ্রাম


বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে, কমেছে কর্মক্ষমতা তবু থেমে থাকার অবকাশ নেই। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনই ছুটতে হয় ট্রেনের এক বগি থেকে অন্য বগিতে। হাতে পান-সিগারেটের পসরা, চোখে পরিবারের ভরণপোষণের চিন্তা। এভাবেই জীবনের ৪২টি বছর কাটিয়ে দিয়েছেন ৭০ বছর বয়সী মো. নূরুল হক। দীর্ঘ পথচলায় বদলেছে সময়, বদলেছে জীবনের অনেক হিসাব কিন্তু বদলায়নি তার জীবিকার সংগ্রাম।

হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার কামালখানি বড়বাজার এলাকার বাসিন্দা নূরুল হক বর্তমানে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে বসবাস করেন। জীবনের দীর্ঘ সময় ধরে ট্রেনে ট্রেনে ফেরি করে পান ও সিগারেট বিক্রিই তার পেশা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের শক্তি কমেছে, দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে এসেছে ক্লান্তি। তারপরও পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব তাকে আজও এই পেশায় ধরে রেখেছে।

সম্প্রতি শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশনে ঢাকা মেইলের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে নিজের জীবনের নানা অধ্যায়ের কথা তুলে ধরেন নূরুল হক। তার বর্ণনায় উঠে আসে দীর্ঘ শ্রমের অভিজ্ঞতা, আত্মসম্মানবোধ, পাওয়া-না পাওয়ার হিসাব আর মনের গভীরে জমে থাকা কিছু নীরব আক্ষেপ।

দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে চলন্ত ট্রেনে যাত্রীদের ভিড়ের মধ্যে এক বগি থেকে অন্য বগিতে ঘুরে পণ্য বিক্রি করছেন তিনি। কত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে, কত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন তার সব হিসাব হয়তো নিজের কাছেও নেই। কোনো যাত্রী তার কাছ থেকে পান কিনেছেন, কেউ সিগারেট নিয়েছেন, আবার কেউ হয়তো পাশ কাটিয়ে চলে গেছেন। তবে প্রতিটি দিন শেষে তার কাছে বড় হয়ে উঠেছে একটাই হিসাব দিনের আয় দিয়ে কীভাবে পরিবারের প্রয়োজন মেটাবেন।

এই পেশায় নির্দিষ্ট কোনো মাসিক বেতন নেই, নেই প্রতিদিনের আয়ের নিশ্চয়তাও। উপার্জন নির্ভর করে দিনের পরিশ্রমের ওপর। তারপরও কারও কাছে হাত না পেতে নিজের শ্রমকে অবলম্বন করেই জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

সংসারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন নূরুল হক। দীর্ঘ সময় ধরে পরিবারের জন্য পরিশ্রম করেছেন। এখন বয়সের ভারে শরীর আগের মতো সায় দেয় না। কিন্তু বয়স বাড়লেও দায়িত্বের অবসান ঘটেনি, শরীর দুর্বল হলেও জীবনের প্রয়োজন থেমে থাকেনি। তাই প্রতিদিনই পান-সিগারেটের পসরা নিয়ে বের হতে হয় তাকে। ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে যা আয় হয়, তা দিয়েই নিজের ও পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করেন।

সাধারণত ৭০ বছর বয়সে একজন মানুষের বিশ্রামের সময় হওয়ার কথা। কিন্তু নূরুল হকের জীবনে বয়সের এই পর্যায়েও কাজ থেকে অব্যাহতি মেলেনি। জীবিকার বাস্তবতা তাকে এখনও প্রতিদিন উপার্জনের পথে নামতে বাধ্য করছে।

আলাপকালে তিনি জানান, সরকারি সহায়তা কিংবা অন্য কারও ওপর নির্ভর না করে নিজের পরিশ্রমের আয় দিয়েই পরিবারের ভরণপোষণ করছেন। সৎপথে থেকে যতটুকু উপার্জন সম্ভব, তা দিয়েই জীবন চালিয়ে যেতে চান।

জীবনের গল্প বলতে চাওয়ার বিষয়ে তার বক্তব্য, জীবিকার জন্য প্রতিদিনই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। কারও কাছে কিছু চাইতে কিংবা নিজের কষ্টের কথা বলে সহানুভূতি আদায় করতে চান না তিনি। সৎভাবে উপার্জন করে বেঁচে থাকাই তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

নূরুল হকের এই অবস্থান একজন শ্রমজীবী মানুষের আত্মমর্যাদাবোধের পরিচয় বহন করে। অভাব কিংবা প্রতিকূলতার কাছে নিজেকে অসহায় হিসেবে তুলে না ধরে তিনি বেছে নিয়েছেন শ্রমের পথ। তার কাছে আয়ের পরিমাণের চেয়ে উপার্জনের পথটি সৎ থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে দীর্ঘ ৪২ বছরের এই পেশাগত জীবনে অন্যদের পরিবর্তনও কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। আলাপের একপর্যায়ে নূরুল হক জানান, তার মতো আরও অনেকে ট্রেনে উঠে ফেরি করে পণ্য বিক্রি করেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ পরবর্তী সময়ে পেশা বদলে অন্য কাজে যুক্ত হয়েছেন। অনেকে আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়েছেন, লাখপতি হয়েছেন, জীবন কাটাচ্ছেন সুখে-শান্তিতে।

একই ধরনের পেশায় থাকা পরিচিতদের এমন পরিবর্তনের কথা বলতে গিয়ে তার কথায় ফুটে ওঠে আক্ষেপের সুর। দীর্ঘ ৪২ বছর একই কাজ করে যাওয়ার পর নিজের জীবনে কতটা পরিবর্তন এসেছে, সেই হিসাব হয়তো তাকে ভাবায়। একসময় যারা তার সঙ্গে একই ধরনের কাজ করতেন, তাদের কেউ কেউ আর্থিক সচ্ছলতা অর্জন করেছেন; অথচ নূরুল হককে এখনও জীবিকার প্রয়োজনে ট্রেনের বগিতে বগিতে ঘুরতে হচ্ছে।

তবে অন্যদের সাফল্যের জন্য কাউকে দায়ী করেননি তিনি। বরং সবকিছুকে ভাগ্যের বিষয় হিসেবেই দেখেছেন। জীবনের এই তুলনায় তার মনে কিছু না-পাওয়ার অনুভূতি তৈরি হয়েছে কথার ভঙ্গিতেই তা কিছুটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই আক্ষেপ কেবল আর্থিক সচ্ছলতার অভাব ঘিরে নয়; দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের পর জীবনে একটু স্বস্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে। ৪২ বছর ধরে শ্রম দিয়ে যাওয়া মানুষটির মনেও হয়তো কখনো প্রশ্ন জাগে আর কত দিন এভাবে চলতে হবে?

নূরুল হকের জীবনে বড় কোনো প্রাপ্তির গল্প নেই। নেই সম্পদ গড়ার সাফল্য কিংবা বিলাসী জীবনযাপনের স্বপ্ন পূরণের বর্ণনা। আছে কাজ করে যাওয়ার অভ্যাস, পরিবারের দায়িত্ব পালন এবং কারও কাছে হাত না পেতে নিজের শ্রমে বেঁচে থাকার দৃঢ়তা।

তিনি জানিয়েছেন, এভাবে ফেরি করে জীবিকা নির্বাহ করতে পেরে তিনি আনন্দিত। তার এই সন্তুষ্টির মধ্যে রয়েছে নিজের কাজের প্রতি শ্রদ্ধা এবং জীবনের বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার মানসিকতা।

জীবন তাকে হয়তো অনেক কিছু দিতে পারেনি, কিন্তু নিজের শ্রমকে কখনো অবহেলা করেননি তিনি। বয়সের ভারে শরীর ক্লান্ত হলেও কর্মজীবনে এখনও বিরতির সুযোগ আসেনি। প্রতিদিনের উপার্জনই তার বেঁচে থাকার অবলম্বন।

মো. নূরুল হকের মতো আরও অনেক মানুষ রয়েছেন, যারা জীবনের দীর্ঘ সময় ধরে ছোট ছোট পেশায় যুক্ত থেকে পরিবার চালানোর পাশাপাশি সমাজের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখছেন। তাদের শ্রম হয়তো বড় কোনো পরিসংখ্যানে উঠে আসে না, জীবনের গল্পও সচরাচর সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয় না। অথচ তাদের উপার্জনের ওপর নির্ভর করেই চলে অনেক পরিবার, মেটে প্রতিদিনের প্রয়োজন।

বিশেষ করে বয়সের ভারে কর্মক্ষমতা হারাতে থাকা শ্রমজীবী মানুষের নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ কতটা রয়েছে, তা বিবেচনার দাবি রাখে। যারা জীবনের দীর্ঘ সময় শ্রম দিয়ে কাটিয়েছেন, বার্ধক্যে তাদের ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

নূরুল হকের গল্প তাই শুধু একজন ট্রেনের ফেরিওয়ালার ব্যক্তিগত জীবনের বর্ণনা নয়; এটি শ্রম, আত্মমর্যাদা, জীবনের অনিশ্চয়তা এবং বার্ধক্যে নিরাপদ জীবনের প্রত্যাশার কথাও বলে।

শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশনে কিংবা চলন্ত ট্রেনের বগিতে পান-সিগারেট বিক্রি করতে দেখা নূরুল হককে অনেকেই হয়তো সাধারণ একজন ফেরিওয়ালা হিসেবেই দেখেন। কিন্তু তার এই পরিচয়ের আড়ালে রয়েছে ৪২ বছরের শ্রম, পরিবারের দায়িত্ব পালনের ইতিহাস এবং নীরবে বয়ে চলা অসংখ্য অভিজ্ঞতা।

শরীর আর আগের মতো সায় দেয় না, বয়সও হয়েছে ৭০ বছর। তারপরও থামেনি তার পথচলা। জীবনের বাস্তবতা এখনও তাকে কাজ করতে বাধ্য করছে। অন্যের কাছে হাত না পেতে নিজের উপার্জনে বেঁচে থাকার যে প্রত্যয় তিনি ধারণ করেন, সেটিই তার জীবনের অন্যতম বড় পরিচয়।

তার জীবনকথা মনে করিয়ে দেয়, মানুষের সাফল্য কেবল সম্পদ কিংবা অর্থের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না। সৎভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা, দায়িত্ব পালনের নিষ্ঠা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও আত্মমর্যাদা ধরে রাখার মধ্যেও রয়েছে এক ধরনের মহত্ত্ব।

তবু প্রশ্ন থেকে যায় জীবনের ৪২টি বছর শ্রম দিয়ে কাটানো একজন মানুষকে কেন ৭০ বছর বয়সেও জীবিকার তাগিদে একইভাবে ছুটে চলতে হবে? তার মতো শ্রমজীবী মানুষের বার্ধক্য কি আরও একটু নিরাপদ, স্বস্তিময় ও মর্যাদাপূর্ণ হতে পারে না?

মো. নূরুল হকের জীবনসংগ্রাম সেই প্রশ্নই সামনে নিয়ে আসে। যে মানুষটি সারাজীবন নিজের শ্রমে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছেন, জীবনের শেষ অধ্যায়ে তার জন্য কি একটু স্বস্তির ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়?

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর