বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩৫ অপরাহ্ন

কলাগাছের সুতা থেকে ‘কলাবতী’ শাড়ি, সম্ভাবনার গল্প থেমে আছে তাঁতেই

কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৪/১০/২০২৬ ১০:০০:৪৬ পূর্বাহ্ন

কলাগাছের সুতা থেকে ‘কলাবতী’ শাড়ি, সম্ভাবনার গল্প থেমে আছে তাঁতেই


কলাগাছের আঁশ থেকে সুতা, আর সেই সুতা বুনে শাড়ি ভাবনাটি ছিল ব্যতিক্রমী। সেই ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের তাঁতশিল্পী রাধাবতী দেবী। তাঁর হাতেই তৈরি হয়েছিল কলাগাছের সুতা দিয়ে বোনা শাড়ি ‘কলাবতী’। নতুন এই উদ্যোগ ঘিরে সম্ভাবনার যে আলো জ্বলে উঠেছিল, কয়েক বছর না যেতেই তা অনেকটা ম্লান হয়ে গেছে। এখন আর নিয়মিত তৈরি হচ্ছে না এই শাড়ি।

২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে বান্দরবান জেলা প্রশাসকের আমন্ত্রণে কলাগাছের সুতা দিয়ে শাড়ি বুনেছিলেন রাধাবতী দেবী। বান্দরবান জেলার আর্থসামাজিক উন্নয়নের সম্ভাবনা বিবেচনায় কলাগাছের আঁশ থেকে সুতা তৈরি করে বিভিন্ন হস্তশিল্পের পাশাপাশি শাড়ি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবেই মৌলভীবাজার থেকে তাঁতশিল্পীকে নিয়ে যাওয়া হয় বান্দরবানে।

প্রথমে কলাগাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরি সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ে ছিলেন রাধাবতী দেবী নিজেও। পরে সেই সুতা দিয়ে ছোট একটি কাপড় তৈরি করেন তিনি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনুরোধ ও নিজের চেষ্টায় প্রায় ১৫ দিনের পরিশ্রমে শেষ পর্যন্ত বুনে ফেলেন একটি পূর্ণাঙ্গ শাড়ি। শিল্পীর নামের সঙ্গে মিল রেখে শাড়িটির নাম দেওয়া হয় ‘কলাবতী’।

তবে ব্যতিক্রমী এই সাফল্যের পরও গড়ে ওঠেনি নিয়মিত উৎপাদনের ব্যবস্থা। সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে স্থায়ী প্রশিক্ষণকেন্দ্র কিংবা উৎপাদন প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠায় সম্ভাবনাময় এই শিল্প থমকে আছে।

রাধাবতী দেবী জানান, এখন পর্যন্ত কলাগাছের সুতা দিয়ে মোট নয়টি শাড়ি তৈরি করেছেন তিনি। প্রথমটি তৈরি করেন ২০২৩ সালের এপ্রিলে বান্দরবান জেলা প্রশাসকের আমন্ত্রণে।

একই বছরের সেপ্টেম্বরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ফাউন্ডেশনের আয়োজনে শ্রীমঙ্গলের ডলুছড়া গ্রামের ত্রিপুরা জাতিগোষ্ঠীর নারীদের নিয়ে ২০ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সেখানে ৩০ জন নারীকে কলাগাছ থেকে সংগ্রহ করা সুতা দিয়ে শাড়ি বোনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ওই প্রশিক্ষণে তৈরি হয়েছিল চারটি শাড়ি। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের জন্য তাঁকে ৮০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল বলে জানান রাধাবতী দেবী।

এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত বান্দরবান জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা ৬০ দিনব্যাপী আরেকটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। সেখানে ৫০ জন প্রশিক্ষণার্থীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং তৈরি করা হয় আরও চারটি শাড়ি। ওই কার্যক্রমে সব খরচ বাদে তাঁকে ৬০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর আর কেউ এই কাজের বিষয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেননি বলে জানান রাধাবতী দেবী। তাঁর মতে, কয়েক দফা প্রশিক্ষণ ও শাড়ি তৈরির অভিজ্ঞতা অর্জিত হলেও তা স্থায়ী শিল্পে রূপ নেওয়ার মতো ধারাবাহিক উদ্যোগ গড়ে ওঠেনি।

কলাগাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরি করা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। রাধাবতী দেবীর হিসাব অনুযায়ী, একটি শাড়ি তৈরি করতে ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগে। এতে খরচ হয় প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা।

প্রতিটি শাড়ির জন্য প্রয়োজন হয় প্রায় ৫০০ গ্রাম কলাগাছের সুতা। পাশাপাশি আরও প্রায় ৫০০ গ্রাম অন্য সুতা লাগে। প্রয়োজনীয় কলাগাছের সুতা বান্দরবান থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব হলেও শাড়ি তৈরির শ্রম, অর্থায়ন ও প্রশিক্ষণের অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাধাবতী দেবী বলেন, ‘শাড়ি তৈরির ইচ্ছা আছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে কাজটি চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। যেসব প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে কাজ করেছি, সেখানে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো খরচ বহন করেছে। নিজ উদ্যোগে কাজ করতে হলে অনেক টাকা প্রয়োজন।’

তাঁর ধারণা, কলাগাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরির একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প গড়ে তুলতে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে। কিন্তু এই অর্থ তাঁর একার পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব নয়। সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে প্রশিক্ষণ ও উৎপাদনের মাধ্যমে শিল্পটিকে নতুন করে দাঁড় করানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

রাধাবতী দেবীর ভাষ্য, শুধু অর্থায়ন নয়, দক্ষতা বাড়ানোর জন্য ধারাবাহিক প্রশিক্ষণও জরুরি। পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নেওয়া হলে এই কাজের সঙ্গে আরও মানুষকে যুক্ত করা যাবে।

তিনি জানান, শাড়ি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ ধরনের কলাগাছ সিলেট অঞ্চলে নেই। বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকা থেকে কলাগাছ সংগ্রহ করে সেখানকার আঁশ থেকে সুতা বের করতে হয়। বর্তমানে তিনি বিছানার চাদর তৈরি করেন, যা দেশের পাশাপাশি বিদেশেও বিক্রি হয়।

কলাগাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরির উদ্যোগ কেন এগোয়নি, তার ব্যাখ্যায় উৎপাদন ব্যয়, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণের সীমাবদ্ধতার কথা বলছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বান্দরবান বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক মো. শামীম আলম বলেন, কলাগাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরির কার্যক্রম বর্তমানে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এ বিষয়ে দুই মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও প্রকল্পটি সফল হয়নি।

তাঁর ভাষ্য, প্রক্রিয়াজাতকরণসহ উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে খরচ অনেক বেশি হওয়ায় উদ্যোগটি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে এই শিল্পের ধারাবাহিকতা কীভাবে বজায় রাখা যাবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্যও পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের উপমহাব্যবস্থাপক (এসিসিআর ও মার্কেটিং) রতন চন্দ্র সাহাও মনে করেন, কলাগাছের সুতা দিয়ে তৈরি শাড়ি বাজারজাত করার মতো পর্যায়ে নিতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, এ ধরনের শাড়ি তৈরির সম্ভাবনা যাচাই করতে তাঁত বোর্ডের একটি প্রতিনিধিদল একসময় বান্দরবান গিয়েছিল। তবে শাড়িতে কলাগাছের সুতা ও অন্যান্য সুতার ব্যবহার কতটুকু হবে, তা এখনো সুস্পষ্ট নয়। একই সঙ্গে শাড়ি মসৃণ ও আরামদায়ক করার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।

রতন চন্দ্র সাহা বলেন, শুধু বান্দরবান নয়, বিভিন্ন জায়গায় অনেকে কলাগাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরির চেষ্টা করছেন। এ বিষয়ে কেউ তাঁত বোর্ডের সহযোগিতা চাইলে প্রতিষ্ঠানটি সহায়তা করতে প্রস্তুত।

কলাগাছের সুতা দিয়ে ‘কলাবতী’ শাড়ি তৈরির গল্প প্রমাণ করে, নতুন উপকরণ নিয়ে কাজ করার সক্ষমতা রয়েছে দেশের তাঁতশিল্পীদের। কিন্তু একটি ব্যতিক্রমী সৃষ্টি থেকে নিয়মিত উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে পৌঁছাতে প্রয়োজন গবেষণা, প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন এবং পরিকল্পিত উদ্যোগ।

রাধাবতী দেবীর হাতে তৈরি নয়টি শাড়ি সেই সম্ভাবনার সাক্ষ্য হয়ে আছে। তবে সম্ভাবনাকে টেকসই শিল্পে রূপ দিতে হলে বিচ্ছিন্ন প্রশিক্ষণ বা এককালীন উদ্যোগের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, উৎপাদন ব্যয় কমানোর গবেষণা এবং বাজার উপযোগী পণ্য তৈরির ব্যবস্থা গড়ে উঠলে কলাগাছের আঁশ থেকে তৈরি সুতা দেশের তাঁতশিল্পে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে।

এখন প্রশ্ন, ‘কলাবতী’ কি কেবল ব্যতিক্রমী একটি শাড়ির গল্প হয়েই থাকবে, নাকি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেয়ে রাধাবতী দেবীর হাত ধরে নতুন একটি শিল্পের যাত্রা শুরু হবে?

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর