বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩২ অপরাহ্ন

ছয় বছরেও ‘তারবিহীন’ হয়নি সিলেট, ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ লাইনের কাজ সীমিত এলাকায়

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫/১০/২০২৬ ০৯:৫৪:৫৩ পূর্বাহ্ন

ছয় বছরেও ‘তারবিহীন’ হয়নি সিলেট, ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ লাইনের কাজ সীমিত এলাকায়


সিলেট নগরকে বিদ্যুতের খুঁটি ও তারের জঞ্জালমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল প্রায় ছয় বছর আগে। হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার এলাকায় মাটির নিচ দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালুর পর ‘তারবিহীন সিলেট নগর’ গড়ার পরিকল্পনাও সামনে আসে। কিন্তু সেই উদ্যোগের বিস্তার প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। নগরের বিভিন্ন সড়কে এখনো দৃশ্যমান বিদ্যুতের খুঁটি ও তার।

২০২০ সালে দেশের মধ্যে প্রথমবারের মতো সিলেট নগরের মাজার এলাকায় ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ সরবরাহ কার্যক্রম চালু হয়। এর আগে ওই এলাকার সড়কের ওপর থাকা বিদ্যুতের খুঁটি ও তার সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। উদ্যোগটি তখন দেশজুড়ে প্রশংসা পায়। পর্যায়ক্রমে পুরো নগরে এ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের কথাও জানানো হয়েছিল।

তবে ছয় বছর পরও নগরের বেশির ভাগ এলাকায় বিদ্যুতের তার ও খুঁটি রয়ে গেছে। দরগাহ গেট থেকে সার্কিট হাউস পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটার সড়কে ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ লাইন স্থাপনের কথা বলা হলেও, সড়কের ওপরের বিদ্যুতের খুঁটি ও তার পুরোপুরি সরানো হয়নি। প্রকল্পটির অগ্রগতি, ব্যয় ও বাস্তবায়ন নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতেও পাওয়া যায়নি পূর্ণাঙ্গ ও সুনির্দিষ্ট তথ্য।

সিলেট নগরের সৌন্দর্য বাড়ানো এবং সড়কের ওপর বিদ্যুতের খুঁটি ও তারের জঞ্জাল কমানোর লক্ষ্য নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রকল্প নেওয়া হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জুলাইয়ে ‘সিলেট বিভাগ বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন’ প্রকল্প অনুমোদন করে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এর আওতায় নগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রায় সাত কিলোমিটার বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন মাটির নিচ দিয়ে নেওয়ার জন্য ৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

পরিকল্পনায় দরগাহ গেট থেকে নয়াসড়ক, কুমারপাড়া, জিন্দাবাজার, বন্দরবাজারের কোর্ট পয়েন্ট, সার্কিট হাউস হয়ে তালতলা এবং চৌহাট্টা, রিকাবীবাজার ও ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সড়ক হয়ে নবাব রোড পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা ছিল।

প্রকল্পটির কাজ ২০১৮-১৯ সালের দিকে শুরু হয় বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। তবে প্রকল্পের বাস্তবায়ন, মোট ব্যয় এবং অর্জনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নিয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি।

প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে কয়েক দিন চেষ্টা করেও সিলেটের বিদ্যুৎ বিভাগ ও সিলেট সিটি করপোরেশনের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী জারজিসু রহমান রনি বলেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে পারবেন বিদায়ী প্রকৌশলী জাহিদুর রহমান। তিনি প্রকল্পে ছিলেন এবং টানা পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন।

তবে জাহিদুর রহমান জানান, প্রকল্প সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত জানেন না। এ বিষয়ে নুরুল হুদা চৌধুরী ও সাইদুর রহমানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নুরুল হুদা চৌধুরী প্রকল্পের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি অবসরে যাওয়ার পর সাইদুর রহমান দায়িত্ব পালন করেন।

পরে সাইদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, প্রকল্প পরিচালক চন্দন কুমার সূত্রধর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে পারবেন। তবে তাঁর জানা অনুযায়ী, প্রকল্পের কাজ মোটামুটি শেষ হয়েছে।

নগরের বিভিন্ন এলাকায় এখনো বিদ্যুতের তার দৃশ্যমান থাকার বিষয়ে সাইদুর রহমান বলেন, দরগাহ গেট থেকে সার্কিট হাউস পর্যন্ত সাত কিলোমিটার সড়কের দুই পাশেই ভূগর্ভস্থ লাইন রয়েছে। তবে মাঝখানে একটি ওভারহেড লাইন রাখা হয়েছে, যাতে বিদ্যুৎ সঞ্চালনে সমস্যা হলে গ্রাহকেরা দ্রুত বিকল্প সংযোগ পেতে পারেন।

ভূগর্ভস্থ লাইনে সমস্যা হয়েছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি জানান, অনেক আগে জিন্দাবাজারে একবার তারে লিকেজ হয়েছিল। পরে সেটি মেরামত করা হয়।

সাইদুর রহমানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আম্বরখানা থেকে সার্কিট হাউস এবং জিন্দাবাজার থেকে নয়াসড়ক হয়ে পানসি রেস্টুরেন্ট ও মির্জাজাঙ্গাল পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ লাইন স্থাপন করা হয়েছে। তবে তালতলা এলাকায় কাজ হয়নি। মেডিকেল রোডে কিছু কাজ হয়েছিল বলেও তাঁর মনে পড়ে। বিস্তারিত জানতে তিনি প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

অন্যদিকে, মির্জাজাঙ্গাল বিদ্যুৎ অভিযোগ কেন্দ্রের লাইনম্যান আব্দুল কাইয়ুমের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশপাশের অধিকাংশ এলাকায় এখনো প্রচলিত ওভারহেড লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, এটি অনেক আগের প্রকল্প। এ বিষয়ে তাঁর তেমন জানা নেই। তাঁর আগে আরিফুল হক চৌধুরী ও আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী মেয়রের দায়িত্বে ছিলেন। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রশাসনিক পরিবর্তন হয়েছে। প্রকল্প সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে তিনি সিটি করপোরেশনের নির্বাহী বিদ্যুৎ প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

সিটি করপোরেশনের বিদ্যুৎ প্রকৌশলী জয়দেব বিশ্বাস বলেন, তৎকালীন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) দরগাহ গেট থেকে মেডিকেল রোড হয়ে নবাব রোড এবং নয়াসড়ক ও কুমারপাড়া হয়ে তালতলা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ভূগর্ভস্থ করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ওই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে দরগাহ ও জিন্দাবাজারের কিছু এলাকায় কাজ হয়েছে। সে সময় সড়কে থাকা ইন্টারনেট লাইন, আইএসপি ও অন্যান্য ইউটিলিটি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে সিটি করপোরেশন সহযোগিতা করেছিল। তবে বিদ্যুতের লাইন স্থাপন করেছে পিডিবি, তাদের তত্ত্বাবধান ও অর্থায়নে।

বাকি কাজ কেন শেষ হয়নি, সে বিষয়ে জয়দেব বিশ্বাস বলেন, এ বিষয়ে পিডিবি ভালো বলতে পারবে। সিলেট পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হাসান প্রকল্পটির দায়িত্বে ছিলেন।

জিয়াউল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বর্তমানে তিনি জৈন্তাপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে আবাসিক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকল্পে তিনি মূলত দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন। বিস্তারিত জানতে তিনি প্রকল্প পরিচালক চন্দন কুমার সূত্রধরের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

জিয়াউল হাসান বলেন, কুমারপাড়া ও নয়াসড়ক হয়ে সার্কিট হাউস পর্যন্ত প্রায় সব এলাকার কাজ হয়েছে। তবে গ্রাহকদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে কিছু এলাকায় ওভারহেড লাইন রাখা হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক চন্দন কুমার সূত্রধর জানান, ২০২৩ সালের নভেম্বরের দিকে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী মেয়র থাকাকালে তিনি প্রকল্পের দায়িত্ব বুঝে নেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি ২০১৬ সালের দিকে অনুমোদন পেলেও কাজ শুরু হয় ২০১৮-১৯ সালের দিকে। সব কাজ শেষে চলতি বছরের জুনে প্রকল্পটি সমাপ্ত হয়েছে।

চন্দন কুমার সূত্রধর বলেন, এ প্রকল্পের একটি অংশ ছিল ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ সঞ্চালন। সেই কাজ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। তবে পুরো নগরকে এ প্রকল্পের আওতায় আনা হয়নি। যতটুকু করার কথা ছিল, ততটুকুই করা হয়েছে।

পুরো নগরকে ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রকল্পটির লক্ষ্য পুরো শহরকে এর আওতায় আনা ছিল না। আগের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, তৎকালীন মেয়র এবং বর্তমান শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী পুরো নগরকে তারবিহীন বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এ বিষয়ে প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। তবে ব্যয়বহুল ও জটিল হওয়ায় মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ ও পরিকল্পনা পর্যায়ে প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য হয়নি।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর