শত বছরেও স্বীকৃতি মেলেনি, অধিকারবঞ্চিত আদিবাসীরা
সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ০২:১১ PM

শত বছরেও স্বীকৃতি মেলেনি, অধিকারবঞ্চিত আদিবাসীরা

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১০/০৮/২০২৬ ০৯:০৮:৫১ AM

শত বছরেও স্বীকৃতি মেলেনি, অধিকারবঞ্চিত আদিবাসীরা


শত শত বছর ধরে মৌলভীবাজারসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস। নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রেখে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করলেও এখনো সরকারি পর্যায়ে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি মেলেনি তাদের। দীর্ঘদিন ধরে ভূমির অধিকার, সাংবিধানিক ও সরকারি স্বীকৃতিসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়ে এলেও সেগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।

পাহাড় কিংবা সমতলে যেখানেই বসবাস হোক না কেন, বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মৌলভীবাজারের আদিবাসীরা। ভূমির অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

আদিবাসীরা জানান, শত শত বছর ধরে এ দেশে বসবাস করেও এখনো তাদের ভূমির অধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। সরকারি নথিতে তাদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বা উপজাতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অনেক আদিবাসী এলাকায় এখনো পৌঁছায়নি বিশুদ্ধ পানি ও বিদ্যুৎ। সাংবিধানিক ও সরকারি স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে আসলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।

বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী ফোরাম সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে পাহাড়ি ও সমতল অঞ্চলে ৫০টির বেশি আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন। এর মধ্যে মৌলভীবাজারে মনিপুরী, খাসিয়া, ত্রিপুরা, গারো, ওরাওঁসহ ২৫টির বেশি আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রায় দুই লাখ মানুষ পাহাড় ও সমতলে বসবাস করছেন। নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে জীবনযাপন করলেও সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষ করে ভূমির অধিকার, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানি ও যোগাযোগব্যবস্থায় সংকট রয়েছে। চা বাগান ও খাসিয়া সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষের ভূমির অধিকার এখনো নিশ্চিত হয়নি। ভূমির অধিকার না থাকায় অন্তত ৫০ হাজার আদিবাসী পাহাড় ও টিলায় ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। অধিকাংশ চা বাগান ও খাসিয়া পুঞ্জিতে নেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ফলে এসব এলাকার অনেক শিশু প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বিভিন্ন আদিবাসী নেতা জানান, জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী প্রতি বছর ৯ আগস্ট বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত হয়। বাংলাদেশেও তারা বেসরকারিভাবে দিবসটি পালন করেন। তবে সরকারিভাবে আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। তাদের ভাষ্য, নানা সমস্যার মধ্যে জীবনযাপন করতে গিয়ে তারা মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

চা শ্রমিক সন্তান দিনেশ বাউরি বলেন, এই সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে অন্যতম চা জনগোষ্ঠী। চা বাগানে বহু আদিবাসী আছেন, যারা কাজ করেন। তবে তারা সবকিছু থেকেই বঞ্চিত। কাগজে-কলমে বাংলাদেশি নাগরিক হলেও নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত। বিশেষ করে ভূমির অধিকার ও মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানালেও তা বাস্তবায়ন হয় না। কর্মসংস্থানের অভাবে হাজার হাজার চা বাগানের শ্রমিক বেকারত্ব নিয়ে ঘুরছেন।

খাসিয়া সম্প্রদায়ের সাজু মারচিয়াং বলেন, আদিবাসীরা বরাবরের মতো সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। শত বছরের বেশি সময় ধরে বসবাস করলেও এখনো ভূমির অধিকার নিশ্চিত হয়নি। অনেক পুঞ্জিতে এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। শিক্ষার জন্য নেই কোনো সরকারি ব্যবস্থা। পাহাড়ে পান চাষ করে বেশিরভাগ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছেন। খাসিয়া পুঞ্জিগুলোতে বিশুদ্ধ পানিরও সংকট রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদের সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, আদিবাসীরা যেহেতু এ দেশের নাগরিক, তাদের অবশ্যই ভূমির অধিকার দেওয়া প্রয়োজন। শুধু ভূমি নয়, তাদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ শত শত বছর ধরে তারা এ দেশে বসবাস করে আসছেন। অথচ এখনো তাদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, তাদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি বলেন, আদিবাসীরা শিক্ষা, চিকিৎসা, ভূমির অধিকার ও মজুরি বৈষম্যের শিকার। বিশেষ করে চা শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। শত বছর ধরে বসবাস করলেও এখনো ভূমির অধিকার পাননি শ্রমিকেরা। চা শ্রমিকসহ সব ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নাগরিককে আদিবাসী হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি দিতে হবে।

বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী ফোরামের কো-চেয়ারপার্সন ও মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জির হেডম্যান জিডিসন প্রধান সুচিয়াং বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির জন্য দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আদিবাসীদের ভূমির অধিকারও এখনো নিশ্চিত হয়নি। আমাদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলা হয়। বর্তমান সরকারের কাছে আমরা দাবি জানাচ্ছি, আমাদের সাংবিধানিক ও সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হোক আদিবাসী হিসেবে।

মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তানভীর হোসেন বলেন, আদিবাসীরা আমাদের কাছে কোনো দাবি জানাননি। তারা যদি আমাদের কাছে কোনো দাবি জানান, তাহলে তাদের দাবিগুলো সরকারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

আজকের সিলেট/জেএন/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর