বেসরকারিতে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির নীতিমালা করার উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। ফলে সামনে আসছে সরকারি জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সক্ষমতার বিষয়টি। বেসরকারিতে দিলেও নিয়ন্ত্রণ করার মতো সক্ষমতা সরকারি নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটির কতটুকু- তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানিতে বিনিয়োগ করছে দেশের হাতেগোনা কয়েকটি বড় গ্রুপ। এসব ব্যবসায়ী গ্রুপের মধ্যে দু-একটি এতই শক্তিশালী যে, তাদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো সক্ষমতা ও আইনি ভিত্তি বর্তমানে বিইআরসির নেই। ১৯৯৬ সালে প্রণয়ন করা বেসরকারি জ্বালানি নীতির কার্যকর প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি। বিইআরসির ১০টি রেগুলেশন (প্রবিধান) ১৫ বছরেও অনুমোদন করেনি সরকার।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বেসরকারিতে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি নিয়ে একটি শিল্প গ্রুপের আবেদনের বিষয়ে বিপিসি ১১ সদস্যের হাইপ্রোফাইল কমিটির প্রতিবেদন বিপিসির চেয়ারম্যান হয়ে গত মাসের শেষের দিকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে জমা পড়ে। এর আগে ২১ জুলাই দেওয়া ওই প্রতিবেদনে না সূচক মতামত দেওয়া হয়।
এর দুই সপ্তাহ পেরিয়ে না যেতেই তড়িঘড়ি করে বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির খসড়া নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। ৬ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অপারেশন-২ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব আসিফ আহমেদ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিপূর্বক সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। চিঠিতে ১০ আগস্টের মধ্যে বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা-২০২৬ এর (খসড়া) আগামী ১০ আগস্টের মধ্যে স্বাক্ষরকারীর বিভাগে পাঠানোর জন্য বিপিসির চেয়ারম্যানকে (অতিরিক্ত দায়িত্ব) নির্দেশনা দেওয়া হয়।
পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম জ্বালানি বেসরকারি খাতে গেলে সিন্ডিকেট হবেই। একবার দিয়ে দিলে এটা সরকার আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।-কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিএল) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সানোয়ার হোসেন চৌধুরী।
এর মধ্যে ৬ আগস্ট বিকেলেই বিপিসির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব জিয়াউল হককে পদোন্নতি দিয়ে একই বিভাগের সচিব করা হয়। এরপর থেকে বিপিসিতে আর কোনো চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এতে অভিভাবক শূন্য সরকারি জ্বালানি আমদানি বিপণনের কাজে জড়িত প্রতিষ্ঠানটি। ৯ আগস্ট বিকেল পর্যন্ত ওই খসড়া নীতিমালা তৈরির কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বিপিসি।
এদিকে নীতিমালার খসড়া তৈরির খবর ছড়িয়ে পড়লে জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে অস্থিরতা তৈরি হয়। এর মধ্যে ১০ আগস্ট বিপিসি ঘেরাওয়ের কর্মসূচি দিয়েছে জ্বালানি বিভাগের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মচারীদের সংগঠন বাংলাদেশ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন।
ইস্টার্ন রিফাইনারি এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি নীতিমালার কোনো খসড়া তৈরি করে জ্বালানি বিভাগে পাঠানো মেনে নেওয়া হবে না। রাষ্ট্রবিরোধী ওই সিদ্ধান্তকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করা হবে।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিএল) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সানোয়ার হোসেন চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম জ্বালানি বেসরকারি খাতে গেলে সিন্ডিকেট হবেই। একবার দিয়ে দিলে এটা সরকার আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।
রেগুলেশনগুলো গত ১৫ বছর ধরে মন্ত্রণালয়ে পড়ে আছে। তাদের (মন্ত্রণালয়) কাজ শুধু আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং নেওয়ার জন্য পাঠাবে, শুধু ঠিক আছে কি নেই, সেই কাজটাই আইন মন্ত্রণালয় দেখে দেবে। এ কাজটা করতে এত বছর গেলো, মন্ত্রণালয় করছে না। এভাবে হলে, তো হবে (নিয়ন্ত্রণ) না।-বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য (গ্যাস) মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরী।
পরিশোধিত আমদানি জ্বালানি বেসরকারিতে দিলে তা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য (গ্যাস) মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণ করার মতো নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা যদি সরকার তৈরি করে তাহলে শুধু পরিশোধিত জ্বালানি নয়, সব ধরনের জ্বালানির বিষয়ে বিইআরসি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। যদি না চায় (সরকার), তাহলে সম্ভব নয়।’
তিনি এলপিজির উদাহরণ টেনে বলেন, ‘বর্তমানে এলপিজির বাজার বিইআরসি নিয়ন্ত্রণ করছে। সরকারের হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর স্ট্রংলি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলেও কিছু তো হচ্ছে। সরকার যদি এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে সেভাবে সাজাতে পারে, প্রশাসনিক ক্ষমতা দিতে পারেন, ১০-১২ রেগুলেশন যেগুলো মন্ত্রণালয়ে পড়ে আছে, সেগুলো অনুমোদন করে দিলে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘রেগুলেশনগুলো গত ১৫ বছর ধরে মন্ত্রণালয়ে পড়ে আছে। তাদের (মন্ত্রণালয়) কাজ শুধু আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং নেওয়ার জন্য পাঠাবে, শুধু ঠিক আছে কি নেই, সেই কাজটাই আইন মন্ত্রণালয় দেখে দেবে। এ কাজটা করতে এত বছর গেলো, মন্ত্রণালয় করছে না। এভাবে হলে, তো হবে (নিয়ন্ত্রণ) না। এখন মন্ত্রণালয় যদি পরিচালনা করতে চায়, তাহলে হ-য-ব-র-ল হবে, তারা পারবে না।’
প্রাইভেট সেক্টর সারা পৃথিবীতে কাজ করছে, তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা- এমন তথ্য জানিয়ে এ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, বিইআরসির বর্তমান যে আইন আছে, সে অনুযায়ী, রুলস-রেগুলেশনগুলো যদি অনুমোদন করে দেয়, তাহলে বিইআরসি পারবে।
সরকার বড় ব্যবসায়ীদের কাছে হার মেনে যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে একটি খারাপ কাজ হয়েছে, তা হলো- গ্যাসের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা বিইআরসি থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে তেল-গ্যাসের ব্যবসাটা করে দেশের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ীরা। তারা প্রচণ্ড ক্ষমতাধর। তারা এতই ক্ষমতাশালী ছিল যে, তারা আইনটা পর্যন্ত বদলিয়ে দিয়েছিল।
বিএনপির প্রথম আমলের জাতীয় জ্বালানি নীতি বাস্তবায়ন করা গেলের বেসরকারিতেও জ্বালানি বিপণন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব জানিয়ে জ্বালানি খাতের এ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ১৯৯৩-৯৫ সাল পর্যন্ত জাতীয় জ্বালানি নীতিমালা করা হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রজ্ঞাপন হয়। সেটা অনুসরণ করলে তেমন সমস্যা থাকে না। ওই নীতিমালাটা এদেশের মানুষ দ্বারা তৈরি।’
বর্তমানে বেসরকারিতে যে এলপিজি রয়েছে, তাদের নিয়ন্ত্রণ করার গাইডলাইন ম্যাকানিজম আমাদের প্রবিধানে যা আছে, সে অনুযায়ী আমরা তাদের সঙ্গে আচরণ করি। তারাও আমাদের গাইডলাইন মানার চেষ্টা করেন।-বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সদস্য (অর্থ, প্রশাসন ও আইন) মো. আব্দুর রাজ্জাক।
সরকার পরিশোধিত জ্বালানি বেসরকারিতে দেওয়ার যে পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে বিইআরসি কতটুকু প্রস্তুত- এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সদস্য (অর্থ, প্রশাসন ও আইন) মো. আব্দুর রাজ্জাক জাগো নিউজকে বলেন, সরকার পরিশোধিত জ্বালানি বেসরকারিতে দিতে যাচ্ছে, সেটা আমরাও শুনেছি। এটি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত, সেটার সঙ্গে এখন পর্যন্ত বিইআরসির কোনো সম্পর্ক নেই।
তিনি বলেন, বর্তমানে বেসরকারিতে যে এলপিজি রয়েছে, তাদের নিয়ন্ত্রণ করার গাইডলাইন ম্যাকানিজম আমাদের প্রবিধানে যা আছে, সে অনুযায়ী আমরা তাদের সঙ্গে আচরণ করি। তারাও আমাদের গাইডলাইন মানার চেষ্টা করেন।’
মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া রেগুলেশন আটকা আছে জানিয়ে তিনি বলেন, অনেকদিন হলো আমাদের রেগুলেশনগুলো মন্ত্রণালয়ে পড়ে আছে। তাদেরও হয়তো সমস্যা থাকতে পারে। যে কারণে অনুমোদন হচ্ছে না।
আজকের সিলেট/জেএন/ জেকেএস
অর্থনীতি ডেস্ক 








