সমুদ্রভিত্তিক মৎস্য খাতে বিনিয়োগে জোর, ব্লু ইকোনমিতে আট অগ্রাধিকার প্রকল্প
বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ১২:২৩ PM

সমুদ্রভিত্তিক মৎস্য খাতে বিনিয়োগে জোর, ব্লু ইকোনমিতে আট অগ্রাধিকার প্রকল্প

অর্থনীতি ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৬/০৮/২০২৬ ১০:১৮:০৭ AM

সমুদ্রভিত্তিক মৎস্য খাতে বিনিয়োগে জোর, ব্লু ইকোনমিতে আট অগ্রাধিকার প্রকল্প


দীর্ঘদিন ধরে দেশের মৎস্য খাত মূলত অভ্যন্তরীণ জলাশয়ভিত্তিক উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও এখন সমুদ্রভিত্তিক উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। বিশেষ করে মেরিকালচার, সিফুড প্রসেসিং এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে একগুচ্ছ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও রপ্তানি পর্যন্ত পুরো মূল্যশৃঙ্খলে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে দেশের ব্লু ইকোনমি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। বর্তমানে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) মৎস্য খাতের অবদান প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে প্রায় ২২ শতাংশ। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশ্বের শীর্ষ অভ্যন্তরীণ মৎস্য ও অ্যাকুয়াকালচার উৎপাদনকারী দেশগুলোর অন্যতম। তবে এখন সরকারের লক্ষ্য শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি নয়; বরং উচ্চমূল্যের সামুদ্রিক প্রজাতির চাষ, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তোলা।

আট অগ্রাধিকার প্রকল্প

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সামুদ্রিক অর্থনীতিতে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য সরকার আটটি অগ্রাধিকার প্রকল্প নির্ধারণ করেছে। প্রকল্পগুলো হলো, মেরিন ফিশ হ্যাচারি (সামুদ্রিক মাছের পোনা উৎপাদন কেন্দ্র), অফশোর কেজ ফার্মিং (উপকূলের বাইরে সমুদ্রে খাঁচা পদ্ধতিতে মাছ চাষ), বাণিজ্যিক সি-উইড (শৈবাল) খামার, আধুনিক ল্যান্ডিং সেন্টার (মৎস্য অবতরণ ও সংগ্রহ কেন্দ্র), সিফুড প্রসেসিং পার্ক (সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প পার্ক), কোল্ড-চেইন ও রেফ্রিজারেটেড লজিস্টিকস (হিমায়িত সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থা), ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি সিস্টেম (উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খল অনুসরণ ব্যবস্থা), অ্যাকুয়াকালচার প্রযুক্তি ও অটোমেশন (মৎস্য ও জলজ চাষে আধুনিক প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয়করণ)।

মৎস্য অধিদপ্তরের ব্লু ইকোনমি বিভাগের উপপরিচালক ড. মুহাম্মদ তানভীর হোসেন চৌধুরী বলেন, এই আটটি প্রকল্প পরস্পরের পরিপূরক। হ্যাচারিতে উন্নতমানের পোনা উৎপাদন হবে, অফশোর কেজ ফার্মিংয়ের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে সামুদ্রিক মাছ চাষ সম্প্রসারিত হবে এবং সি-উইডসহ অন্যান্য সামুদ্রিক সম্পদের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে।

তিনি আরও জানান, আধুনিক ল্যান্ডিং সেন্টার মাছের গুণগত মান সংরক্ষণে সহায়তা করবে। অন্যদিকে সিফুড প্রসেসিং পার্ক এবং কোল্ড-চেইন ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি ও অটোমেশন উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, দক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানসম্মত করে তুলবে।

মূল্যশৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে বিনিয়োগের সুযোগ

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিনিয়োগের সুযোগ শুধু উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নয়। বাণিজ্যিক খামার, হ্যাচারি, মাছের খাদ্য উৎপাদন, খামারের সরঞ্জাম, কোল্ড-চেইন, প্রসেসিং, প্যাকেজিং, লজিস্টিকস, স্মার্ট মনিটরিং, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি এবং পরিবেশ পর্যবেক্ষণ—পুরো মূল্যশৃঙ্খলজুড়েই রয়েছে বিনিয়োগের ব্যাপক সম্ভাবনা।

মেরিকালচারের জন্য দেশের কয়েকটি উপকূলীয় এলাকাকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কক্সবাজার-টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন, মহেশখালী-সোনাদিয়া, কুতুবদিয়া, সন্দ্বীপ-নোয়াখালী উপকূল এবং খুলনা-সাতক্ষীরা অঞ্চল। এসব এলাকায় সামুদ্রিক মাছ, সি-উইড, ঝিনুক ও কাঁকড়া চাষ সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনা

ইতোমধ্যে সামুদ্রিক মাছ, সি-উইড, শেলফিশ ও কাঁকড়া চাষে পরীক্ষামূলক উদ্যোগ সফল হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন প্রজাতি নির্বাচন, হ্যাচারি উন্নয়ন, স্মার্ট অ্যাকুয়াকালচার এবং আইওটি-ভিত্তিক খামার ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণাও এগিয়ে চলছে। ফলে এ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, চীন, মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের সিফুড রপ্তানির বড় সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। দেশে ইতোমধ্যে আধুনিক প্রসেসিং প্ল্যান্ট, কোল্ড স্টোরেজ, বন্দর, সড়ক যোগাযোগ, মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক রপ্তানি সনদ প্রদানের সক্ষমতা গড়ে উঠেছে, যা নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।

এ খাতকে আরও এগিয়ে নিতে জাতীয় মৎস্যনীতি-২০২৬, মেরিন ফিশারিজ আইন-২০২০, মেরিন ফিশারিজ রুলস-২০২৩, ২০২৬-২০৩৫ সময়কালের কৌশলগত পরিকল্পনা, মেরিন স্পেশাল প্ল্যানিং (এমএসপি), সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) এবং জলবায়ু-সহনশীল ব্লু ইকোনমি বাস্তবায়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আজকের সিলেট/বিপি/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর