সাদাপাথর লুটপাটকে কেন্দ্র করে সিলেট যখন দেশজুড়ে আলোচনার তুঙ্গে ছিল, ঠিক তখনই র্যাবের আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে পরিচিত মো. সারওয়ার আলম সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়ন করা হয়। তার এই আগমনটা ছিল নন্দিত। এর পর দাপুটের সঙ্গে সিলেটের বিভিন্ন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে বেশ প্রশংসা কুঁড়িয়েছেন তিনি। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনপূর্ব ও পরবর্তী সময়ে তার একের পর বিতর্কিত কর্মকান্ড তাকে নন্দিতের দিক থেকে নিন্দিতের দিকে নিয়ে যায়।
সবশেষ রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে সারওয়ার আলমকে সিলেটের ডেপুটি কমিশনারের পদ থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত করা হয়। যদিও প্রজ্ঞাপনে প্রত্যাহারের নির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তবে এ ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ডিসি প্রত্যাহারের বিষয়টি জানাজানি হলে সিলেটজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। শুরু হয় তার পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা। গতকাল দুপুর থেকে সিলেটের টক অব দ্যা সিটি ছিলো সারোয়ার আলমের প্রত্যাহার প্রসঙ্গ।
গত বছরের ১৮ আগস্ট সিলেটের ডিসি হিসেবে নিয়োগ পান সারওয়ার আলম। এর আগে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের একান্ত সচিবের দায়িত্বে ছিলেন।
তার আগে ২৭তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডার মর্যাদার এই কর্মকর্তা র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ওই সময় ভেজাল ও দুর্নীতিবিরোধী সাড়ে তিন শতাধিক অভিযান পরিচালনা করে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রশংসা ও পরিচিতি লাভ করেন। সুপরিচিত ছিলেন সিলেটবাসীর কাছেও। সেই সুবাদে সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে সারোয়ার আলম নিয়োগ পাওয়ার স্থানীয়দের মাঝে সঞ্চার হয় ব্যাপক আশা-প্রত্যাশার।
ডিসি হিসেবে সিলেটে এসেই তুমুল আলোচনায় আসেন সারোয়ার আলম। ২০২৫ সালের আগস্ট মাস। সিলেটের পর্যটন কেন্দ্র সাদাপাথরের পাথর লুট-কাণ্ডে দেশজুড়েই চলছে ব্যাপক সমালোচনা। লুট ঠেকাতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এমন অবস্থায় ওই সময় তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদকে সরিয়ে মো. সারওয়ার আলমকে সিলেটের দায়িত্বে আনা হয়।
সিলেটে এসেই কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথর পরিদর্শনে যান সারোয়ার। এসময় কিছুদিনের মধ্যেই আগের অবস্থায় ফিরবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তিনি ওই সময় বলেন- সাদাপাথরে পাথর পুনঃস্থাপন, লুটেরাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও প্রতিরোধ- এই তিন বিষয় সামনে রেখে আমি কাজ করবো। আর যাতে সিলেটের পাথর লুট হতে না পারে বা বাইরে যেতে না পারে, সে জন্য আমরা আরও কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করব। লুণ্ঠিত পাথরগুলো কোথায় কোথায় আছে, সেটি খুঁজে বের করে আমরা রি–ইনস্টল করছি। আশা করছি, কিছুদিনের মধ্যে সাদাপাথর আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।
কিন্তু আলোচিত পাথরলুটকাণ্ডে জেলা প্রশাসন ঘটিত তদন্ত কমিটি জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন জমা দিলে আজও তা আলোর মুখ দেখেনি। এমনকি রহস্যজনক কারনে প্রতিবেদনটি আজ পর্যনন্ত তিনি প্রকাশও করেন নি। এই বিষয়ে বক্তব্য নেয়ার জন্য সাংবাদিকরা তার কাছে গেলে ঘন্টার পর ঘন্টা বসিয়ে রেখেও রহস্যজনক কারনে তিনি কোন সাংবাদিককে বক্তব্য প্রদান করেন নি।
সবশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করার অভিযোগও উঠে। এমনকি তার প্রকাশ্য যোগ সাজসে নির্বচনের দিন ভোটগ্রহণকে বিতর্কিত করতে এবং একটি রাজনৈতিক দলের হয়ে প্রভাব বিস্তারের সুবিধা করে দিতে সেই দলের ক্যাডারদের অনুকুলে নামে বেনামে সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক কার্ড ইস্যু করা হয়। যার জন্য নির্বাচনের আগের রাতেই সিলেটে ভোটকেন্দ্র দখলের চেষ্টা শুরু হয়।
এমনকি সরকার দলের একজন বর্তমান সংসদ সদস্য নির্বাচনে ঠিক দুই দিন পূর্বে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে তার কাছে অভিযোগ দিতে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও তার দেখা পান নি। সেই সময়ে ডিসি সারওয়ার আলম নিজ বাসায় থাকলেও রহস্যজনক কারনে তৎক্ষালিন সেই সংসদ সদস্য প্রার্থীর (বর্তমান এমপি) ফোন কলও রিসিভ করেন নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নির্বাচনকালিন সময়ে ঐ দলের সদস্যদের অনুকুলে অনুমোদনবিহীন ও অজানা পরিচয়ের একাধিক গণমাধ্যমের নামেও কার্ড ইস্যু করা হয়েছে। এই তালিকায় উন্নয়নে বাংলাদেশ, ভয়েজ সেভেন নিউজ, বিএনটিভি, মুভি বাংলা টেলিভিশন, অপরাধ জগত, গণমানুষের আওয়াজ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা টিভি। এছাড়াও ইস্টার্ন ইনসাইড নামের অনলাইন পোর্টাল থেকে মোট ১৮টি কার্ড ইস্যু করা হয়েছে।
তথ্য বলছে, এই চক্রের সাথে মিলে জামায়াত ও শিবিরের ক্যাডারদের হাতে ফেইসবুক পেইজ ও ভুয়া পরিচয়ে সাংবাদিক এবং পর্যবেক্ষক কার্ড তুলে দেন সারওয়ার আলম। যার প্রমাণ নির্বাচনের আগের রাতে পাওয়া গেছে। নির্বাচনের ঠিক আগের রাতে পর্যবেক্ষক পরিচয়ে ঐ দলের ক্যাডাররা নগরীর বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র দখল ও জাল ভোট দেয়ার চেষ্টা করে ব্যার্থ হয়।
এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সর্বশেষ সিলেট সফরকালে এই আলেচিত ডিসি সারোয়ার আলম কৌশল এই ভিভিআইপি সফরটি নিয়ে কুটচাল করেন।
সূত্রমতে, সিলেটে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে আয়োজিত অনুষ্ঠানসমুহে মিডিয়া কাভারেজ করতে স্থানীয় সাংবাদিকদের পাস কার্ড সংগ্রহের জন্য বিগত ২৯ এপ্রিল দুপুরে সাংবাদিকদের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠনসমূহকে তালিকা দিতে বলেন প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা। এসএসএফ এবং জেলা প্রশাসনের যৌথ সভায় আলোচনা শেষে (কিছু শর্ত জুড়ে দিয়ে) অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে উক্ত তালিকা সমন্বয় করার দায়িত্ব দেয়া হয়।
আঞ্চলিক তথ্য অফিসের একজন কর্মকর্তা এবিষয়ের বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়ে তিনটি ক্লাববের দায়িত্বশীলদের অবহিত করেন। জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিআইডি'র সিলেট আঞ্চলিক অফিসের মাধ্যমে সাংবাদিকদের তালিকা সংগ্রহ করেন। যথারীতি ৩০ এপ্রিল পিআইডি'র কাছে তালিকাও দেওয়া হয়। কিন্তু পাস ইস্যুর দিন ১ মে সিলেট জেলা প্রেসক্লাব ও সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দ সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের বিশেষ শাখায় গিয়ে দেখতে পান, পিআইডি কর্তৃক প্রেরিত সেই তালিকা নেই, বরং জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে শুধুমাত্র নাম ও পিতার নাম দিয়ে অন্য একটি তালিকা সেখানে পাঠানো হয়েছে। এতে বিপত্তিতে পড়েন সাংবাদিক নেতারা। মহানগর পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়।
পরে একজন সাংবাদিক নেতা জেলা প্রশাসনের এডিএম পিংকি সাহার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান যে, জেলা প্রশাসক একটি খাম উনাকে দিয়েছেন, উনি সেটিই সিটিএসবিতে পাঠিয়েছেন। এর বাহিরে তিনি কিছু জানেন না ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, পিআইডি থেকে প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ কাভারেজ করার জন্য যাচাই বাঁচাই করে তিনটি প্রেসক্লাবের সঙ্গে সমন্বয় করে ৬৫ জন সংবাদিকের একটি তালিকা এডিএম এর দপ্তরে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখান থেকে রহস্যজনকভাবে ৬৩ জন সাংবাদিকের একটি ভিন্ন তালিকা সিটিএসবিতে হয়। এই তালিকার বেশীরভাগই পতিত ফ্যাসিস্ট রেজিম ও একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের অনুসারী।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, রাষ্ট্রের মূখপাত্ ও সাংবাদিকদের সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান পিআইডিকে পাস কাটিয়ে জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমানের ঘনিষ্ঠজন পরিচয়দানকারী এক ব্যাক্তির কুটচালে পড়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক এমনটি করেছেন। জনৈক এই ব্যাক্তি এর আগে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জামায়াতের আমীরের ঘনিষ্ঠজন পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার করে সিলেট সার্কিট হাউজে পিআইডি আয়োজিত সাংবাদিকদের নিয়ে একটি অনুষ্ঠান ভন্ডুল করতে চেয়েছিলেন। সব শেষ তার প্ররোচনায় তৎক্ষালীন বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা উন নবী সার্কিট হাউজে অবস্থান করলেও সরকারের সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হননি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের উদ্বোধন অনুষ্ঠান জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামীলীগের এবং জামায়াত-শিবিরের অনেক কট্টরপন্থীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু এই অনুষ্ঠানে আয়োজন উপ কমিটির অনেক সদস্যকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কাদের প্ররোচনায় ভিভিআইপিকে এই নিরাপত্তা ঝুকিতে ফেলানো হয়েছিল, এর দায় কার, আর জেলা প্রশাসকের প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠান নিয়ে এই কুটচাল থেকেই মুলত তার বিদায় ঘন্টা বেজে যায়।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি









