সিলেট-৩ সংসদীয় আসনে শেষ দিক জমে উঠেছে নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা। ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক ও ভৌগোলিক কারণে সিলেট-৩ সংসদীয় আসনটি অন্যান্য আসনের চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বিএনপির কাছে এ আসনের মর্যাদা অন্যরকম, এখানেই দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের শ্বশুরালয় অবস্থিত।
অন্যদিকে ১১ দলীয় জোটের কাছে এই আসন ধর্মীয় দিক দিয়েও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানেই শুয়ে আছেন প্রখ্যাত বুজুর্গ মরহুম হাফিজ নুর উদ্দিন গহরপুরী রহ.।
দক্ষিণ সুরমা, বালাগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা, সিটি করপোরেশনের ৪ টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই আসনে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৬ জন প্রার্থী থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে মুলত বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী এম এ মালিক ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হাফিজ মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু'র মধ্যে ।
ধানের শীষের প্রার্থী এমএ মালিক তুলনামূলকভাবে পুরোনো, আলোচিত, পরিচিত মুখ। তিনি প্রবাসে থাকলে দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় এবং তাঁর নিজস্ব একটি বলয় রয়েছে। স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মতে, তিনি মাঠের রাজনীতিতে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন। গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকেই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, জনসংযোগ ও স্থানীয় সভা-সমাবেশের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। ফলে প্রচারণা ও জনসংযোগের দিক থেকে তিনি এখন পর্যন্ত কিছুটা এগিয়ে থাকলেও দেশের জনপ্রিয় প্রতীক হাতে পেয়েও স্বস্তিতে নেই এই বহুল আলোচিত প্রার্থী। তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন তরুণ আলেম হাফেজ মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী হিসেবে ‘রিকশা’ প্রতীক নিয়ে তিনি নির্বাচনী মাঠে লড়ছেন। ১১ দলীয় জোটের পূর্ণ সমর্থন পাওয়ায় এই আসনে লড়াই দিন দিন আরও জমে উঠেছে।
শেষ মুহূর্তে ১১ দলীয় জোট থেকে মাওলানা রাজুকে প্রার্থী ঘোষণা করা হলেও শুরুতে এ জোটের মধ্যে যে দ্বিধাবিভক্তি, অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল, তা দ্রুতই কেটে যায়। কয়েক দিনের মধ্যেই জোটভুক্ত দলের নেতাকর্মীরা একযোগে রিকশার পক্ষে মাঠে কাজ করার ফলে সময় গড়ানোর সাথে সাথে ভোটের মাঠে এর ব্যাপক প্রভাব পরতে শুরু করেছে।
বিএনপির ভেতরে ভেতরে তিনটি বলয় রয়েছে। এই তিন বলয়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে এবং এখন পর্যন্ত তা চলমান রয়েছে। যদিও বিএনপির একটি সুত্র বলছে ধানের শীষের স্বার্থে সবাই এক কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন!
অন্যদিকে রিকশা প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু রাজনীতিতে তুলনামূলক নতুন হলেও তিনি সম্পূর্ণ অপরিচিত নন। তিনি গহরপুর মাদ্রাসার মুহতামিম, বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা বোর্ডের কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি ও দেশের প্রখ্যাত আলেম ও বুযুর্গ মাওলানা নুরুদ্দিন গহরপুরী (রহ.)-এর সন্তান। বাবার ধর্মীয় ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার কারণে তিনি ভোটের মাঠে একটি বাড়তি আবেগী সুবিধা পাচ্ছেন। বিশেষ করে ধর্মপ্রাণ ও মাদ্রাসাকেন্দ্রিক ভোটারদের মধ্যে। অনেক ভোটারই মনে করছেন, বাবার উত্তরাধিকার রাজুর জন্য একটি বড় রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে কাজ করছে।
নির্বাচনী মাঠে মাওলানা রাজুর শক্ত অবস্থান ধানের শীষের প্রার্থী এম এ মালিকও টের পাচ্ছেন বলে রাজনৈতিক মহলে বেশ আলোচনা উঠে এসেছে।
যদিও প্রথমদিকে মাওলানা রাজুকে থেমন একটা পাত্তা না অবজ্ঞা করে দুর্বল প্রতিপক্ষ মনে করে ধানের শীষের প্রার্থী ও সমর্থনরা শুধুই উপজেলা সদরে নামকাওয়াস্তে প্রচার প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে। কিন্তু সময় গড়ানো সাথে সাথে এই চিত্র পাল্টালতে শুরু করে।
শুরুতেই এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ছিলেন দক্ষিণ সুরমার উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা লোকমান আহমদ ও খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা দেলওয়ার হোসাইন। তারা উভয়ই দীর্ঘদিন এ আসনে প্রচুর কাজ করার কারণে জনপ্রিয়তা অর্জন এবং দলীয়ভাবে যার যার অবস্থান থেকে সুসংগঠিত শক্ত অবস্থানে ছিলেন।
পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী ব্যারিস্টার নুরুল হুদা জুনেদও প্রার্থী ছিলেন। তবে জোটগত সিদ্ধান্তে মাওলানা মুসলেহ উদ্দীন রাজু প্রার্থী হওয়ার পর সবাই একযোগে তাকে বিজয়ী করতে মাঠে নামেন। এতে ভোটের সমীকরণ দ্রুত পাল্টে যেতে শুরু করেছে।
জামায়াত ইসলামী ও খেলাফত মজলিসের নেতাকর্মীদের সক্রিয় উপস্থিতি রাজুর প্রচারণাকে আরো শক্তিশালী করেছে। কর্মীরা মাঠে সক্রিয়ভাবে কাজ করার ফলে এম এ মালিক ও তার সমর্থকদের মাথা ঘুরতে শুরু করছে!
রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় না থাকলেও ছাত্রজীবনে ছাত্র মজলিসের তুখোড় ছাত্রনেতা ছিলেন মাওলানা রাজু। পরবর্তীতে তিনি শিক্ষা ও সেবামূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। বর্তমানে তিনি সিলেটের বালাগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া ইসলামিয়া হোসাইনিয়া গহরপুরের প্রিন্সিপাল। পাশাপাশি কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকের সহ-সভাপতি ও অন্যতম নীতিনির্ধারক এবং কওমি বোর্ডগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা আল-হাইয়্যাতুল উলয়ার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রভাবশালী তরুণ আলেম হিসেবে সারাদেশেই তার পরিচিতি রয়েছে।
রাজুর বাবা প্রখ্যাত বুজুর্গ মাওলানা নুর উদ্দিন গহরপুরী ধর্মীয় ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার কারণে তিনি ভোটের মাঠে একটি বাড়তি আবেগী সুবিধা পাচ্ছেন। বিশেষ করে ধর্মপ্রাণ ও মাদরাসাকেন্দ্রিক ভোটারদের মধ্যে। অনেক ভোটারই মনে করছেন, বাবার উত্তরাধিকার রাজুর জন্য একটি বড় রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে কাজ করছে।
এই আসনে অন্যান্য প্রার্থীরা হলেন, জাতীয় পার্টির আতিকুর রহমান (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রেদওয়ানুল হক চৌধুরী রাজু (হাতপাখা) স্বতন্ত্র প্রার্থী মোস্তাকিম রাজা চৌধুরী (ফুটবল) ও মইনুল বকর (কম্পিউটার) নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও তাদের প্রচারণা দৃশ্যমান নয়, ভোটের মূল স্রোত এখনো দুই প্রধান প্রার্থীর মাঝে সীমাবদ্ধ।
ওই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ১৬ হাজার। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১১ হাজার ৭০৯ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৪ হাজার ২৮৯ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ২ জন।
সব মিলিয়ে সিলেট-৩ আসনের নির্বাচনী লড়াই এখন টানটান উত্তেজনাপূর্ণ। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও সংগঠনের শক্তিতে ধানের শীষ কিছুটা এগিয়ে থাকলেও, জোটগত রাজনীতি, ধর্মীয় আবেগ ও দেশব্যাপী পরিবর্তনের হাওয়ার সমীকরণে রিকশা প্রতীকও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষ ভোটারদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়, সেটিই নির্ধারণ করবে গুরুত্বপূর্ণ এ আসনের ভাগ্য।
আজকের সিলেট/প্রতিনিধি/এপি
আবুল কাশেম অফিক, বালাগঞ্জ থেকে 








