সিলেটে সুপারির হাহাকার: কেজিতে মূল্যবৃদ্ধি পঞ্চশত টাকা পর্যন্ত
সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ০২:০৯ AM

সিলেটে সুপারির হাহাকার: কেজিতে মূল্যবৃদ্ধি পঞ্চশত টাকা পর্যন্ত

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯/০৭/২০২৫ ০৪:৩৫:৩৯ PM

সিলেটে সুপারির হাহাকার: কেজিতে মূল্যবৃদ্ধি পঞ্চশত টাকা পর্যন্ত


সিলেটের বাজারে যেন আগুন লেগেছে সুপারিতে। এক লাফে কেজি দরে বেড়েছে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। হঠাৎ করে এমন দর বৃদ্ধিতে দিশেহারা সাধারণ মানুষ। দীর্ঘ আট মাস ধরে চলা এই অস্থিরতা যেন আর পিছু হটছে না। অথচ প্রশাসনের নজরদারি নেই বললেই চলে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন—মূলত আমদানি শুল্ক বেড়ে যাওয়ায় বিদেশি সুপারির দাম অনেক গুণে বেড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের নতুন শুল্কনীতির ছায়ায় ভর করে এ পণ্যের বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে অস্থিরতার রেশ। সিলেটের ব্যবসায়ীরা আবার সরাসরি আমদানিকারক নন, বরং তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে পণ্য কিনে আনেন। ফলে বাড়তি দামের বোঝা তাঁদের কাঁধেও।

এক সময়ের তুলনায় এবার দৃশ্যপট পুরোপুরি ভিন্ন। আগে দাম বাড়লেও তা দ্রুতই সহনীয় সীমায় ফিরে আসত। এখন সেই আশাও ফিকে।

একজন ব্যবসায়ীর কথায়—"যতদিন আমদানি কর কমবে না, ততদিন এই বাজারে স্বস্তি আসার সম্ভাবনা নেই। তার ওপর, স্থানীয়ভাবে সুপারির উৎপাদনও এবার অনেক কম। পুরো অঞ্চল এখন আমদানিকৃত পণ্যের ওপর নির্ভরশীল।"

কৃষি বিভাগ জানায়, এক বছরের ব্যবধানে সিলেটের সুপারির আবাদ কমেছে প্রায় অর্ধেকে। ২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে আবাদ হয়েছিল ২,২৩৭ হেক্টরে, উৎপাদন ছিল ২০ হাজার টনের বেশি, সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে মাত্র ১,১৮৪ হেক্টর ও উৎপাদন মাত্র ৭,৫৩৪ মেট্রিক টন।

জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব, বজ্রপাত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বহু সুপারি গাছ কেড়ে নিয়েছে। আবার অনেকেই আর আগ্রহ দেখাচ্ছেন না এই দীর্ঘমেয়াদি চাষে—কারণ ফলন পেতে সময় লাগে এক যুগেরও বেশি।

সিলেটের মানুষের জীবনধারায় পান-সুপারির বন্ধন চিরায়ত। প্রতিটি ঘরের খাবার টেবিলেই এর উপস্থিতি এক অভ্যস্ত রেওয়াজ। কিন্তু চাহিদা যতই থাকুক, স্থানীয় উৎপাদন তা পূরণে অক্ষম। জেলার জকিগঞ্জ, কানাইঘাটসহ কিছু এলাকায় অল্পস্বল্প গাছ থাকলেও তা দিয়ে বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয়।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে—থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা সুপারি এখন বিক্রি হচ্ছে ৭৫০-৮৫০ টাকায়, সিঙ্গাপুরী ছোট-মাঝারি সাইজ ৭০০-৭৫০ এবং বড় সাইজ ৮০০-৯০০ টাকায়। ইন্দোনেশিয়ান সুপারি ৬৫০-৭৫০, আর দেশীয় সুপারি পাওয়া যাচ্ছে ৬৫০-৮০০ টাকায়। খুচরা দামে প্রায় সব ধরনের সুপারি বিক্রি হচ্ছে ৯৫০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত।

আট মাস আগেও এই সব সুপারির দাম ছিল অনেকটাই কম। থাইল্যান্ডেরটি ছিল ৩৪০-৪০০ টাকা, সিঙ্গাপুরী ২৮০-৩৫০, আর দেশীয় সুপারি বিক্রি হতো ২৫০-৩৫০ টাকায়।

কাজিরবাজারের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ী আতিকুর রহমান বলেন, “এত বছর ব্যবসা করেও এমন লাগাতার দাম বৃদ্ধির দৃশ্য দেখিনি। আমদানি শুল্ক বাড়ার পর থেকেই দাম আর থামছে না। বরং প্রতিদিনই বেড়ে যাচ্ছে।”

তাঁর কথায় সুর মিলিয়ে কাজিরবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তাহমিদ রহমান নাফি বলেন, “সিলেটের ব্যবসায়ীরা কেউ নিজেরা আমদানি করেন না। সবই আসে চট্টগ্রামের আমদানিকারকদের হাত ঘুরে। ফলে প্রতি কেজিতে কয়েক ধাপ দাম বাড়ছেই।”

তিনি আরও বলেন, “প্রাকৃতিক দুর্যোগে গাছ মরছে, আর সুপারির ফলন পেতে সময় লাগে ১২-১৪ বছর। এত সময় ধরে আর কেউ অপেক্ষা করতে চায় না, এ কারণেই গাছ লাগানোর আগ্রহ কমছে, উৎপাদনও নামছে তলানিতে।”

অবশেষে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এক প্রতিনিধি জানান, সুপারির এই অস্বাভাবিক দামবৃদ্ধির বিষয়ে তাঁরা এখনো কোনো অভিযোগ পাননি। তবে দ্রুতই বাজার তদারকির পরিকল্পনা রয়েছে বলে আশ্বাস দেন তিনি।

আজকের সিলেট/জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর