সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪১ অপরাহ্ন

শিল্পবর্জ্যে বিষাক্ত সুতাং নদী, হুমকিতে কৃষি-জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্য

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৬/১০/২০২৬ ০৯:১৮:৪০ পূর্বাহ্ন

শিল্পবর্জ্যে বিষাক্ত সুতাং নদী, হুমকিতে কৃষি-জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্য


নাব্য সংকট ও শিল্পবর্জ্যের দূষণে হবিগঞ্জের সুতাং নদী অস্তিত্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে। একসময়কার প্রবহমান এই নদীর পানি এখন কালচে ও বিষাক্ত। দূষণের কারণে মাছসহ জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকিতে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিজমি, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। নদীর ওপর নির্ভরশীল কয়েক হাজার জেলেও কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানার বর্জ্য নিয়মিত নদীতে ফেলা হচ্ছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি নেই। যেসব কারখানায় ইটিপি রয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোই অতিরিক্ত খরচের কারণে নিয়মিত চালানো হয় না। ফলে শিল্পবর্জ্যের দূষণে নদীটির পরিবেশ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

শুধু জলজ প্রাণী নয়, নদীর পানি ব্যবহার করে চাষাবাদ করায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকেরাও। দূষিত পানি ব্যবহারের কারণে ফসল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি এলাকাবাসীর মধ্যে চর্মরোগসহ বিভিন্ন অসুস্থতার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মনীতি উপেক্ষা করে কারখানা পরিচালিত হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি নেই।

সুতাং বাংলাদেশ ও ভারতের একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উৎপত্তি হয়ে নদীটি হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এরপর শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার সুতাং বাজারের ওপর দিয়ে লাখাই উপজেলার মাদনা এলাকা অতিক্রম করে কিশোরগঞ্জে মেঘনার শাখা কালনী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। নদীটির দৈর্ঘ্য ৮২ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ ৩৬ মিটার।

সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও জনপ্রতিনিধিদের নজরদারির অভাবে নদীটি ক্রমেই হারিয়ে যেতে বসেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। শিল্পদূষণের পাশাপাশি পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির সময় ভারত থেকে আসা উজানের পানি এবং পলিমাটি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়েছে। এতে নদীটি নাব্যতা হারিয়েছে।

শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার অলিপুর এলাকার বাসিন্দারা জানান, সেখানে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানাগুলোর দূষিত বর্জ্য সুতাং নদীতে ফেলা হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় বর্জ্য শোধনাগার নেই। আবার যেসব প্রতিষ্ঠানে ইটিপি স্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলো নিয়মিত চালানো হয় না। সরকার ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে দেখানোর জন্য ইটিপি স্থাপন করা হলেও সেগুলো বন্ধ রেখে বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে বলে দাবি তাঁদের। অথচ শিল্পকারখানায় ইটিপি ব্যবহার বাধ্যতামূলক।

নদীটির দূষণে শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার সুরাবই, আলগাপুর ও শৈলজুড়া; হবিগঞ্জ সদর উপজেলার সাধুরবাজার, ভঙ্গুরহাটি, রাজিউড়া, ফান্দ্রাইল, সানাবই, উচাইল, বেকিটেকা, নাজিরপুর ও লুকড়া; এবং লাখাই উপজেলার করাব, বুল্লা, বেগুনাই ও বরগান্দিসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এসব এলাকায় কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় নানা সংকট তৈরি হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীর দূষণের পেছনে প্রাণ-আরএফএল ও স্কয়ার কোম্পানির একাধিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। অলিপুর এলাকায় বিশাল জায়গাজুড়ে এসব প্রতিষ্ঠানের একাধিক শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কারখানাগুলোর বর্জ্য মাটির নিচ দিয়ে স্থাপিত ছোট-বড় পাইপের মাধ্যমে শৈলজুড়া খালে ফেলা হচ্ছে। পরে ওই খালের পানি গিয়ে মিশছে সুতাং নদীতে।

কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে সুতাং নদীর পানি ব্যবহার করে হবিগঞ্জ সদর ও লাখাই উপজেলার প্রায় ২৭ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হতো। বর্তমানে নদীর পানি দূষিত হয়ে পড়ায় অনেক কৃষককে গভীর নলকূপের পানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে সেচের খরচ বেড়েছে, অনাবাদি থাকছে অনেক জমি। ফলে সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

লাখাই উপজেলার করাব গ্রামের কৃষক ছালেক মিয়া বলেন, ভাটি এলাকায় তাঁদের অবস্থান হওয়ায় বন্যার সময় সব জমি পানিতে ডুবে যায়। আগে বন্যার পানি জমির উর্বরতা বাড়াত। এখন উল্টো জমি নষ্ট হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের অবস্থান ভাটি এলাকায় হওয়ায় বন্যার সময় সব জমিতে পানি উঠে যায়। আগে বন্যার পানি উঠলে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পেত। কিন্তু এখন আর জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায় না, উল্টো জমি নষ্ট হয়ে যায়। কারণ সুতাং নদীর পানি বিভিন্ন কোম্পানির ময়লা-আবর্জনায় নষ্ট হয়ে গেছে।’

সদর উপজেলার রাজিউড়া গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর আলম জানান, আগে নদীর পানি ব্যবহার করে বোরো ধান চাষ করতেন তাঁরা। এখন দূষণের কারণে গভীর নলকূপের পানি দিয়ে সেচ দিতে হচ্ছে। এতে খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমরা আগে সুতাং নদীর পানি ব্যবহার করে বোরো ধান চাষ করতাম। কিন্তু নদীর পানি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বিকল্প হিসাবে গভীর নলকূপে দিয়ে চাষ করতে হচ্ছে। এজন্য খরচ দ্বিগুণের মতো বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ধান চাষ করে আর লাভবান হওয়া যাচ্ছে না। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে ধান চাষ করা বাদ দিয়ে দিচ্ছেন। এছাড়া নদীর পানি ব্যবহার করে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন এলাকাবাসী। চর্মরোগসহ বিভিন্ন ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা এর প্রতিবাদ করে কোনো সুফল পাননি।’

সাধুরবাজারের ব্যবসায়ী মহসিন আহমেদ বলেন, নদীর পানি এতটাই দূষিত যে, সেই পানি ধানের জমিতে দিলে চারা মরে যায়। গরু-ছাগল ও হাঁস নদীতে নামানোর পর বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।

সুতাং নদীর দূষণের মাত্রা নির্ধারণে গবেষণা চালাচ্ছেন হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। দীর্ঘদিনের শিল্পদূষণের প্রভাব বুঝতে তাঁরা নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে পানি, মাছ ও পলির নমুনা সংগ্রহ করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জলজ সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক ইফতেখার আহমেদ ফাগুন বলেন, পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণে পানি ও মাছের নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। শিল্পদূষণে নদীর পানির ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে নদীর নিম্নপ্রবাহে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।

নমুনা সংগ্রহের সময় গবেষকেরা দেখেছেন, নদীর নিম্নপ্রবাহে মাছের সংখ্যা খুবই কম। বিশেষ করে শৈলজুড়া খালের সংযোগস্থলের আশপাশের পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। ওই স্থান দিয়েই শিল্পবর্জ্য নদীতে প্রবেশ করে। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে, সেখানে কোনো মাছ বা জলজ প্রাণীর দেখা মেলেনি।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. শাকির আহম্মেদ বলেন, পানি ও মাছের নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। বর্তমানে নমুনায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি নির্ণয়ে আরও পরীক্ষা চলছে।

খোয়াই রিভার ওয়াটারকিপার তোফাজ্জল সোহেল বলেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সুতাং নদী একসময় শুধু স্মৃতির অংশ হয়ে থাকবে। নদী রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তা না হলে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা আরও সংকটের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা তাঁর।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর হবিগঞ্জের উপপরিচালক ড. মো. ইউসূফ আলী বলেন, সুতাং নদীর পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সিলেট কার্যালয়ের কর্মকর্তারা নমুনা সংগ্রহ করে তদন্ত করছেন। নির্দেশনা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জিএম সরফরাজ বলেন, বিষয়টি জেলা প্রশাসনের নজরে রয়েছে এবং কড়া নজরদারি করা হচ্ছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও জাতীয় সংসদের হুইপ জিকে গউছের নির্দেশে সম্প্রতি ঢাকা থেকে বিশেষজ্ঞদের একটি দল সরেজমিনে তদন্ত করে গেছে।

জেলা প্রশাসক জানান, বিশেষজ্ঞ দল শিগগিরই প্রতিবেদন জমা দেবে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর