পাহাড়ি মাটির ঘ্রাণে, প্রকৃতির পরম মমতায় বেড়ে ওঠে জারা। আকারে বড়, সুবাসে অনন্য, স্বাদে অতুলনীয় এই লেবুজাতীয় ফল সিলেটের মানুষের খাদ্যসংস্কৃতির এক চিরচেনা অনুষঙ্গ। স্থানীয়ভাবে শাসনী নামে পরিচিত জারা এখন শুধু সিলেটের বাজারেই নয়, ছড়িয়ে পড়ছে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। তবে সংরক্ষণ ও রপ্তানির পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকায় সম্ভাবনার পুরো দুয়ার এখনো খুলে যায়নি। সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে জারাকে বিশ্ববাজারে আরও বিস্তৃত করার স্বপ্ন দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিলেটের পাহাড়-টিলায় যখন জারা ফলে, তখন প্রকৃতির সবুজের সঙ্গে মিশে যায় তার নিজস্ব সৌন্দর্য। কোনোটি ডিম্বাকার, কোনোটি গোলগাল; একেকটি ফলের ওজন দুই কেজি ছাড়িয়ে যায়, কোনো কোনোটি হয় আড়াই থেকে তিন কেজিরও বেশি। খোসা ছড়ালেই মেলে তীব্র সুগন্ধ। স্বাদ আর সুবাসের এই মেলবন্ধনেই জারা হয়ে উঠেছে সিলেট অঞ্চলের মানুষের প্রিয় ফলগুলোর একটি।
জারার খোসা দিয়ে তৈরি হয় সালাদ ও আচার। এর শাঁসের স্বাদ ও এলাচের মতো সুবাসও ভোজনরসিকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। ফলে এই ফল শুধু খাদ্যতালিকার অংশ নয়, সিলেটের স্থানীয় ঐতিহ্য ও রসনাবিলাসেরও পরিচিত অনুষঙ্গ।
জৈন্তাপুর উপজেলার হরিপুর ও চিকনাগুল বাজারে সড়কের পাশে সাজানো জারার পসরা পথচারীদের নজর কাড়ে। সারি সারি বড় ফলের স্তূপ, সঙ্গে বিক্রেতাদের হাঁকডাক সব মিলিয়ে বাজারে তৈরি হয় আলাদা এক আবহ।
আকার ও মানভেদে প্রতিটি জারা বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত। বড় আকৃতির ফলগুলোর ওজন দেড় থেকে আড়াই কেজি। স্থানীয় ক্রেতাদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সিলেটে বেড়াতে আসা পর্যটকদেরও লক্ষ্য করেন বিক্রেতারা।
হরিপুর বাজারের পাশের জারা বিক্রেতা আব্দুস সহিদ জাগো নিউজকে বলেন, জৈন্তাপুরের কয়েকটি এলাকায় জারা চাষ হয়। চাষিরা বাগান থেকে সরাসরি ঢাকার ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানির ব্যবস্থা করেন। পাশাপাশি বাগানের কিছু ফল স্থানীয় বাজারেও বিক্রি করা হয়। এসব এলাকার বহু মানুষ লেবুজাতীয় ফল চাষের সঙ্গে যুক্ত।
একই এলাকার আরেক বিক্রেতা মাসুক মিয়া জানান, গুটি জারার ওজন দুই থেকে আড়াই কেজি পর্যন্ত হয়। মান অনুযায়ী একেকটি ফলের দাম ৩০০ থেকে এক হাজার টাকা। তবে পর্যটকেরা কিনতে এলে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়।
জৈন্তাপুরের বাজার ছাড়িয়ে জারার সুবাস পৌঁছেছে সিলেট নগরীতেও। নগরীর বিভিন্ন স্থানে আকারভেদে প্রতিটি জারা বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে এক হাজার টাকায়। তুলনামূলক ছোট ফলের দাম ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা।
নগরীর লালবাজারের লেবু বিক্রেতা আলী আহমদ বলেন, বিভিন্ন জাতের লেবুজাতীয় ফল বিক্রি করে প্রতিদিন পাঁচ থেকে আট হাজার টাকা আয় হয়। প্রবাসীরা দেশে এলে বিক্রি বেড়ে দৈনিক ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায় পৌঁছায়।
তাঁর ভাষ্য, বিদেশে এসব ফলের দাম বাংলাদেশের তুলনায় অন্তত তিন গুণ বেশি। এ কারণে দেশে বেড়াতে আসা অনেক প্রবাসী ফেরার সময় পছন্দের লেবুজাতীয় ফল কিনে নিয়ে যান।
এভাবেই সিলেটের টিলা থেকে বাজার, বাজার থেকে প্রবাসীদের স্যুটকেস বিভিন্ন পথ ধরে জারা পৌঁছে যাচ্ছে দেশের সীমানার বাইরেও।
জারার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করতে কাজ করছে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) অধীন মৌলভীবাজারের সাইট্রাস গবেষণা কেন্দ্র স্থানীয়ভাবে প্রচলিত বিভিন্ন ধরনের জারা থেকে বাছাই করে উদ্ভাবন করেছে নতুন জাত ‘বারি-১’। কয়েক বছরের গবেষণার মধ্য দিয়ে জাতটি নির্বাচন করা হয়।
অন্যদিকে জৈন্তাপুর সাইট্রাস গবেষণা কেন্দ্রও জারার বিভিন্ন ধরন নিয়ে কাজ করছে।
গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জুটন চন্দ্র সরকার জাগো নিউজকে বলেন, সিলেট অঞ্চলে মূলত কলস, পানি ও গুটি এই তিন ধরনের জারা উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে গুটি জারা সবচেয়ে বড়। কোনো কোনো ফলের ওজন আড়াই থেকে তিন কেজি পর্যন্ত হয়।
তিনি বলেন, জৈন্তাপুরের মাটি জারা চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। অন্য এলাকায় একই জাতের চারা রোপণ করলেও সমান ফলন নাও হতে পারে। এ অঞ্চলের মাটির বৈশিষ্ট্যের কারণেই এখানে জারার ভালো ফলন হয়।
জুটন চন্দ্র সরকার আরও জানান, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় চাষিরা জারার বিভিন্ন ধরনকে আকার ও আকৃতি অনুযায়ী নানা নামে চিনে আসছেন। সেসব ধরন থেকে বাছাই করেই নতুন ‘বারি-১’ জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। জাতটি উদ্ভাবনের কাজ করেছে মৌলভীবাজারের সাইট্রাস গবেষণা কেন্দ্র।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সিলেট অঞ্চলে ২৮১ হেক্টর জমিতে লেবু উৎপাদিত হয়েছে তিন হাজার ৫৫৮ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ১২৭ হেক্টর জমিতে জারা উৎপাদনের পরিমাণ ছিল এক হাজার ১৩৭ মেট্রিক টন।
পাহাড়-টিলার মাটি ও আবহাওয়া সিলেট অঞ্চলে জারাসহ বিভিন্ন লেবুজাতীয় ফল চাষের জন্য উপযোগী। জৈন্তাপুর উপজেলার হরিপুর, শ্যামপুর, বাগেরখাল, শিকারখাঁ, চিকনাগুল, উমনপুর, পানিছড়া, ঠাকুরের মাটি ও কালিনঞ্জিবাড়ি এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে জারা চাষ হচ্ছে। পাশাপাশি গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেহপুর ও বানিগ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে এই ফলের চাষ।
বর্ষাকাল থেকে শুরু করে প্রায় ছয় মাস থাকে জারার ভরা মৌসুম। এ সময় চিকনাগুল, হরিপুর ও ফতেহপুরসহ বিভিন্ন এলাকার বাজার ও সাপ্তাহিক হাটে জারার বেচাকেনা জমে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে বাগান থেকেই সরাসরি বিক্রি হয় ফল। সেখান থেকে জারা পৌঁছে যায় সিলেট নগরীর বিভিন্ন বাজারে।
জৈন্তাপুরের সাইট্রাস গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জুটন চন্দ্র সরকার বলেন, এ অঞ্চলের মাটি জারা উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত হওয়ায় বাণিজ্যিক চাষে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে।
সিলেটের জারা ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এই ফলের চাহিদা থাকলেও সংরক্ষণ ও প্যাকেজিংয়ের পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় সিলেট থেকে সরাসরি রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে ব্যবসায়ীদের।
ফলে পাহাড়ি মাটিতে উৎপাদিত সুগন্ধি এই ফলের সম্ভাবনা থাকলেও তা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। যথাযথ সংরক্ষণ, মানসম্মত প্যাকেজিং ও রপ্তানিসহায়ক অবকাঠামো গড়ে উঠলে জারার বাজার আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে এবার সিলেটে আধুনিক প্যাকিং হাউজ ও কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৮০ কোটি টাকা।
সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে বড়শলা এলাকায় প্রায় পাঁচ একর জমিতে এই অবকাঠামো নির্মাণের প্রাথমিক প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও প্যাকেজিংয়ের সুযোগ বাড়বে, যা জারাসহ সিলেট অঞ্চলের কৃষিপণ্য রপ্তান
আজকের সিলেট/ জেকেএস









