সড়কে যানবাহনের চাপ, যেখানে-সেখানে টমটম থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা, অবৈধ পার্কিং আর ফুটপাত দখল সব মিলিয়ে যানজটে নাকাল হবিগঞ্জ শহর। নিয়মিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতিতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও পয়েন্টগুলোতে দিনের বিভিন্ন সময়ে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। এতে আদালতের বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবী থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও সাধারণ পথচারী ভোগান্তিতে পড়ছেন প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।
বিশেষ করে বেবিস্ট্যান্ড, সবুজবাগ, কালিবাড়ি ও চৌধুরী বাজার এলাকায় যানজট এখন অনেকটা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
গতকাল বুধবার দুপুরে বেবিস্ট্যান্ড এলাকায় প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে যানজট দেখা দেয়। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হলে অনেকেই যানবাহন ছেড়ে হেঁটেই গন্তব্যের দিকে রওনা হন। দীর্ঘ সময় আটকে থেকে দুর্ভোগে পড়েন আদালতে আসা বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীরা। একই ভোগান্তির মুখে পড়েন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও সাধারণ পথচারীরাও।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরের সড়কের ধারণক্ষমতার তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সড়কের ওপর টমটম দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা, যত্রতত্র পার্কিং এবং ফুটপাত দখল করে দোকানপাট বসানোর প্রবণতা।
সচেতন নাগরিকদের মতে, শহরের প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে টমটমের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যানজটের মাত্রাও বেড়েছে। অনেক চালক সড়কের ওপরই টমটম থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করান। একটি যান থামার পর পেছনে থাকা অন্য যানবাহনগুলো আটকে গিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই তৈরি হয় দীর্ঘ সারি।
এদিকে অবৈধ টমটম চলাচল বন্ধে অভিযান শুরু করেছে হবিগঞ্জ পৌরসভা। গত কয়েক দিনে প্রায় ৫০টি অবৈধ টমটম আটক করে পৌরসভায় রাখা হয়েছে। তবে শহরে চলাচলকারী অবৈধ টমটমের তুলনায় এই সংখ্যা খুবই কম বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
তাদের ভাষ্য, বিচ্ছিন্নভাবে অভিযান চালিয়ে যানজটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নিয়মিত ও জোরালো অভিযান চালানোর পাশাপাশি অবৈধ টমটমের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু জরিমানা করে ছেড়ে দিলে একই টমটম আবারও সড়কে নামার সুযোগ পায়। প্রয়োজনে অবৈধ টমটম জব্দ করে রাখার ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
শহরের ফুটপাত দখলও যানজটের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ফুটপাত দখল করে বসায় পথচারীদের অনেক সময় মূল সড়কে নেমে চলতে হচ্ছে। এতে যেমন তাঁদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে, তেমনি যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচলেও তৈরি হচ্ছে বাধা।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নিয়মিত ট্রাফিক পুলিশ না থাকলে চালকেরা অনেক সময় নিজেদের মতো করে যানবাহন চালান। একাধিক দিক থেকে একসঙ্গে যানবাহন প্রবেশ করলে সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খলা। ব্যস্ত সময়ে এই পরিস্থিতি আরও প্রকট হয়ে দ্রুত দীর্ঘস্থায়ী যানজটে রূপ নেয়।
এর বাইরে শহরের নারিকেলহাটায় দিনের বেলায় ভারী যানবাহন প্রবেশ করায় ওই এলাকাতেও যানজটের মাত্রা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সচেতন নাগরিকদের মতে, হবিগঞ্জ শহরের যানজট কমাতে একক কোনো উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পৌরসভা, ট্রাফিক বিভাগ ও প্রশাসনের সমন্বিত পদক্ষেপ। অবৈধ টমটম নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ফুটপাত দখলমুক্ত করা, যত্রতত্র পার্কিং বন্ধ করা, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নিয়মিত ট্রাফিক দায়িত্ব নিশ্চিত করা এবং ব্যস্ত সময়ে বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তাঁদের মতে, যানজট এখন আর কেবল মানুষের চলাচলের ভোগান্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও প্রভাব ফেলছে। যানজটে আটকে পড়ছে জরুরি রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি। আদালতে আসা মানুষকেও দীর্ঘ সময় সড়কে আটকে থাকতে হচ্ছে।
হবিগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা, পৌরসভা, ট্রাফিক বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন সমন্বিতভাবে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করবে। অবৈধ টমটম নিয়ন্ত্রণ, ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সার্বক্ষণিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে শহরের যানজট অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি 








