কবরের ওপরই ২০ বছর ধরে আশ্রয় বৃদ্ধের
বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১৬ PM

‘একদিন তো মরতেই হবে’

কবরের ওপরই ২০ বছর ধরে আশ্রয় বৃদ্ধের

জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৭/১০/২০২৬ ১০:২৬:১২ AM

কবরের ওপরই ২০ বছর ধরে আশ্রয় বৃদ্ধের


সন্ধ্যা নামলেই যেখানে কবরস্থানের পাশ দিয়ে হাঁটতে সাহস পান না অনেকে, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর পৌর শহরের সেই কাঠ বাজার কবরস্থানই এক গৃহহীন মানুষের কাছে হয়ে উঠেছে ঘরবাড়ি। চারপাশে সারি সারি কবর, আর তার মাঝখানে প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো একটি কবরের ওপরই কেটে যাচ্ছে ৬০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির জীবনের দুই দশক।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ২০ বছর ধরে ওই কবরই তার আশ্রয়, শয্যা ও নিত্যদিনের ঠিকানা। রাত হলে অন্যদের কাছে যে জায়গা ভয়ের, সেখানেই নির্বিঘ্নে ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। বৃষ্টি-ঝড় কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়াও দীর্ঘদিনের এই ঠিকানা থেকে তাকে সরাতে পারেনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একসময় জগন্নাথপুর পৌর শহরের বিভিন্ন সড়কে রাত কাটাতেন ওই ব্যক্তি। নিরাশ্রয় জীবনে স্থায়ী কোনো আশ্রয় না পেয়ে একপর্যায়ে কাঠ বাজার কবরস্থানকে বেছে নেন তিনি। এরপর দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে প্রায় দুই দশক। কবরের ওপরই তৈরি হয়েছে তার থাকা, খাওয়া ও ঘুমানোর ব্যবস্থা।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, কবরস্থান থেকে বাইরে বের হওয়ার সময়ও ওই ব্যক্তি যথেষ্ট সতর্ক থাকেন। হঠাৎ তাকে দেখে যাতে কেউ ভয় না পান, সেদিকেও তার খেয়াল থাকে।

বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে আসার পর ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও ব্যারিস্টার মরহুম আব্দুল মতিনের ছেলে মির্জা স্বপন আহমেদ ওই কবরের ওপর টিনের ছাউনি করে দেন। এতে অন্তত রোদ-বৃষ্টির হাত থেকে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন ওই ব্যক্তি।

মির্জা স্বপন আহমেদ বলেন, ‘তিনি দীর্ঘ ২০ বছর ধরে আমার বাবা ব্যারিস্টার আব্দুল মতিনের কবরের উপরে বসবাস করছেন। মেঘ-বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা পেতে আমি কবরের ওপর টিনের ছাউনি দিয়ে দিয়েছি। তিনি সবসময় এখানেই থাকেন। দূর-দূরান্ত থেকে বহু মানুষ তাকে দেখতে আসেন। তবে তিনি সবার হাত থেকে খাবার বা উপহার নেন না। কেবল নিজের ইচ্ছে হলেই নেন।’

মরহুম আব্দুল মতিনের স্বজনদের ভাষ্য, ওই ব্যক্তি সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক। কবরস্থানের কোনো ক্ষতি তিনি করেন না। সে কারণেই তাকে সেখানে থাকতে দেওয়া হয়েছে।

জগন্নাথপুর গ্রামের আব্দুল জলিল বলেন, ‘২৫-৩০ বছর আগে মরহুম আব্দুল মতিনের বাড়ির সামনে তার কবরস্থান ও একটি তালগাছ ছিল। সেই সময় মানুষের চলাফেরা ছিল না। তখন থেকেই এই লোকটি এই জায়গায় বসবাস করে আসছে। অনেক বৃষ্টি, ঝড়-তুফানের সময়ও তিনি এখান থেকে যাননি। অনেকদিন পর আব্দুল মতিনের ছেলে মির্জা স্বপন টিন দিয়ে উপরের ছাউনি করে দেন। তার মূল বাড়ি ময়মনসিংহে।’

কবরের ওপর বসবাসের কারণ জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘একদিন তো মরতেই হবে, তখন তো এই কবরই শেষ ঠিকানা। তাই কবরে ঘুমাতে আমার আর ভয় লাগে না।’

জীবনের কাছে আশ্রয় চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু শহরের কোথাও মেলেনি স্থায়ী ঠিকানা। শেষ পর্যন্ত মৃতদের নীরব ঠিকানার পাশেই খুঁজে নিয়েছেন জীবনের আশ্রয়। প্রায় দুই দশক ধরে কবরের ওপর বসবাস যেন তার কাছে ভয় কিংবা বিস্ময়ের নয় বরং কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে মেনে নেওয়া এক অদ্ভুত সহাবস্থান।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর