শরতের আগমনী আবহে সিলেটে চলছে দেবী দুর্গার প্রতিমায় শেষ তুলির আঁচড়; মৃৎশিল্পীদের নিপুণ হাতে মৃন্ময়ী হয়ে উঠছে চিন্ময়ী। ছবি: সোহেল আহমেদ
আশ্বিনের শারদপ্রাতে প্রকৃতির বুকজুড়ে এখন উৎসবের আগমনী আবেশ। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, বাতাসে শিউলির স্নিগ্ধ সুবাস আর কাশফুলের শুভ্র দোল সবকিছুতেই যেন ধ্বনিত হচ্ছে মহামায়ার আগমনী বার্তা। সেই বার্তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সিলেট নগরীর মৃৎশিল্পীদের কর্মশালায়। মাটির শরীরে রং-তুলির নিপুণ আঁচড়ে ধীরে ধীরে রূপ পাচ্ছেন দেবী দুর্গা। শিল্পীর হাতে মৃন্ময়ী প্রতিমা যেন হয়ে উঠছে প্রাণময়ী; চোখের দৃষ্টিতে ফুটে উঠছে মায়া, মুখের রেখায় জেগে উঠছে স্নিগ্ধতা আর অলংকারের কারুকাজে প্রকাশ পাচ্ছে দেবীর মহিমা।
পূজার আর মাত্র কয়েক দিনের অপেক্ষা। এরই মধ্যে সিলেট নগর ও জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে প্রতিমা নির্মাণ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কোথাও চলছে শেষ মুহূর্তের রং করার কাজ, কোথাও প্রতিমার অলংকার পরানো হচ্ছে, আবার কোথাও মণ্ডপ সাজানোর ব্যস্ততা। শিল্পীর তুলির প্রতিটি আঁচড়ে যেন ধীরে ধীরে পূর্ণ হয়ে উঠছে দেবীর প্রতিমা। মাটির সঙ্গে রঙের মেলবন্ধনে কর্মশালাগুলো এখন হয়ে উঠেছে শিল্প, সাধনা আর উৎসবের এক অনন্য মিলনক্ষেত্র।
নগরীর লামাবাজারের শ্যামসুন্দর লেনের মৃৎশিল্পী নিকিল পালের কর্মশালায় দেখা যায়, দেবী দুর্গাসহ বিভিন্ন দেবদেবীর প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন শিল্পীরা। কারও হাতে রংতুলি, কেউ ব্যস্ত প্রতিমার শরীরে রঙের পরত বসাতে, আবার কেউ ব্যস্ত অলংকারের সূক্ষ্ম কারুকাজে। একেকটি প্রতিমার মুখাবয়ব সম্পূর্ণ করতে শিল্পীদের মনোযোগ যেন এক বিন্দুতেও বিচ্যুত হচ্ছে না। চোখের রেখা, ঠোঁটের হাসি কিংবা কপালের টিপ প্রতিটি কাজে রয়েছে নিখুঁততার ছাপ।
শিল্পীর হাতে প্রতিমার এই রূপান্তর যেন একটি দীর্ঘ সৃজনপ্রক্রিয়ার শেষ অধ্যায়। সবশেষে চোখ আঁকার মুহূর্তে যেন প্রতিমায় প্রাণের স্পন্দন অনুভব করেন শিল্পীরা।
মৃৎশিল্পী নিকিল পাল জানান, গত বছরের তুলনায় এবার প্রতিমা তৈরির কাজের পরিমাণ বেড়েছে। ফলে কর্মশালায় কাজের চাপও বেশি। তবে কাঁচামালসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতিমা তৈরির খরচও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে প্রতিমার দামেও। আগের তুলনায় এবার কিছুটা বেশি দামে প্রতিমা বিক্রি করতে হচ্ছে। তারপরও উৎসবের সময়টিতে কাজের ব্যস্ততার পাশাপাশি শিল্পীদের মধ্যে রয়েছে আনন্দ ও উৎসাহ।
প্রতিটি প্রতিমার পেছনে রয়েছে শিল্পীদের দীর্ঘ পরিশ্রম, ধৈর্য, নিষ্ঠা ও ভালোবাসা। মাটি, খড়, বাঁশ আর রঙের সমন্বয়ে তাঁরা নির্মাণ করেন দেবীর অনিন্দ্যসুন্দর প্রতিচ্ছবি। বছরের পর বছর ধরে পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া এই শিল্পকর্মকে নিজেদের দক্ষতা ও ভালোবাসায় টিকিয়ে রেখেছেন তাঁরা। তাঁদের কাছে প্রতিমা নির্মাণ কেবল জীবিকার পথ নয়; এটি ঐতিহ্য, সৃজনশীলতা ও শিল্পসাধনারও অংশ।
এবার সিলেট জেলা ও মহানগর মিলিয়ে মোট ৬৩৭টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে সিলেট জেলা পর্যায়ে রয়েছে ৪৭৪টি মণ্ডপ। এসবের মধ্যে ৪৪৮টি সর্বজনীন ও ২৬টি পারিবারিক। অন্যদিকে সিলেট মহানগর এলাকায় রয়েছে ১৬৩টি মণ্ডপ এর মধ্যে ১৪৭টি সর্বজনীন ও ১৬টি পারিবারিক।
এত বড় পরিসরের আয়োজনকে সামনে রেখে মণ্ডপগুলোতেও এখন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। কোথাও নির্মাণকাজ শেষ করা হচ্ছে, কোথাও চলছে আলোকসজ্জা, আবার কোথাও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও দর্শনার্থীদের চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে। পূজার দিনগুলোতে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে প্রতিটি মণ্ডপ প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে এমন প্রত্যাশা আয়োজকদের।
শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা সম্পন্ন করতে পূজা উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি এবং সিলেট জেলা ও মহানগর শাখার বর্ধিত সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৮টি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জেলা ও মহানগর শাখার যৌথ উদ্যোগে ১১ সদস্যের একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। পূজা কমিটিগুলোকে সার্বক্ষণিকভাবে মনিটরিং সেলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
উৎসব নির্বিঘ্ন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সিলেট জেলা ও মহানগর পুলিশের পাশাপাশি পুলিশ, আনসার, র্যাব, বিজিবি এবং স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকবেন। বিভিন্ন স্থানে সাদা পোশাকেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। পূজামণ্ডপ ও আশপাশের এলাকায় সার্বিক পরিস্থিতি নজরদারির আওতায় রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ যুব ঐক্য সিলেট জেলার সদস্য সচিব রজত কান্তি চক্রবর্তী বলেন, এবারের দুর্গাপূজাকে ঘিরে সিলেটে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। ৬৩৭টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হওয়ায় আয়োজনের পরিধিও বেড়েছে।
তিনি বলেন, মৃৎশিল্পীদের হাতের নিপুণতায় প্রতিমাগুলো এখন ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ রূপ পাচ্ছে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দুর্গাপূজা সিলেটের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সবাই যাতে উৎসব উপভোগ করতে পারেন, সে জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল থাকার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ পূজা উৎযাপন ফ্রন্ট সিলেট জেলার সদস্য সচিব এডভোকেট পলাশ চন্দ্র ধর বলেন, সিলেটে এবারের দুর্গাপূজাকে ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ রয়েছে। প্রতিমা নির্মাণ থেকে শুরু করে মণ্ডপ সাজানো সব ক্ষেত্রেই এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। ৬৩৭টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হওয়ায় দায়িত্বও বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, পূজা কমিটি ও স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
শরতের সোনালি আলোয় এখন তাই সিলেট অপেক্ষা করছে মহামায়াকে বরণ করে নেওয়ার সেই শুভক্ষণটির জন্য। কর্মশালায় শিল্পীর তুলির শেষ আঁচড়ে মাটির প্রতিমা ধীরে ধীরে পেয়ে যাচ্ছে পূর্ণতা। দেবীর চোখে ফুটে উঠছে মায়াময় দৃষ্টি, মুখে স্নিগ্ধ হাসি, অলংকারে জেগে উঠছে আভিজাত্য।
আর কয়েক দিনের মধ্যেই ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে মুখর হবে সিলেটের পূজামণ্ডপ। আলোকসজ্জায় ঝলমল করবে নগরী, ভক্ত-দর্শনার্থীদের পদচারণায় প্রাণ ফিরে পাবে মণ্ডপগুলো। আর সেই উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন মহামায়া দুর্গা যাঁকে আজ শিল্পীর রং-তুলির আঁচড়ে মাটির বুক থেকে তুলে আনা হচ্ছে পূর্ণতার আলোয়।
মৃন্ময়ী থেকে চিন্ময়ী হয়ে ওঠার সেই যাত্রার সাক্ষী এখন সিলেট। শরতের বাতাসে শিউলির সুবাস আর কাশফুলের দোলের সঙ্গে নগরজুড়ে ধ্বনিত হচ্ছে একটিই আগমনী সুর আসছেন দেবী দুর্গা।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
জনি কান্ত শর্মা 








