দেড় দশকে সিলেটের ৪৬০ টিলা উধাও, সমতল হচ্ছে চেনা ভূপ্রকৃতি
রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০১ PM

দেড় দশকে সিলেটের ৪৬০ টিলা উধাও, সমতল হচ্ছে চেনা ভূপ্রকৃতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২০/০৯/২০২৬ ০৪:০৩:৩৪ PM

দেড় দশকে সিলেটের ৪৬০ টিলা উধাও, সমতল হচ্ছে চেনা ভূপ্রকৃতি


সিলেটের পরিচিত টিলাভূমির বড় একটি অংশ এখন আর আগের অবস্থায় নেই। কোথাও টিলা কেটে তৈরি হয়েছে আবাসিক প্লট, কোথাও গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন ও বিভিন্ন স্থাপনা। সবুজে ঢাকা উঁচু-নিচু ভূমির পরিবর্তে বিস্তৃত হচ্ছে সমতল নির্মাণভূমি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে সিলেটের ছয়টি উপজেলা ও মহানগর এলাকায় থাকা ১ হাজার ২৫টি টিলার মধ্যে বর্তমানে টিকে আছে ৫৬৫টি। অর্থাৎ গত দেড় দশকে ৪৬০টি টিলা হারিয়ে গেছে।

পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, আবাসিক এলাকা ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের জন্য এখনো টিলা কাটা হচ্ছে। টিলা সংরক্ষণে আদালতের নির্দেশনা থাকলেও তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি।

সিলেট নগরের বালুচর এলাকায় টিলা হারিয়ে যাওয়ার চিত্র স্পষ্ট। একসময় এ এলাকার বড় অংশজুড়ে টিলা থাকলেও সেগুলোর অনেকটাই কেটে আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছে। নির্মিত হয়েছে বাড়িঘর ও নানা স্থাপনা। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও টিলা ও আশপাশের জমিতে গড়ে উঠেছে।

নগরের ৮ ও ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের তারাপুর এবং আলীবাহার চা-বাগানসংলগ্ন এলাকাতেও একই পরিবর্তন দেখা গেছে। একসময় টিলাপ্রধান এসব এলাকায় এখন আবাসিক এলাকার বিস্তার ঘটেছে।

শহরতলির বাইশটিলা এলাকাতেও উঁচু টিলার অনেকাংশ সমতল হয়ে গেছে। স্থানীয়ভাবে আবাসন নির্মাণের জন্য এসব টিলা কাটার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি নগরের করেরপাড়া, হাওলাদারপাড়া, দুসকি ও মোহাম্মদী আবাসিক এলাকায় টিলা কাটার চিত্র দেখা যায়। করেরপাড়ায় একটি বড় টিলার এক পাশ কেটে আবাসিক প্লট তৈরি করা হয়েছে। একই টিলার অন্য অংশেও কাটার চিহ্ন রয়েছে। স্থানীয়ভাবে একটি সংগঠনের নামে সেখানে টিলা কাটার কাজ চলছে বলে জানা গেছে।

আলীবাহার চা-বাগান ও মোহাম্মদী আবাসিক এলাকার মাঝামাঝি সড়কের পাশে টিনের বেড়া দেওয়া একটি জায়গায় টিলা কাটার চিহ্ন পাওয়া যায়। ওই স্থান থেকে কিছু দূরেই টিলা কাটার শাস্তির কথা উল্লেখ করে পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি সাইনবোর্ড রয়েছে।

এ ছাড়া কাছাকাছি একটি বাড়ির পেছনে থাকা বড় টিলারও উল্লেখযোগ্য অংশ কেটে ফেলা হয়েছে। এতে একসময়কার উঁচু ভূমিটি প্রায় সমতলে পরিণত হয়েছে।

পরিবেশবাদীদের ভাষ্য, নগরের বাইরেও সিলেট সদর, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, ফেঞ্চুগঞ্জ ও দক্ষিণ সুরমার বিভিন্ন এলাকায় টিলার পরিমাণ কমছে।

টিলা সংরক্ষণ ও কর্তন বন্ধের দাবিতে বেলার করা রিটের পর প্রশাসনের দেওয়া তথ্যেও সিলেটের টিলা কমে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।

প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট সদর ও মহানগর এলাকায় ১৯৯টি, গোয়াইনঘাটে ৪৪টি, কোম্পানীগঞ্জে ১টি, গোলাপগঞ্জে ৪১৩টি এবং জৈন্তাপুরে ৯৮টি টিলা ছিল। কানাইঘাটে টিলার পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৬৬০ দশমিক ৬২ একর এবং ফেঞ্চুগঞ্জে ২৫১ দশমিক ৮ একর।

দক্ষিণ সুরমায় বেশ কয়েকটি টিলা থাকার কথা উল্লেখ করা হলেও প্রশাসনের প্রতিবেদনে সেগুলোর সংখ্যা দেওয়া হয়নি।

বেলার তথ্য বলছে, আদালতের মামলায় অন্তর্ভুক্ত ছয়টি উপজেলা ও সিলেট মহানগর এলাকায় ২০০৯ সালে মোট ১ হাজার ২৫টি টিলা ছিল। বর্তমানে অবশিষ্ট রয়েছে ৫৬৫টি। সে হিসাবে দেড় দশকে ৪৬০টি টিলা বিলীন হয়েছে।

টিলা কাটা বন্ধ এবং অবশিষ্ট টিলা সংরক্ষণের দাবিতে বেলা ২০১১ সালে হাইকোর্টে রিট করে। মামলাটির নম্বর ৯৭৫০/২০১১।

বেলার সিলেট সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহ সাহেদা আক্তার বলেন, ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ১ মার্চ হাইকোর্ট টিলা কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ এবং টিলা সংরক্ষণের নির্দেশ দেন।

আদালতের নির্দেশনায় টিলার জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়।

তবে শাহ সাহেদা আক্তারের অভিযোগ, আদালতের নির্দেশনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। এ কারণে টিলা কাটা বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, বর্তমানে সিলেটে যেসব টিলা টিকে আছে, সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা জরুরি। মামলাভুক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ টিলাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে সাইনবোর্ড স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি যেসব টিলা কাটা হয়েছে, সেসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

একসময় সিলেটের প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতির অংশ ছিল যেসব টিলা, সেগুলোর অনেক জায়গায় এখন বাড়িঘর ও স্থাপনা গড়ে উঠেছে। কোনো টিলা পুরোপুরি কেটে ফেলা হয়েছে, আবার কোনোটি আংশিক কেটে রেখে দেওয়া হয়েছে।

২০০৯ সালের ১ হাজার ২৫টি টিলা থেকে দেড় দশকে সংখ্যাটি ৫৬৫টিতে নেমে আসার হিসাব শুধু টিলা কমে যাওয়ার পরিসংখ্যান নয়। এটি সিলেটের পরিচিত সবুজ ভূদৃশ্য কীভাবে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে, তারও একটি চিত্র।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর