সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে ধীরে ধীরে বিস্তার ঘটছে সাকার মাছের। দেশের গুরুত্বপূর্ণ মিঠাপানির মাছের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত টাঙ্গুয়ার হাওরেও একাধিকবার এই মাছ ধরা পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি হিসেবে রামসার সাইটের স্বীকৃতি পাওয়া এই হাওরে সাকার মাছের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন হাওর ব্যবস্থাপনায় যুক্ত উন্নয়ন সংগঠন সিএনআরএস।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সাকার মাছের বিস্তার বাড়লে শুধু দেশি মাছ নয়, হাওরের জলজ উদ্ভিদ, কীটপতঙ্গ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতার কারণে মাছটি দ্রুত বংশবিস্তার করলে দেশি মাছের আবাসস্থল ও খাদ্যশৃঙ্খলেও পরিবর্তন আসার আশঙ্কা রয়েছে।
গত ১১ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউসে পরিবেশ অধিদপ্তরের ‘টাঙ্গুয়ার হাওরের জলাভূমিতে বাস্তুতন্ত্রের সমাজভিত্তিক ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পের আওতায় ‘জলাভূমি সম্পদের সঠিক ব্যবহার’ বিষয়ে আয়োজিত মতবিনিময়সভায় বিষয়টি সামনে আসে। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ সচিব ড. ফাহমিদা খানম। সেখানে হাওর ব্যবস্থাপনায় যুক্ত সিএনআরএসের পক্ষ থেকে টাঙ্গুয়ার হাওরে সাকার মাছের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়।
এর আগে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওর ও জলাশয়ে জেলেদের জালে এই মাছ ধরা পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। গত ১১ জুলাই দিরাই উপজেলার করিমপুর ইউনিয়নের উত্তরচান্দপুর গ্রামের চাপতির হাওরে মাছ ধরার সময় এক জেলের জালে একটি সাকার মাছ ধরা পড়ে। কালো রঙের মাছটির শরীরে তিনটি কাঁটা ছিল। মাছটি দেখতে স্থানীয় লোকজন সেখানে জড়ো হন। পরে তাঁরা জানতে পারেন, এটি সাকার মাছ।
এর পাঁচ দিন পর, ১৬ জুলাই ছাতকের হলদিউড়া গ্রামের জেলে শরিফ উদ্দিনের শক্ত সুতার জালেও একটি সাকার মাছ ধরা পড়ে। এরপর এক সপ্তাহের ব্যবধানে তিনি আরও দুটি মাছ ধরেন।
সুনামগঞ্জে সাকার মাছ ধরা পড়ার ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর জেলার অন্যতম বড় হাওর দেখার হাওরের বড়দই বিলের কাছে বারোঘর জলাশয়ে মৎস্যজীবী খাইরুল ইসলাম ও আব্দুস সোবহানের জালে একটি সাকার মাছ ধরা পড়ে। পরে মাছটি পাগলাবাজারে এনে প্রদর্শন করা হয়। তখন তাঁরা জানতে পারেন, এটি রাক্ষুসে সাকার মাছ এবং দেশি মাছের জন্য ক্ষতিকর।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, সুনামগঞ্জের আরও বিভিন্ন হাওর ও জলাশয়ে মাঝেমধ্যে জেলেদের জালে সাকার মাছ ধরা পড়ছে। তবে সব ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না। অনেক জেলে মাছটির পরিচয় না জানায় কিংবা আতঙ্কিত হয়ে সেটিকে আবার পানিতে ছেড়ে দেন। ফলে সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে মাছটির প্রকৃত বিস্তার কতটা, তা এখনো নির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি।
দেখার হাওরের জেলে খাইরুল আলম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে হাওরে মাছ ধরে জীবিকা চালালেও আগে তিনি এমন মাছ দেখেননি। মাছটি ধরার পর কয়েক ঘণ্টা শুকনো জায়গায় রাখলেও সেটির মধ্যে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি; নড়াচড়াও স্বাভাবিক ছিল।
খাইরুল আলম বলেন, ‘এটা দানব মাছ। আমার মনে হয়, আমাদের হাওরের জন্য এটি একসময় বড় ক্ষতির কারণ হবে।’
মাছ নিয়ে গবেষণা করা বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যাকুয়ারিয়ামের জন্য বিদেশ থেকে আনা সাকার মাছ কোনোভাবে প্রাকৃতিক জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে। পরে দেশের নদী, খাল, বিল ও হাওরেও এর উপস্থিতি দেখা যায়। মাছটি দেশি মাছের পোনা ও ডিম খাওয়ার পাশাপাশি দেশি মাছের খাবার এবং জলজ উদ্ভিদও খেতে পারে। ফলে এর বিস্তার বাড়লে জলজ প্রতিবেশের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্যবিষয়ক গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, শুধু সাকার মাছ নয়, সব ধরনের আগ্রাসী ও এলিয়েন প্রজাতিই বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।
তিনি বলেন, আশির দশকে অ্যাকুয়ারিয়ামের ময়লা পরিষ্কারের কাজে ব্যবহারের জন্য ব্রাজিল থেকে সাকার মাছ আনা হয়। পরে অ্যাকুয়ারিয়াম থেকে বুড়িগঙ্গা হয়ে দেশের বিভিন্ন নদী, বিল ও হাওরে এ মাছ ছড়িয়ে পড়ে।
পাভেল পার্থের ভাষ্য, ২০২৩ সালে সাকার মাছ নিষিদ্ধ করা হলেও এ বিষয়ে সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে মনিটরিং করছে না। টাঙ্গুয়ার হাওরের মতো রামসার এলাকায় এই মাছের অস্তিত্ব পাওয়া হাওরের জন্য বিপদবার্তা।
তাঁর মতে, দ্রুত আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করে বিষয়টি তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। দেশি মাছের শেষ আশ্রয়স্থল হাওর ও বিলে সাকার মাছ ছড়িয়ে পড়লে প্রাণবৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাব প্রতিবেশ, মানুষের জীবন-জীবিকা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ওপরও পড়তে পারে।
পাভেল পার্থ আরও বলেন, আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য সনদ (সিবিডি) স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে এবং সংবিধানে দেওয়া অঙ্গীকার অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রাকৃতিক জলাভূমিকে দ্রুত সাকারমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবুল মনসুর বলেন, সাকার মাছ বিপজ্জনক প্রজাতি। প্রতিকূল পরিবেশেও এটি বেঁচে থাকতে পারে এবং বছরে তিনবার পর্যন্ত বংশবিস্তার করতে পারে।
তিনি বলেন, হাওরে এখন ঘন ঘন সাকার মাছ পাওয়া যাচ্ছে। তাই সাকারমুক্ত রাখতে এখনই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। জাল দিয়ে মাছটি তুলে মাটিতে পুঁতে ফেলার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে তাঁরা মাছটি ধরার পর আবার পানিতে ছেড়ে না দেন।
সংশ্লিষ্ট মৎস্যজীবী, পরিবেশকর্মী ও হাওর আন্দোলনের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বিভিন্ন জলাশয়ে ঘন ঘন সাকার মাছ ধরা পড়লেও এর বিস্তার ও বংশবিস্তার ঠেকাতে মৎস্য বিভাগ বা পরিবেশ বিভাগের দৃশ্যমান কোনো সমন্বিত কার্যক্রম নেই। মাছটির ক্ষতিকর দিক সম্পর্কেও হাওরবাসীর বড় একটি অংশ জানেন না।
তাঁদের আশঙ্কা, সাকার মাছের বংশবিস্তার বাড়লে হাওরের দেশি মাছের পাশাপাশি জলজ উদ্ভিদ, কীটপতঙ্গ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে একপর্যায়ে হাওরের জলজ প্রতিবেশের ভারসাম্যও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সুনামগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শরিফুল হক আকন্দ বলেন, ‘আমরা প্রায়ই খবর পাচ্ছি হাওরে সাকার মাছ ধরা পড়ছে। আমরা এ বিষয়ে জেলেদের মাছটির ভয়াবহতা সম্পর্কে অবগত করছি। তবে এই মাছের বংশবিস্তার প্রতিরোধে এখনই সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
আজকের সিলেট/ জেকেএস
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি 








