সংস্কারের অভাবে ধ্বংসের পথে ছাতকের ১৭৬ বছরের ‘সাহেব মিনার’
সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬, ০১:৫৩ PM

সংস্কারের অভাবে ধ্বংসের পথে ছাতকের ১৭৬ বছরের ‘সাহেব মিনার’

ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৩১/০৮/২০২৬ ০৯:১৪:১৮ AM

সংস্কারের অভাবে ধ্বংসের পথে ছাতকের ১৭৬ বছরের ‘সাহেব মিনার’


সুনামগঞ্জের ছাতকে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ১৭৬ বছরের পুরোনো ‘সাহেব মিনার’ এখন নিজেই অস্তিত্বের সংকটে। দীর্ঘদিনের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্থাপনাটিতে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। একদিকে হেলে পড়া মিনারের পলেস্তারা ও নির্মাণসামগ্রী খসে পড়ছে। এর সঙ্গে টিলার বিভিন্ন অংশ কেটে বসতি নির্মাণ করায় কমে যাচ্ছে পাহাড়টির আয়তন। ফলে স্থাপনাটির পাশাপাশি এর চারপাশে বসবাসকারী পরিবারগুলোও রয়েছেন ঝুঁকিতে।

ছাতক পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাগবাড়ী এলাকায় প্রায় দুই একর ৬০ শতক খাস খতিয়ানভুক্ত জমির ওপর অবস্থিত প্রায় ২০০ ফুট উঁচু ইংলিশ টিলা। এর চূড়ায় রয়েছে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ ফুট উচ্চতার পাকা স্মৃতিস্তম্ভটি। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি ‘সাহেব মিনার’ নামে পরিচিত।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, সংস্কারের অভাবে স্থাপনাটির বিভিন্ন স্থানে বড় ফাটল তৈরি হয়েছে। বেশ কিছু জায়গা থেকে পলেস্তারা ও নির্মাণসামগ্রী খসে পড়েছে। পুরো স্মৃতিস্তম্ভটি একদিকে হেলে রয়েছে। একই সময়ে টিলার বিভিন্ন অংশ কেটে ঘরবাড়ি নির্মাণ করায় পাহাড়টির স্বাভাবিক আকৃতিও পরিবর্তিত হয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, টিলার তিন পাশে বর্তমানে প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি পরিবারের বসবাস। বিভিন্ন সময়ে টিলার মাটি কেটে সেখানে এসব বসতবাড়ি তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে কিছু অংশে ধসও দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বর্ষায় ভারী বৃষ্টিপাত হলে টিলা ধসে পড়ার আশঙ্কায় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়।

বাগবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা মনির উদ্দিন বলেন, ‘দেড় শ বছরের বেশি পুরোনো এই স্থাপনাটি অনেক দিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ। মাঝখানে বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। একদিকে হেলে আছে। যেকোনো সময় ধসে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।’

আরেক বাসিন্দা খায়ের উদ্দীন বলেন, ‘টিলার আশপাশে বিভিন্ন সময়ে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। টিলা কাটার কারণে এর কিছু অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এখানে যারা বসবাস করছেন, তাঁরাও আতঙ্কে থাকেন।’

বাসিন্দাদের আশঙ্কা, ভারী বৃষ্টি অথবা ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে হেলে থাকা স্মৃতিস্তম্ভটি ভেঙে পড়লে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। গত এক বছরে একাধিকবার ছাতক উপজেলা ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় তাঁদের এই উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে।

স্থানীয় ইতিহাসবিদদের তথ্য বলছে, ১৭৯৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমন্ত্রণে ইংল্যান্ড থেকে ছাতকে আসেন ব্রিটিশ ব্যবসায়ী জর্জ ইংলিশ। তাঁর হাত ধরে এ অঞ্চলে চুন ও চুনাপাথরের ব্যবসা বিস্তৃত হয়। পরবর্তী সময়ে ওই ব্যবসাকে ঘিরেই ছাতক গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল হিসেবে বিকশিত হয়।

কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় ছাতকে কাটানোর পর ৭৬ বছর বয়সে ১৮৫০ সালে এখানেই মারা যান জর্জ ইংলিশ। তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য স্ত্রী হেসরি তাঁকে ওই টিলায় সমাহিত করেন। একই বছর সমাধির পাশে চারকোণা আকৃতির একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। পরে হেসরি ইংল্যান্ডে ফিরে গেলে জায়গাটি সরকারি খাস জমির অন্তর্ভুক্ত হয়। একসময় টিলাটি ‘ইংলিশ টিলা’ নামে পরিচিতি পায়।

ছাতকের শিল্পায়নের গোড়ার ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই স্থাপনাটি তাই স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। কিন্তু দীর্ঘদিন সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ না থাকায় ঐতিহাসিক সেই স্মারক এখন ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহি উদ্দীন বলেন, ‘ছাতকের ১৭৬ বছরের পুরোনো ইংলিশ টিলা আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। এটি কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর