কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা নিয়ে সিলেটে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মাদক সেবন, ছিনতাই, চুরি, মারামারি ও নারীদের হয়রানির পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে তারা। সম্প্রতি নগরীতে কিশোরদের ছুরিকাঘাতে রিফাত আহমদ (১৫) নিহত হওয়ার পর কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে আলোচনাও আরও জোরালো হয়েছে।
গত ২৭ জুলাই রাতে ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধের জেরে নগরীর কাজিরবাজার সেতুর ওপর একদল কিশোরের ছুরিকাঘাতে নিহত হয় রিফাত। রাত ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। রিফাত নগরীর খাসদবির দারুস সালাম বন্ধন জি-৩ বাসার মিফতাহ উদ্দিনের ছেলে। সে স্থানীয় দ্বীপ শিখা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র ছিল।
পুলিশ সদরদপ্তরের সাম্প্রতিক এক তালিকা অনুযায়ী, রাজধানীর বাইরে দেশের বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় বর্তমানে ২২৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্রুপে সদস্য সংখ্যা ২ হাজার ৫৫০। এর মধ্যে সিলেটে সক্রিয় কিশোর গ্যাং রয়েছে ১৫টি।
তালিকায় দেখা যায়, চট্টগ্রাম মহানগরে কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ৯৮টি। খুলনা মহানগরে ৭টি, রাজশাহীতে ১৩টি, সিলেটে ১৫টি এবং গাজীপুর মহানগরে ১৩টি গ্রুপ সক্রিয়। বিভিন্ন জেলা শহরেও রয়েছে একাধিক গ্রুপ। জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে নোয়াখালীতে, ২৫টি। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে রয়েছে ১৫৯টি কিশোর গ্যাং।
সিলেটে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বন্ধে কঠোর নির্দেশনার কথা জানিয়েছেন সিলেট-১ আসনের এমপি ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। শনিবার দুপুরে সিলেট পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে নবাগত পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বর্তমানে কেমন, শুধু সেটি দেখার বিষয় নয়; ভবিষ্যতে সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন দেখতে চাই সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, সিলেটে কোনো মাদকের আনাগোনা, অনলাইন জুয়া কিংবা কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা দেখতে চান না।
এর আগে গত ৮ মার্চ সিলেট জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সিলেট-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং প্রবাসীকল্যাণ, বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ছিনতাই প্রতিরোধ ও কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কেউ তদবির করলেও তাদের আটক করতে হবে।
পুলিশ সদরদপ্তরের প্রকাশিত তালিকার বিষয়ে বুধবার সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (গণমাধ্যম) মো. মনজুরুল আলমের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
পুলিশ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাং তৈরির পেছনে একাধিক পারিবারিক ও সামাজিক কারণ রয়েছে। অভিভাবকদের উদাসীনতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার, মূল্যবোধের ঘাটতি, অসৎ সঙ্গ, নিজেকে জাহির করার প্রবণতা, সুস্থ বিনোদনের সুযোগের অভাব এবং মানসিক হতাশা এর অন্যতম কারণ।
এ সমস্যা মোকাবিলায় শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পুলিশ কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের মাধ্যমে সমস্যাটির মূল কারণ মোকাবিলার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা চাঁদাবাজি ও মাদকসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের মধ্যে এক ধরনের ‘হিরোইজম’ দেখানোর প্রবণতা রয়েছে। পাশাপাশি আর্থিক সংশ্লিষ্টতার কারণে তারা সহজেই সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেড়েছিল। বর্তমানে অভিযান চালিয়ে অনেককে আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং মামলা হয়েছে। পুলিশের কার্যক্রমের কারণে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলেও জানান তিনি।
খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিকভাবে কেউ যেন কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করতে না পারে এবং তাদের কোনো ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা না করা হয়, সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কিশোরদের বিপথগামিতা ঠেকাতে বর্তমান সরকার খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সদরদপ্তর থেকেও মাঠপর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আজকের সিলেট/ জেকেএস









