অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরা হলো না পেহেলী ভৈরবীর
সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ০১:০১ PM

অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরা হলো না পেহেলী ভৈরবীর

ওসমানীনগর প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৭/০৮/২০২৬ ০৮:১৮:৪০ PM

অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরা হলো না পেহেলী ভৈরবীর


মাত্র ১৭ বছর বয়সেই বাউল গানের আসরে নিজের কণ্ঠের জাদুতে মানুষকে মুগ্ধ করেছিলেন পেহেলী ভৈরবী। মাজারে মাজারে, উরসের আসরে গান গেয়ে মানুষের হৃদয়ে আনন্দ ছড়িয়ে বেড়ানো এই তরুণ শিল্পীর জীবনের শেষ রাতটিও কেটেছিল গানের আসরেই। তবে কে জানত, সেই আসর থেকে ঘরে ফেরার পথটিই তাঁর জীবনের শেষ পথ হয়ে উঠবে!

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) রাতে সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার রামপাশা এলাকার বৈরাগী বাজারে হযরত ছাবাল শাহ্ (রহ.)-এর মাজারের অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন পেহেলী ভৈরবী। রাতভর মানুষের ভালোবাসা আর গানের সুরে মুখর সেই আসর শেষে শুক্রবার সকালে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন তিনি। কিন্তু আর ফেরা হলো না প্রিয় ঘরে।

সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগর অংশে ইউনিক পরিবহন ও বেঙ্গল স্লিপার কোচের ভয়াবহ সংঘর্ষে গুরুতর আহত হন পেহেলী। পরে তাঁকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। যে কণ্ঠ কিছুক্ষণ আগেও মানুষের হৃদয়ে সুর তুলেছিল, সেই কণ্ঠই চিরতরে নীরব হয়ে গেল।

দুর্ঘটনার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) নিজের ফেসবুকে জীবনের শেষ স্ট্যাটাসটি দিয়েছিলেন পেহেলী ভৈরবী। সেখানে লিখেছিলেন, আসসালামু ওয়ালাইকুম...! সবাই কেমন আছেন আজকে ০৬/০৮/২০২৬ ইং পোগ্রাম এ যাবো বিশ্বনাথ নদার রামপাশা, বৈরাগি বাজার। হযরত ছাবাল শাহ মাজারে। আশে পাশে যারা আছেন আজকে দাওয়াত রইলো, ধন্যবাদ। কত অদ্ভুত নিয়তি! মানুষকে শেষবারের মতো আসরে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে লেখা সেই পোস্টটিই হয়ে রইল তাঁর জীবনের শেষ পোস্ট।

পুলিশি তথ্য অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানার চন্ডিবের এলাকার বাবুল মিয়ার মেয়ে পেহেলী ভৈরবী এই দুর্ঘটনায় নিহত অন্তত ৯ জনের একজন।

তাঁর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে এসেছে বাউল ও লোকসংগীত অঙ্গনে। সহশিল্পী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কণ্ঠে এখন আর গানের সুর নেই, আছে শুধু হারানোর বেদনা।

শিল্পী মুন ফেসবুকে লিখেছেন, জীবন সত্যিই কতটা অনিশ্চিত। বাউলশিল্পী পেহেলী ভৈরবী আর আমাদের মাঝে নেই এই সংবাদটি মেনে নেওয়া সত্যিই অত্যন্ত কষ্টকর।

তিনি জানান, গত রাতে সিলেটের বৈরাগী বাজারে হযরত ছাবাল শাহ বাবার মাজারের অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করে শুক্রবার সকালে বাড়ি ফেরার পথেই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান পেহেলী। শিল্পীদের জীবনের অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, গান ও অনুষ্ঠানের জন্য শিল্পীরা প্রতিনিয়ত দূর-দূরান্তে ছুটে বেড়ান। রাত-দিন, ক্লান্তি কিংবা ঝুঁকি ভুলে মানুষের ভালোবাসার জন্য গান করে যান। অথচ কোন পথচলাটি যে জীবনের শেষ পথচলা হয়ে যাবে, তা কেউ জানে না।

অন্যদিকে শিল্পী এসকে সুমন লিখেছেন, হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে চমকে গেলাম পেহেলী ভৈরবী দুনিয়াতে আর নাই, না ফেরার দেশে চলে গেলেন। আপনারা সবাই ওর জন্য আশীর্বাদ করবেন। মাত্র ১৭ বছরের ছোট্ট জীবনে পেহেলী ভৈরবী হয়তো খুব বেশি দূর যেতে পারেননি। কিন্তু তাঁর কণ্ঠে যে সুর ছিল, যে স্বপ্ন ছিল, যে গান দিয়ে তিনি মানুষের মুখে হাসি ফোটাতেন সেসব স্মৃতি এখন বেঁচে থাকবে তাঁর গানপ্রেমী মানুষদের হৃদয়ে। শেষ রাতে তিনি গেয়েছিলেন মানুষের জন্য। আর ভোরের পথে নেমে গিয়েছিলেন নীরবতার দেশে। একটি আসর শেষ হয়েছিল, কিন্তু সেদিন শেষ হয়ে গেল একটি তরুণ কণ্ঠের পৃথিবী। পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তা পেহেলী ভৈরবীর আত্মার শান্তি দান করুন। তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার, স্বজন, সহশিল্পী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি রইল গভীর সমবেদনা।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর