ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে গত ১১ এপ্রিল দুপুরে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় ‘মব’ সহিংসতার শিকার হয়ে প্রাণ হারান শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর নামের একজন পীর। উত্তেজিত জনতা তাকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করে।
পাশাপাশি তার আস্তানায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। প্রাথমিক পর্যায়ে নিহত ব্যক্তির পরিবার মামলা করতে রাজি না হলেও, ঘটনার দুদিন পর ১৩ এপ্রিল তার বড় ভাই ফজলুর রহমান বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন।
নদুপুরে লোক জড়ো করে পরিকল্পনা করে পিটিয়ে মেরে ফেলার মতো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও সরকারের তরফ থেকে সক্রিয়তা দেখা যায়নি। প্রথমে এই ঘটনায় মামলাই করা হয়নি। মামলা না হওয়ার সংবাদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এরপর মামলা হয়েছে।
কুষ্টিয়ার এই ঘটনায় মামলা হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এমন ভয়াবহ ঘটনার পর ভুক্তভোগীরা মামলা করতে ভয় পান। অন্যদিকে, মবের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিকল্পিতভাবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ফেসবুক কিংবা মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে মানুষ জড়ো করে হামলা চালানো হয়। দিন শেষে মূল পরিকল্পনাকারীরা ‘তৌহিদি জনতা’ বা এমন বিভিন্ন নামের ব্যানার ব্যবহারকারী ‘মব’–এর আড়ালে নিজেদের চেহারা লুকিয়ে ফেলে।
ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয় অর্জন করে সরকার গঠন করে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। সরকার গঠনের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান সালাহউদ্দিন আহমদ। মন্ত্রিসভার শপথ ও আনুষ্ঠানিকতা শেষে সচিবালয়ে প্রথম দিন প্রবেশ করেই তিনি যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন, সেটি ছিল ‘মব কালচার’।
উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এই দেশে আর ‘মব কালচার’ থাকবে না, এটি ভুলে যান। একইসঙ্গে তিনি এ ধরনের বিশৃঙ্খল ও আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
তবে মন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ‘মব কালচার’ শেষ তো হয়ইনি, বরং দেখা গেছে গত মার্চ মাসের তুলনায় এপ্রিল মাসে তা বেড়েছে। এই বেড়ে যাওয়ার প্রবণতার হিসাব দিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। ৩০ এপ্রিল দেওয়া এপ্রিল মাসের মানবাধিকার প্রতিবেদনে এ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এমএসএফ প্রতি মাসে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রতিবেদন দেয়। বিভিন্ন সংবাদপত্র এবং নিজেদের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।
এপ্রিল মাসে মব বা গণপিটুনিতে ২১ জন নিহত হয়েছেন বলে এমএসএফের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত মার্চ মাসে মবে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ১৯। এ মাসে মবের ঘটনা ঘটেছে ৪৯টি। আর মার্চে এই সংখ্যা ছিল ৩৬। মবে আহত ব্যক্তির সংখ্যাও এপ্রিলে বেশি, ৪৯ জন। আগের মাসে ছিল ৩১ জন।
এমএসএফের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট মো. সাইদুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে বর্তমান সরকারের আমলে মব সহিংসতা কমেছে। তবে তা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। একটি প্রাণহানিও কাম্য নয়।
অন্যদিকে, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত মব বা গণপিটুনিতে ৬১ জন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ঢাকায় ২০ জন, চট্টগ্রাম ১৪ জন, খুলনায় আটজন, রাজশাহীতে পাঁচজন, বরিশালে পাঁচজন, ময়মনসিংহে পাঁচজন এবং রংপুরে চারজন মারা গেছেন।
এ বিষয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর আবু আহমেদ ফয়জুল কবির জানান, মে মাসে এ পর্যন্ত ছয়জন মব বা গণপিটুনিতে মারা গেছেন।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্যমতে, গত এপ্রিলে ৪৪টি মব সহিংসতার ঘটনায় ২২ জন নিহত এবং ৩৯ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত এই তিন মাসে ৮৮টি মব সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়ছেন ৪৯ জন এবং আহত হয়েছেন ৮০ জন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে ‘মব কালচার’ এদেশে ব্যাপকভাবে পরিচিতি পায়। এ সময় বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে মব লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে এদেশের মাজারগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে গত ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশের ৬৫টি স্থানে মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে ৬৭টি। তবে সুফি সমাজকেন্দ্রিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘মাকাম’-এর তথ্য অনুযায়ী, সেটা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। তারা বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৭ মাসে সারা দেশে ৯৭টি মাজারে হামলা হয়েছে। এসব হামলায় ৩ জন নিহত ও ৪৬৮ জন আহত হয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তা বলেন, এ বছরে মাজারে হামলার পরিসংখ্যান তৈরির কাজ চলছে। খুব দ্রুতই যাচাই-বাছাই করে এই সংখ্যা প্রকাশ করা হবে। তবে এ পর্যন্ত ১০টির কম মাজারে হামলার ঘটনা আমরা পেয়েছি।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের চেয়ে মাজারে হামলার সংখ্যা কমলেও বর্তমান সরকার পূর্ববর্তী সরকারের মতোই উদাসীন ভূমিকা পালন করছে।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
আজকের সিলেট ডেস্ক 








