অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে সবকিছু খুইয়ে দিশেহারা রফিক (ছদ্মনাম) মিয়া। পেশায় তিনি একজন প্রকৌশলী। সিলেটের একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে মেকানিক্যাল বিভাগে সহকারী প্রকৌশলী পদে চাকুরি করতেন। পরিবারে বাবা, স্ত্রী আর এক কন্যা সন্তান। সুখেই কাটছিল। হঠাৎ করে পরিবর্তন দেখা দেয় রফিকের। জড়িয়ে পড়েন অনলাইন জুয়া খেলায়। অর্থলোভে পড়ে স্মার্টফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করে অনলাইন জুয়া খেলার সাইট বেট ৩৬৫ এর ফাঁদে পা দেন।
রফিকের পরিবারে সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জুয়া খেলার কারণে অর্থাভাবে পড়েন তিনি। এরপর শুরু হয় পরিচিতজনদের কাছ থেকে ধার দেনা করা। এক পর্যায়ে অফিস থেকে সহকর্মীদের কাছ থেকে শুরু করে চায়ের দোকানি কেউ বাকি নেই, নিজে অধীনস্থ প্রায় সবার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছেন তিনি। অফিস থেকে অগ্রিম বেতনও তোলেন। তারপরও অর্থাভাব শেষ না হলে স্ত্রীকে শারীরিক মানসিক নির্যাতন শুরু করেন। আর্থিক লেনদেনে অনিয়মের বিষয়টি সামনে এক পর্যায়ে চাকরি হারান তিনি। কয়েক লাখ টাকা ঋণের বোঝা নিয়ে ঘোর বিপাকে পড়ে এখন প্রায় নিঃস্ব তিনি।
রফিকের স্ত্রী জানান, সংসারের ঘানি টানতে তিনি এখন ঢাকার গাজীপুরে একটি গার্মেন্টেসে চাকরি নিয়েছেন। সেখানে তিনি তার ভাইয়ের বাড়িতে মেয়েকে নিয়ে থাকেন। আর রফিক তার দেশের বাড়ি রংপুরে থাকে।
রফিকের মতোই নগরের হাউজিং এস্টেট এলাকার বাসিন্দা মারজান (ছদ্মনাম)। তিনি বিলেত থেকে ফিরে ঘটা করে বিয়ে করেন। নতুন সংসার। বিয়ের কিছুদিন যেতেই সংসারে অমনযোগী হয়ে পড়েন। রাতে বের হলে বাসায় দেরিতে ফেরেন। পরিবার থেকে খোজ নিয়ে জানতে পারেন কিছু অসৎ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে মাদক সেবন ও অনলাইন জুয়ায় (ওয়ান এক্স বেট, বেট ৩৬৫) আসক্ত হয়েছেন তিনি।
এরকম হাজারো তরুণ অনলাইন জুয়া খেলায় আসক্ত হয়ে নি:স্ব হচ্ছেন। স্মার্টফোন আর সহজ ইন্টারনেট সুবিধাকে পুঁজি করে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে অনলাইনে জুয়া খেলার প্রবণতা। বিশেষ করে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রলোভনে জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন বেটিং অ্যাপ ও জুয়ার ওয়েবসাইটে। এতে পরিবারে অশান্তি, আর্থিক সংকট, অপরাধপ্রবণতা ও সামাজিক অবক্ষয় বাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক খেলাকে কেন্দ্র করে অনলাইন বেটিংয়ের বিস্তার বেশি ঘটছে। বাংলাদেশ থেকে অনলাইন স্পোর্টস বেটিং সাইট, যেমন ইবঃ৩৬৫, ১ীইবঃ, গবষনবঃ ইত্যাদি। ই- স্পোর্টস বেটিং সাইট হলো উড়ঃধ ২, ঈঝ:এঙ, চটইএ, খবধমঁব ড়ভ খবমবহফং ইত্যাদি গেমে ফলাফলের ওপর বাজি ধরা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, ইউটিউব ভিডিও এবং বিভিন্ন টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে তরুণদের জুয়ার দিকে টেনে নেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শুরুতে অল্প কিছু টাকা জিতিয়ে পরে বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশে শতাধিক অনলাইন জুয়ার সাইট ও অ্যাপ সক্রিয় রয়েছে। এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে লাখো মানুষ জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সহজে অর্থ আয়ের মানসিকতা এবং বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে চক্রগুলো তরুণদের টার্গেট করছে।
সিলেট নগরের কয়েকজন অভিভাবক জানান, অনেক তরুণ রাত জেগে মোবাইলে গেম খেলার আড়ালে অনলাইন বেটিংয়ে আসক্ত হয়ে পড়ছে। কেউ কেউ পরিবারের অজান্তে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করছে। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে চুরি, প্রতারণা ও ঋণের ঘটনাও বাড়ছে। বিটিআরসিকে এসব অনলাইন জুয়ার সাইট বন্ধ করে দেওয়া দাবি জানিয়েছেন তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কলেজ শিক্ষার্থী জানায়, বন্ধুদের মাধ্যমে সে অনলাইন বেটিংয়ে জড়িয়ে পড়ে। প্রথমদিকে কিছু টাকা জিতলেও পরে কয়েক মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা হারিয়েছে। এখন সে মানসিক চাপে ভুগছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে অনলাইন জুয়া ও সাইবার প্রতারণার সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একই সঙ্গে অবৈধ জুয়ার সাইট বন্ধে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আইন শৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, আমরা অভিযোগ কিংবা সুস্পষ্ট তথ্য পেলে ব্যবস্থা নিতে পারি। অনলাইনে জুয়া খেলা স্মার্টফোন ব্যবহার করে যে কেউ, কোনো জায়গায় খেলতে পারে। এরজন্য আইনী পদক্ষেপের সঙ্গে পারিবারিক নজরদারি এবং শৃঙ্খলা অনেক বেশি জরুরী বলে মনে করেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (গণ্যমাধ্যম) মনজুরুল আলম।
তিনি বলেন, ‘অনলাইন গেইমে তরুণদের আসক্তি বাড়েছে। আমরা সুস্পষ্ট তথ্য বা অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নিতে পারি। কারো কাছে তথ্য থাকলে আমাদের তা দিয়ে সহযোগিতা করার অনুরোধ করছি। তবে এ সমস্যা সমাধানে পরিবারের ভূমিকাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, অনলাইন জুয়া আসক্তি মানসিকতায় বিরূপ প্রভাব ফেলে। অনলাইন জুয়া দ্রুত আসক্তি তৈরি করে, কারণ এটি ঘরে বসে ২৪ ঘণ্টা খেলা সম্ভব। তরুণদের সৃজনশীল কর্মকা-ে সম্পৃক্ত করা, পরিবারে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরী। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
তাদের মতে, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে অনলাইন জুয়ার ভয়াবহতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় সামাজিক সংকট হয়ে দাঁড়াতে পারে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহ মো. আতিকুল হক বলেন, ‘শিশুদের বড় হওয়ার সময়টা একটা সুন্দর পারিবারিক বলয়ের প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখের বিষয় এখন বাচ্চারা বড় হয় মা বা ভাই বোন সবার হাতে মোবাইল দেখে। এভাবে ধীরে ধীরে আমাদের পারিবারিক শেয়ারিংয়ের জায়গা অনেকটা কমে এসেছে। পরিবারে কাউকে সে বন্ধু হিসেবে নিতে পারছে না, সমস্যার কথা বলতে পারছে না। ছেলে মেয়েরা তাই মোবাইলেই ঝুঁকছে। অনেকেই মোবাইলে অনলাইনে জুয়া খেলায় আসক্ত হচ্ছেন।
এ সমস্যার সমাধানের উপায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ সমস্যা সমাধানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে সামজিক প্রতিষ্ঠান। আর সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রথমত পরিবার ও দ্বিতীয়ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সমস্যাটি আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের প্রকাশ। এটি ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে, যা সামাজিকভাবেই সমাধান করতে হবে। অভিভাবক ও পরিবারের সদস্যদের সন্তানদের সময় দিতে হবে, কেউ জুয়ায় আক্রান্ত হলে তাকে কাউন্সিলিং করে ফিরিয়ে আনতে হবে।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
নিউজ ডেস্ক 








