বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৪৬ অপরাহ্ন

ভ্যাট নিবন্ধন আছে, রাজস্বে নেই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের অবদান

অর্থনীতি ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪/১১/২০২৬ ১১:০০:০৭ পূর্বাহ্ন

ভ্যাট নিবন্ধন আছে, রাজস্বে নেই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের অবদান


দেশে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আট লাখের বেশি। কিন্তু বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন থাকলেও তাদের বড় একটি অংশের কাছ থেকে রাজস্ব পাচ্ছে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কেউ নির্ধারিত সময়ে ভ্যাট রিটার্ন জমা দিচ্ছে না, আবার রিটার্ন জমা দেওয়া অনেক প্রতিষ্ঠান দেখাচ্ছে শূন্য ভ্যাট। ফলে কাগজে-কলমে ভ্যাট ব্যবস্থার আওতা বিস্তৃত হলেও বাস্তবে রাজস্ব আদায়ে তার প্রতিফলন কতটা ঘটছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের গোয়েন্দা পর্যালোচনায় এ চিত্র উঠে এসেছে।

ভ্যাট গোয়েন্দার প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই মাসে দেশে নিবন্ধিত ৮ লাখ ৩০ হাজার ২৩২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৭ লাখ ৪১ হাজার ৭৪৫টি প্রতিষ্ঠান হয় কোনো ভ্যাট প্রদর্শন করেনি, নয়তো রিটার্ন জমা দেয়নি। অর্থাৎ ওই মাসে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের ৮৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ রিটার্ন জমা দেয়নি অথবা শূন্য রিটার্ন দিয়েছে। বিপরীতে মাত্র ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠান রিটার্নে ভ্যাট দেখিয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, জুলাই মাসে ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৩৭৪টি প্রতিষ্ঠান কোনো রিটার্নই জমা দেয়নি। মোট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের হিসাবে এ হার ৬৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ। অন্যদিকে, ওই মাসে রিটার্ন জমা দেওয়া ২ লাখ ৬১ হাজার ৮৫৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩৭১টি প্রতিষ্ঠান শূন্য রিটার্ন দিয়েছে। অর্থাৎ রিটার্ন জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোরও বড় একটি অংশের হিসাবে কোনো ভ্যাট প্রদর্শিত হয়নি।

সব মিলিয়ে জুলাই মাসে মাত্র ৮৮ হাজার ৪৮৭টি প্রতিষ্ঠান রিটার্নে ভ্যাট দেখিয়েছে। ভ্যাট ব্যবস্থায় বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন থাকার পরও তাদের অধিকাংশের কাছ থেকে রাজস্ব না আসার বিষয়টি এনবিআরের জন্য বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে ভ্যাট গোয়েন্দার ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, “ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ রিটার্ন জমা না দেওয়া বা শূন্য রিটার্ন দেওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। তবে শূন্য রিটার্ন দেওয়া মানেই যে প্রতিষ্ঠান ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে, তা নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ থাকলে বা নির্দিষ্ট সময়ে করযোগ্য লেনদেন না থাকলে শূন্য রিটার্ন দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু নিয়মিত ব্যবসা পরিচালনা করেও কোনো প্রতিষ্ঠান রিটার্ন না দিলে বা প্রকৃত লেনদেন গোপন করে শূন্য রিটার্ন দিলে তা অনিয়মের পর্যায়ে পড়তে পারে।”

তিনি আরও বলেন, এ কারণে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত অবস্থা যাচাই, রিটার্ন জমা না দেওয়ার কারণ অনুসন্ধান এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরীক্ষার আওতায় আনা প্রয়োজন। এতে ভ্যাট ফাঁকি শনাক্ত করার পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ের পরিধিও বাড়ানো সম্ভব হবে। নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়মিত যাচাই না করলে ভ্যাটের আওতা বাড়লেও রাজস্ব আদায় বাড়বে না।

ওই কর্মকর্তা বলেন, এ ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে নিবন্ধন হালনাগাদ, রিটার্ন জমা না দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে নোটিশ দেওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের লেনদেন নিরীক্ষার আওতায় আনা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

ভ্যাট গোয়েন্দার প্রতিবেদন পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, জুলাই মাসে দেশে মোট ভ্যাট জমা হয়েছে ৩ হাজার ২৬৬ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে ২ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা এসেছে মাত্র ৩৩৭টি প্রতিষ্ঠান থেকে। অর্থাৎ নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের মাত্র শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ দিয়েছে ওই মাসে আদায় হওয়া মোট ভ্যাটের প্রায় ৮০ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

অন্যদিকে, বাকি ৮ লাখ ২৯ হাজার ৮৯৫টি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভ্যাট জমা হয়েছে প্রায় ৬৩১ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানসংখ্যার অনুপাতে হিসাব করলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে মাসে গড়ে জমার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭ হাজার ৬০০ টাকা। তবে এই গড়ের মধ্যে রিটার্ন জমা না দেওয়া এবং শূন্য রিটার্ন দেওয়া প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। ফলে এ হিসাব প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ভ্যাট পরিশোধের পরিমাণ নির্দেশ করে না।

বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ-ভ্যাট) পর্যায়েও রিটার্ন জমা না দেওয়ার চিত্র পাওয়া গেছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। সবচেয়ে বড় করদাতা হিসেবে বিবেচিত এই ইউনিটে নিবন্ধিত ১১১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জুলাই মাসে রিটার্ন জমা দিয়েছে ৮৭টি। বাকি ২৪টি প্রতিষ্ঠান রিটার্ন জমা দেয়নি। অথচ ওই মাসে এলটিইউ-ভ্যাট কমিশনারেটের ভ্যাট আদায়ের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৪২৮ কোটি টাকার বেশি। বড় করদাতা প্রতিষ্ঠানের একটি অংশের রিটার্ন না দেওয়ার ঘটনা এ খাতের তদারকি ও অনুসরণের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এই কমিশনারেটের আওতায় থাকা ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৩৫টি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে জুলাই মাসে রিটার্ন জমা দিয়েছে মাত্র ৩৫ হাজার ৮০৫টি। অর্থাৎ নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৪ শতাংশ রিটার্ন জমা দিয়েছে। ওই মাসে ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ১৯১ কোটি টাকা।

ঢাকা পশ্চিম ভ্যাট কমিশনারেটের অধীনে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯০ হাজার ১১২টি। জুলাই মাসে এই কমিশনারেটে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৮২ কোটি টাকা। এ কমিশনারেটের রিটার্ন জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১৯ হাজার ৪৬৬টি শূন্য রিটার্ন দিয়েছে। অধিদপ্তরের পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে, রিটার্নদাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শূন্য রিটার্ন জমা দেওয়ার হার প্রায় ৭০ শতাংশ।

পর্যটননির্ভর কক্সবাজারের ভ্যাট আদায়ের চিত্রও উদ্বেগজনক। সেখানে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১২ হাজার ৩৩৫টি। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে জুলাই মাসে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৭ কোটি টাকার কিছু বেশি। ওই মাসে ১ কোটি টাকার বেশি ভ্যাট দিয়েছে, এমন কোনো প্রতিষ্ঠান পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া রিটার্ন জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ৬৪ শতাংশ শূন্য রিটার্ন দিয়েছে।

রাজশাহী, রংপুর ও যশোর ভ্যাট কমিশনারেটেও শূন্য রিটার্ন জমা দেওয়ার হার বেশি। এসব এলাকায় রিটার্ন জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬৮ থেকে ৭৩ শতাংশ কোনো ভ্যাট প্রদর্শন করেনি।

নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ কেন রিটার্ন জমা দিচ্ছে না কিংবা শূন্য রিটার্ন দিচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কতটি বাস্তবে ব্যবসা পরিচালনা করছে, কতটি নিষ্ক্রিয় এবং কতটির নিবন্ধন হালনাগাদ বা বাতিল করা দরকার, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা না থাকলে প্রকৃত রাজস্ব সক্ষমতা নিরূপণ কঠিন হবে বলে মনে করছে ভ্যাট গোয়েন্দা।

এ কারণে ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মুহম্মদ জাকির হোসেন সম্প্রতি এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে একটি চিঠি দিয়েছেন বলে জানা গেছে। পুরো বিষয়টি অবগত করা এবং পরবর্তী প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের জন্যই ওই চিঠি দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, এনবিআর সূত্র বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সংস্থাটির রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। এ সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৯২ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা।

রাজস্ব আদায়ের প্রধান তিনটি খাত মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), আয়কর এবং আমদানি-রপ্তানি শুল্ক কোনোটিতেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি দেখা গেছে ভ্যাট আদায়ে। চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৯ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা। ফলে এ খাতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৫৭ কোটি টাকা।

ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দিতে চলতি অর্থবছর থেকে প্রতি মাসের পরিবর্তে তিন মাস অন্তর ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার বিধান চালু করেছিল এনবিআর। এর আগে প্রতি মাসে রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। তবে ব্যবসায়ীদের আপত্তি এবং ভ্যাট আদায়ে স্থবিরতার প্রেক্ষাপটে গত সেপ্টেম্বর থেকে আবারও মাসভিত্তিক রিটার্ন দাখিলের নিয়মে ফিরে এসেছে সংস্থাটি।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর