বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:১১ পূর্বাহ্ন

১৫ হাজার টাকার বেতনে সংসার চলে না, ৩০ হাজারের দাবিতে রাজপথে পোশাকশ্রমিক

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪/১১/২০২৬ ১০:৪৫:৩৮ পূর্বাহ্ন

১৫ হাজার টাকার বেতনে সংসার চলে না, ৩০ হাজারের দাবিতে রাজপথে পোশাকশ্রমিক


প্রতিদিনের পরিশ্রমে তৈরি করেন বিশ্ববাজারের জন্য পোশাক। অথচ সেই পোশাক তৈরির কারিগরদের অনেকেরই নিজের পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত খাবার জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ঢাকার কাছের ‘ভার্চুয়াল বটমস লিমিটেড’ নামের একটি তৈরি পোশাক কারখানার অভিজ্ঞ সেলাই অপারেটর লাইলী বেগমের মাসিক আয় প্রায় ১৫ হাজার টাকা বা ১২১ ডলার। অতিরিক্ত সময় কাজ করলে কখনো কখনো তাঁর আয় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা বা ১৪৫ থেকে ১৬১ ডলারে পৌঁছায়। কিন্তু এই আয় দিয়ে দুই সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালানো তো দূরের কথা, পরিবারের খাবারের জোগান দিতেও তাঁকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

৩৭ বছর বয়সী লাইলী বেগমের পক্ষে সংসারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পড়াশোনার ব্যয় বহন করতে না পারায় চলতি বছরের শুরুর দিকে তাঁর ১৫ বছর বয়সী মেয়ে ও ১২ বছর বয়সী ছেলে স্কুল থেকে ঝরে পড়েছে।

আল জাজিরাকে লাইলী বেগম বলেন, ‘আমরা দিনে এক বেলা ঠিকমতো খাবার খাওয়ার খরচই কুলিয়ে উঠতে পারি না। আজ সকালে আমরা শুধু মুড়ি আর চানাচুর খেয়েছি। দুপুরে খাওয়ার মতো কিছুই ছিল না। রাতে এক বেলা পেটপুরে খাওয়ার আশায় পুরো দিন আমাদের অভুক্তই থাকতে হচ্ছে। গতকালও পরিস্থিতি এমনই ছিল। এভাবেই এখন আমরা কোনোমতে বেঁচে আছি।’

নিজের সন্তানের শারীরিক অবস্থার কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলেটা এত শুকিয়ে গেছে যে, বুকের পাঁজরগুলো গুনে বলা যায়। আমি আর কী-ই বা করতে পারি?’

লাইলী বেগমের মতো বাংলাদেশে আনুমানিক ৪০ লাখ পোশাকশ্রমিক রয়েছেন। তাঁদের অর্ধেকেরও বেশি নারী। বেতন বাড়ানোর দাবিতে তাঁরা এখন আন্দোলন করছেন।

চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ বাংলাদেশ। এইচ অ্যান্ড এম, জারা, লেভি স্ট্রস, ওয়ালমার্ট ও প্রাইমার্কের মতো বৈশ্বিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর পোশাক সরবরাহের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র বাংলাদেশ। গত অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাত থেকে দেশটির আয় হয়েছে ৩ হাজার ৯০০ কোটি মার্কিন ডলার, যা মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি।

বিশ্ববাজারের জন্য বিপুল পরিমাণ পোশাক তৈরি করলেও এই শিল্পের শ্রমিকদের অভিযোগ, তাঁদের প্রাপ্ত মজুরি দিয়ে ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।

১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশে পোশাকশ্রমিকদের বেতন বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তুলনামূলকভাবে কম্বোডিয়ায় পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ২১০ মার্কিন ডলার। ভিয়েতনামে তা ১৪০ থেকে ২১০ ডলারের মধ্যে। আর চীনের উৎপাদনকেন্দ্র গুয়াংডংয়ে মজুরির হার ২৮৬ থেকে ৩৭৮ ডলার।

ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শ্রমিকদের আর্থিক সংকট আরও বেড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় সংসার চালাতে না পেরে তাঁরা কাজ বন্ধ রেখে রাস্তায় নেমেছেন। ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) থেকে তাঁদের আন্দোলন শুরু হয়।

রোববার (১ নভেম্বর) ঢাকার কাছের আশুলিয়ার জামগড়ায় আয়োজিত এমনই এক বিক্ষোভে অংশ নেন লাইলী বেগম। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে এবং বহু শ্রমিককে গ্রেপ্তার করে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) জানিয়েছে, রোববারের আন্দোলনের কারণে ৫২৯টি কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়। এতে প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক প্রভাবিত হন।

একই দিন শ্রমিকদের মজুরির দাবি পর্যালোচনার জন্য ছয় সদস্যের একটি মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেয় সরকার। তবে এই ঘোষণার পরও শ্রমিকদের আন্দোলন থামেনি। সোমবার (২ নভেম্বর) টানা তৃতীয় দিনের মতো তাঁরা আবারও রাজপথে নামেন। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত ছিল।

ঢাকার উত্তরের গাজীপুর এলাকায় শ্রমিকেরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন। পাশাপাশি প্রতিবেশী মিরপুর এলাকা থেকেও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়।

সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া আশ্বাস নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে লাইলী বেগম আল জাজিরাকে বলেন, ‘সরকার শুধু আশ্বাসই দেয়। মজুরি কখন বাড়বে এবং কতটা বাড়বে, তা তারা আমাদের এখনো জানায়নি।’

আশুলিয়ার ৩০ বছর বয়সী পোশাকশ্রমিক রাসেল খানের অবস্থাও প্রায় একই। আল জাজিরাকে তিনি জানান, অতিরিক্ত সময় কাজসহ তাঁর মাসিক আয় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। কিন্তু এই অর্থ দিয়ে মা, ছোট ভাই, স্ত্রী ও সন্তানসহ পুরো পরিবারের ব্যয় চালানো আর সম্ভব হচ্ছে না।

জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় সংসার চালাতে গিয়ে ইতোমধ্যে প্রায় এক লাখ টাকা ঋণগ্রস্ত হয়েছেন রাসেল। তিনি বলেন, ‘এই আয়ে পরিবার চালানো এখন অসম্ভব। জিনিসপত্রের দাম বেড়েই চলেছে, শুধু বেঁচে থাকার জন্যই আমাদের ঋণ করতে হচ্ছে।’

পোশাক খাতের সর্বশেষ সর্বনিম্ন মজুরি পুনর্বিবেচনা করা হয়েছিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। এরপর থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত খাতে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ।

লাইলী বেগম জানান, মা ও সন্তানদের নিয়ে একটি ঘরে থাকতে তাঁকে সাড়ে তিন হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। সিরাজগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে থাকা তাঁর বাবাও লাইলীর আয়ের ওপর নির্ভরশীল। রান্নার জ্বালানি কেনার সামর্থ্য না থাকায় তাঁকে কুড়িয়ে আনা কাগজ ও অন্যান্য বর্জ্য পুড়িয়ে রান্না করতে হচ্ছে। কারণ, প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকা দামের গ্যাস সিলিন্ডার কেনার সামর্থ্য তাঁর নেই।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, গত পাঁচ বছর ধরে চলা মূল্যস্ফীতি কম আয়ের শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিয়েছে।

আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘যখন প্রকৃত আয় কমে যায়, তখন তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান কাটছাঁট করতে হয়। তাদের কোনো বাড়তি আয় বা সঞ্চয় থাকে না।’ সম্প্রতি সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর ফলে বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের মধ্যেও একই ধরনের বেতন বৃদ্ধির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, এটি একটি ‘অনুকরণীয় প্রভাব’ তৈরি করেছে।

মজুরি পর্যালোচনার সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করার লক্ষ্যে শ্রম আইন সংশোধনের পর সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেয়। বর্তমান তিন বছরের মেয়াদ ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে।

শ্রমিকদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর রোববার (১ নভেম্বর) শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অন্যদিকে, সোমবার (২ নভেম্বর) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাক কারখানার মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। আলোচনার মাধ্যমে নতুন সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণের আশ্বাস দেন তিনি।

এরই মধ্যে শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, মজুরি বোর্ড দ্রুতই কাজ শুরু করবে।

বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আক্তার ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাসের বেতন থেকেই নতুন মজুরি কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের কাজে ফেরার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি গ্রেপ্তার শ্রমিকদের মুক্তি এবং তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবিও তুলেছেন তিনি।

একদিকে শ্রমিকেরা মজুরি বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছেন, অন্যদিকে কারখানাগুলোকে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতা সামলাতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এখন বড় সংকটের মুখে। এমন এক পরিস্থিতিতেই শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) কর্মকর্তা এবং কিউট ড্রেস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ হোসেন মুহাম্মদ মুস্তাফিজ আল জাজিরাকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা বজায় রাখার পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও কর্মসংস্থানের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, শ্রমিকেরা সম্মানজনক জীবনযাপনের উপযোগী মজুরি পাওয়ার অধিকারী। তবে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর কাছ থেকে পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পেলে হঠাৎ করে বড় ধরনের মজুরি বৃদ্ধি কারখানাগুলোর ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করতে পারে। এতে কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

মুস্তাফিজ আরও বলেন, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির মধ্যে শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখার দায়িত্ব শুধু কারখানার মালিকদের নয়; বাংলাদেশি পোশাক কেনা বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোকেও এই দায়িত্ব নিতে হবে। কেবল উৎপাদকদের পক্ষে টেকসই মজুরি বৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার নিরাপত্তা এবং শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকে ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ ও দায়িত্বশীল ক্রয়নীতির মাধ্যমে ভূমিকা রাখতে হবে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ল্যারেন্ডন স্কলার ও মানবাধিকারবিষয়ক আইনজীবী তাকবীর হুদা বাংলাদেশ থেকে পোশাক কেনা পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলোর বিরুদ্ধে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে উদাসীন থাকার অভিযোগ তুলেছেন।

আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি রাতারাতি বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে এমন একটি পক্ষই সবচেয়ে বেশি শোষণমূলক ভূমিকা পালন করে আসছে। আর ওই পক্ষ হলো পশ্চিমা ক্রেতা ব্র্যান্ডগুলো, যারা এই শ্রমিকদের তৈরি পোশাক থেকে অর্জিত মূল্যের সিংহভাগ নিজেদের ঝুলিতে পুড়ছে।’

তাকবীর হুদা উল্লেখ করেন, চলতি বছরই মজুরি বোর্ড গঠনের কথা থাকলেও শ্রমিকেরা আন্দোলনে নামার পরই কেবল তা গঠন করা হয়েছে। তাঁর মতে, ইতিহাস থেকে বোঝা যায়, আন্দোলন ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি হবে এমন বিশ্বাস করার মতো কারণ শ্রমিকদের হাতে খুব কমই রয়েছে। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়সংকটের সমাধান না হলে শুধু মজুরি বোর্ড গঠন করে শ্রমিকদের দাবি পূরণ করা সম্ভব হবে না।

অন্যদিকে, নতুন মজুরি নির্ধারণের দীর্ঘসূত্রতার কারণে লাইলী বেগমের মতো শ্রমিকদের পরিবারকে আরও অপেক্ষা করতে হবে। পরিবারের সদস্যদের খাবার জোগানো ও বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম তাঁদের জন্য আরও দীর্ঘ হচ্ছে। আক্ষেপ করে লাইলী বেগম বলেন, ‘মজুরি বাড়তেই হবে, কিন্তু একই সঙ্গে খাবারের দামও কমাতে হবে।’

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর