মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৫৮ পূর্বাহ্ন

দিরাইয়ে উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, কাজের আগেই টাকা উত্তোলনের দাবি

আশরাফ উদ্দিন, দিরাই (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৩/১১/২০২৬ ০৯:২৭:০৪ পূর্বাহ্ন

দিরাইয়ে উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, কাজের আগেই টাকা উত্তোলনের দাবি


সরকারি বরাদ্দে রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কারের কথা থাকলেও কোথাও কাজের চিহ্ন নেই, কোথাও প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিই জানেন না তাঁর নাম ব্যবহার করে বরাদ্দ নেওয়ার কথা। ভাটির জনপদ সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা কর্মসূচির প্রকল্প ঘিরে এমন নানা অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও বিএনপি নেতাকর্মীদের দাবি, অনেক প্রকল্পে কাজ শুরু না করেই বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে এলাকায় সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এসব কর্মসূচি পরিচালিত হলেও দিরাইয়ে বরাদ্দের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। তাঁদের দাবি, স্থানীয় সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে থাকায় তাঁর অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগ আমলে সুবিধা পাওয়া কয়েকজনকে ঘিরে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের লোকজন সরকারি বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করলেও প্রকল্পের বাস্তব কাজ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে দিরাই উপজেলা ও পৌরসভায় টিআর, কাবিটা ও কাবিখা কর্মসূচির প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে মোট ১০৩টি প্রকল্পের বিপরীতে ২ কোটি ৫ লাখ টাকা, ৬৬ মেট্রিক টন চাল এবং ৬৮ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব প্রকল্পের অনেকগুলোতে কাজ শুরু না করেই বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। সরেজমিনে কয়েকটি প্রকল্প এলাকা ঘুরে কাজের দৃশ্যমান অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

করিমপুর ইউনিয়নের নাছিরপুরে আনোয়ারের বাড়ি থেকে তাজপুর কালভার্ট পর্যন্ত রাস্তা ইট-সলিংয়ের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। একই ইউনিয়নের টুক-দিরাইয়ে বসন্ত দাসের বাড়ি থেকে রুপেন রায়ের বাড়ি পর্যন্ত সিসিকরণ ও মাটি ভরাটের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৩ লাখ টাকা। হাসিম উল্লার বাড়ি থেকে নদীর পাড় পর্যন্ত রাস্তার জন্য দেওয়া হয়েছে ১২ মেট্রিক টন গম। তবে স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব প্রকল্প এলাকায় এখনো কাজের কোনো চিহ্ন নেই।

নাছিরপুর গ্রামের ষাটোর্ধ্ব আনফর মিয়া বলেন, তাঁদের গ্রামের নাম বহু আগে জননেতা নাছির উদ্দিন চৌধুরীর নামে রাখা হয়েছে। তাঁরা তাঁর ভক্ত ও সমর্থক। বিগত নির্বাচনেও তাঁকে বিপুল ভোট দিয়েছেন। তাঁর প্রত্যাশা ছিল, বরাদ্দের মাধ্যমে গ্রামের রাস্তাটির উন্নয়ন হবে। বরাদ্দ আসার কথা শুনলেও কাজ না করেই টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

টুক-দিরাই গ্রামের হাসিম উল্লার বাড়ি থেকে নদীর পাড় পর্যন্ত রাস্তার মাটি ভরাট প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের সেক্রেটারি হিসেবে উল্লেখ করা সফর আলীর দাবি, তাঁকে না জানিয়েই তাঁর নাম ওই পদে ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ রাস্তার পাশেই তাঁর বাড়ি। প্রকল্পের কাজ কে পেয়েছেন, সে বিষয়েও তিনি কিছু জানেন না বলে জানান।

রাজানগর ইউনিয়নের ফাতেমানগরে আঙ্গুর মিয়ার বাড়ি থেকে নদীর পাড় পর্যন্ত রাস্তার জন্য ১০ মেট্রিক টন চাল এবং ফাতেমানগর মাদ্রাসা মসজিদ থেকে পুরোনো খাদ্যগুদাম পর্যন্ত রাস্তার জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে গ্রামটির বাসিন্দা হেলাল আহমদের দাবি, দুটি রাস্তার কোনোটিতেই কাজ হয়নি।

এ বিষয়ে প্রকল্প সভাপতি ও উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জুনায়েদ মিয়া বলেন, বর্ষার কারণে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। এখন পানি কমে যাওয়ায় কয়েক দিনের মধ্যেই কাজ শুরু করা হবে।

উপজেলার ইউনিয়নগুলোর পাশাপাশি দিরাই পৌর এলাকাতেও এমপি বরাদ্দের প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। পৌর এলাকায় সংসদ সদস্যের বরাদ্দে তুলনামূলক বেশি প্রকল্প দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে পূর্ব চন্ডিপুর খেয়াঘাট মসজিদ থেকে খাতুনপুর পর্যন্ত মাটি ভরাটে ২ লাখ টাকা, দিরাই-শাল্লা সড়ক থেকে রাজাপুরে মামুন মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, আরামবাগ-মজলিশপুর প্রধান সড়ক থেকে ইলিয়াস মিয়ার বাড়ি হয়ে খাল পর্যন্ত ১ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং ধল সংযোগ সড়ক থেকে আয়লাবাজে হেলাল মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গোলাপ নগর থেকে দিরাই-মদনপুর সড়কের কর্ণগাঁও পর্যন্ত রাস্তার জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে এসব প্রকল্পে বরাদ্দের পরিমাণ ৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, তালিকাভুক্ত এসব রাস্তার কোনো দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি। চন্ডিপুর গ্রামের আবুল খায়ের বলেন, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অর্ধেক টাকা তুলে নিয়েছেন বলে তিনি শুনেছেন। অথচ এখনো কাজ শুরু হয়নি।

এদিকে দোওজের পাকা রাস্তা থেকে জসিম মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের অভিযোগ, রাস্তাটি মূলত একটি পরিবারের বাড়িতে যাওয়ার পথ।

দিরাই পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি জাহিদুর রহমান বলেন, এই রাস্তা গ্রামের সাধারণ মানুষের তেমন উপকারে আসবে না। একজন ব্যক্তির বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা নির্মাণে সরকারি অর্থ ব্যয় করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, তাঁদের এলাকায় সংসদ সদস্যের বরাদ্দে নেওয়া দুটি প্রকল্পে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ করে বাকি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভার মসজিদ, মাদ্রাসা, শ্মশান এবং রাস্তাঘাটের জন্য সংসদ সদস্যের বরাদ্দে নেওয়া প্রকল্পগুলোর অনেক জায়গায় দৃশ্যমান কোনো কাজ হয়নি।

দিরাই উপজেলা বিএনপির সদস্য সুমন মিয়া বলেন, তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করে প্রকল্পের তালিকা সংগ্রহ করেছেন তিনি। তালিকা পর্যালোচনা করে অনেক প্রকল্পে কাজ না হওয়ার বিষয়টি তাঁর নজরে এসেছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু সংসদ সদস্যের অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে একটি সিন্ডিকেট সরকারি বরাদ্দে অনিয়ম করছে। দীর্ঘ ১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা নির্যাতিত নেতাকর্মীরা কোনো কাজ পাননি বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সুবিধা পাওয়া ব্যক্তিরাই এখনো বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন।

দিরাই পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান বলেন, যেসব প্রকল্পে কাজ হয়নি, সেগুলোর দ্বিতীয় বিল যেন কোনোভাবেই দেওয়া না হয়, সে বিষয়ে তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন। সংসদ সদস্য চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে থাকায় তিনি দেশে ফিরলে তাঁর কাছেও বিষয়টি তুলে ধরবেন বলে জানান।

উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির তালুকদার বলেন, কাজ না করে এমপি বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করা অসম্ভব। সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরীর প্রতিনিধি হিসেবে তাঁরা কাউকে ছাড় দেবেন না।

উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আমির হোসেনও বলেন, কাজ না করে কেউ পার পাবেন না। এ ধরনের ঘটনায় উপজেলা বিএনপি কাউকে ছাড় দেবে না।

সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রশিদ চৌধুরী বলেন, প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করতেই হবে। কাজ না করে কেউ পার পাবেন না। অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে তাঁরা আগেও অবস্থান নিয়েছেন, ভবিষ্যতেও নেবেন।

অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মির্জা মো. আবু সাইদ বলেন, প্রকল্পগুলোর কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। কাজ না করে বিল নেওয়ার সুযোগ নেই। নিয়ম অনুযায়ী কাজ শুরু করার জন্য প্রকল্পপ্রধানদের অর্ধেক টাকা দেওয়া হয়েছে। দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য তাঁদের তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জীব সরকার বলেন, ইতোমধ্যে অনেক প্রকল্পের কাজ হয়েছে। যেহেতু এগুলো সংসদ সদস্যের বরাদ্দের প্রকল্প এবং তিনি চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে রয়েছেন, তাই তিনি দেশে ফেরার পর যেসব প্রকল্পের কাজ হয়নি, সেগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর