সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৫ অপরাহ্ন

দিরাই পৌরসভার ভেতরে ৪০ পরিবারের বসবাস

নেই বিদ্যুৎ ও পাকা সড়ক; বর্ষায় বাঁশের সাঁকো, হেমন্তে জমির আইলই ভরসা

দিরাই (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০২/১১/২০২৬ ০৯:২৮:৪১ পূর্বাহ্ন

নেই বিদ্যুৎ ও পাকা সড়ক; বর্ষায় বাঁশের সাঁকো, হেমন্তে জমির আইলই ভরসা


বিশ্বাস করারই উপায় নেই, এটি একটি পৌরসভার মধ্যকার আবাসিক এলাকা। মহল্লায় বসবাস করেন প্রায় ৪০টি পরিবারের সদস্যরা। অথচ এসব পরিবারের ঘরে এখনো পৌঁছায়নি বিদ্যুৎ। যাতায়াতের জন্য নেই স্থায়ী পাকা সড়কও। বর্ষায় দীর্ঘ বাঁশের সাঁকোই তাঁদের চলাচলের একমাত্র ভরসা। আর সন্ধ্যা নামলেই হারিকেন ও কুপির আলোয় কাটে রাত। এমন বাস্তবতা সুনামগঞ্জের দিরাই পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ভরারগাঁও উত্তরপাড়ার বাসিন্দাদের।

১৯৯৯ সালে দিরাই ইউনিয়ন পৌরসভায় উন্নীত হয়। পৌরসভা প্রতিষ্ঠার ২৭ বছর পরও এই মহল্লার বাসিন্দাদের দুর্ভোগের অবসান হয়নি। ৯টি ওয়ার্ড ও ২৯টি মহল্লা নিয়ে গঠিত দিরাই পৌরসভা। অথচ পৌরসভার মধ্যেই বসবাস করেও মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন ভরারগাঁও উত্তরপাড়ার মানুষ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে বিদ্যুৎ সংযোগ, রাস্তা ও নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থার দাবি জানিয়ে আসছেন তাঁরা। বিভিন্ন সময়ে জনপ্রতিনিধি ও নির্বাচনের প্রার্থীরা সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে স্থায়ী কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

সরেজমিনে দেখা যায়, ভরারগাঁও উত্তরপাড়ায় প্রায় ৪০টি পরিবারের বসবাস। অধিকাংশ বাসিন্দা কৃষিকাজ ও দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এলাকাটির সঙ্গে আশপাশের জনপদ ও মূল সড়কের যোগাযোগের জন্য বর্ষায় একটি দীর্ঘ বাঁশের সাঁকো ব্যবহার করতে হয়। আর হেমন্তে পানি শুকিয়ে গেলে জমির আইল ধরেই চলাচল করেন তাঁরা। অর্থাৎ বর্ষায় বাঁশের সাঁকো আর হেমন্তে জমির আইলই তাঁদের চলাচলের একমাত্র ভরসা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বাঁশের সাঁকো পারাপারের সময় বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও নারীদের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। বর্ষার সময় সাঁকো পিচ্ছিল হয়ে গেলে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকে। জরুরি প্রয়োজনে অসুস্থ ব্যক্তি বা গর্ভবতী নারীকে দ্রুত মূল সড়কে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে বলে জানান তাঁরা।

বিদ্যুৎ না থাকায় রাতের অন্ধকার দূর করতে এখনো হারিকেন ও কুপির ওপর নির্ভর করতে হয় বাসিন্দাদের। এতে মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়া, শিশুদের পড়াশোনা এবং দৈনন্দিন নানা কাজেও ভোগান্তিতে পড়তে হয় তাঁদের।

ভরারগাঁও উত্তরপাড়ার বাসিন্দা ইকরাম আলী বলেন, “আমরা পৌরসভার মধ্যে বসবাস করেও শহরের কোনো সুবিধা পাই না। বিদ্যুৎ নেই, ভালো রাস্তা নেই। বর্ষাকালে বাঁশের সাঁকো পার হয়ে চলাচল করতে হয়। বছরের পর বছর ধরে এসব সমস্যা থাকলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।”

আকরম আলী বলেন, “নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা এসে নানা প্রতিশ্রুতি দেন। বিদ্যুৎ দেবেন, রাস্তা করবেন—এমন কথা শোনা যায়। কিন্তু ভোট শেষ হলে আর তাঁদের দেখা পাওয়া যায় না।”

সাহেব আলী বলেন, “আমাদের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করে। রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় তাদের সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়। পৌর এলাকার বাসিন্দা হয়েও হারিকেনের আলোয় থাকতে হচ্ছে। হেমন্তে জমির আইল আর বর্ষায় সাঁকো দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে, এটা আমাদের জন্য খুবই কষ্টের।”

মহল্লার জুনাব আলী বলেন, “বর্ষাকালে বাঁশের সাঁকো পারাপার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের চলাচলে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়। একটি স্থায়ী সেতু হলে আমাদের অনেক সমস্যার সমাধান হতো।”

জাসাসের দিরাই পৌর শাখার সভাপতি মাসুদ চৌধুরী বলেন, ভরারগাঁও উত্তরপাড়ার মানুষের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। পৌরসভার একটি এলাকায় বছরের পর বছর মানুষ বিদ্যুৎ ও নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত থাকাটা দুঃখজনক।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দিরাই পৌর শহরের ভেতরে বসবাস করেও বছরের পর বছর মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকা তাঁদের জন্য হতাশার। তাঁদের দাবি, দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার পাশাপাশি বাঁশের সাঁকোর পরিবর্তে স্থায়ী সেতু এবং চলাচলের উপযোগী রাস্তা নির্মাণ করা হোক।

এ বিষয়ে দিরাই পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজীব সরকার বলেন, “বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। আমরা দেখব কী করা যায়।”

আজকের সিলেট / জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর