রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২৯ অপরাহ্ন

ছয় বছরেও শেষ হয়নি তাহিরপুর মডেল মসজিদ, ছয় মাস ধরে বন্ধ নির্মাণকাজ

তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৮/১০/২০২৬ ০৯:৪৯:৪৫ পূর্বাহ্ন

ছয় বছরেও শেষ হয়নি তাহিরপুর মডেল মসজিদ, ছয় মাস ধরে বন্ধ নির্মাণকাজ


সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ১১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কাজ ছয় বছরেও শেষ হয়নি। ১৮ মাসের মধ্যে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার কথা থাকলেও নানা জটিলতায় পিছিয়েছে প্রকল্পের সময়সীমা। এর মধ্যে গত ছয় মাস ধরে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে কাজ। ফলে আধুনিক মসজিদে নামাজ আদায়ের অপেক্ষায় থাকা স্থানীয় মুসল্লিদের স্বপ্ন যেন আটকে আছে নির্মাণাধীন ভবনের দেয়ালে।

উপজেলা পরিষদ চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদটির নির্মাণসামগ্রী পড়ে আছে, কিন্তু নেই নির্মাণশ্রমিকদের কর্মচাঞ্চল্য। কবে আবার কাজ শুরু হবে, কবে মিলবে নতুন মসজিদে নামাজ আদায়ের সুযোগ সেই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর জানা নেই স্থানীয়দের। দীর্ঘ অপেক্ষায় তাঁদের মধ্যে জমেছে ক্ষোভ ও হতাশা।

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা সদরে ১১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ব্যয়ে মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিশ্বাস বিল্ডার্স। চুক্তি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ৩ এপ্রিল কাজ শুরু করে ১৮ মাসের মধ্যে তা শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু জায়গা নির্ধারণ, পুরোনো মসজিদ ভাঙা, পুকুর ভরাট, করোনা মহামারি, বন্যা ও অর্থায়নসংক্রান্ত জটিলতায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করা যায়নি। পরে ২০২০ সালে শুরু হয় নির্মাণকাজ।

এরপর পেরিয়ে গেছে ছয় বছর। দীর্ঘ সময় ধরে ধীরগতিতে চলার পর গত ছয় মাস ধরে কাজ পুরোপুরি বন্ধ। সরেজমিনে দেখা গেছে, নির্মাণাধীন ভবনের আশপাশে পড়ে রয়েছে নির্মাণসামগ্রী। সেখানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাউকে পাওয়া যায়নি। একজন স্থানীয় বৃদ্ধকে নির্মাণসামগ্রী দেখাশোনা করতে দেখা গেছে। অন্যদিকে, মসজিদ চালু না হওয়ায় গত ছয় বছর ধরে টিনশেডের একটি অস্থায়ী ভবনে নামাজ আদায় করছেন মুসল্লিরা।

সুনামগঞ্জ জেলা গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সারা দেশে ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় ১২টি এবং জেলা সদরে একটি মোট ১৩টি মডেল মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব মসজিদ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১৮৫ কোটি টাকা। তবে বৃহৎ এই প্রকল্পের অংশ হয়েও তাহিরপুরের মসজিদটির নির্মাণকাজ এখনো শেষ করা যায়নি।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, মডেল মসজিদগুলোতে ইসলামিক প্রশিক্ষণ ও অটিজম সেন্টার, নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক নামাজের স্থান, সম্মেলনকক্ষ, অতিথিকক্ষ এবং ফুলের বাগানসহ বিভিন্ন সুবিধা থাকার কথা। এসব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার আশায় ছিলেন স্থানীয় মুসল্লিরা। কিন্তু বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও সেই প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় তাঁদের হতাশা বাড়ছে।

স্থানীয় মুসল্লি আব্দুস সালাম বলেন, মডেল মসজিদটি নির্মিত হলে সুন্দর ও পরিবেশবান্ধব জায়গায় নামাজ আদায়ের সুযোগ হতো। কিন্তু ছয় বছরেও কাজ শেষ হয়নি। গত বছর নির্মাণকাজের ধীরগতির প্রতিবাদে তাঁরা মানববন্ধন করেন। এরপর কিছুদিন কাজ চললেও এখন আবার ছয় মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। দ্রুত জটিলতা নিরসন করে নির্মাণকাজ শেষ করার দাবি জানান তিনি।

আরেক মুসল্লি শিপন মিয়া বলেন, সরকার এত টাকা বরাদ্দ দেওয়ার পরও মসজিদটি চালু করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণেই এত দিনেও নির্মাণকাজ শেষ হয়নি বলে মনে করেন তিনি। দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে মসজিদটি চালু করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান শিপন মিয়া।

স্থানীয় যুবক জুবায়ের আহমদ লিংকনের কণ্ঠেও একই হতাশা। তিনি বলেন, বিভিন্ন জায়গায় মডেল মসজিদের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে, কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। অথচ তাহিরপুরের মসজিদটির কাজ কবে শেষ হবে, তা অনিশ্চিত। ভালো কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নির্মাণকাজ শেষ করে মসজিদটি হস্তান্তরের দাবি জানান তিনি।

এদিকে নির্মাণকাজের দীর্ঘসূত্রতার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতিকে দায়ী করেছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন সুনামগঞ্জের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে তাহিরপুর উপজেলা মডেল মসজিদের নির্মাণকাজ অর্ধযুগেও শেষ হয়নি। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। তাঁর আশা, খুব দ্রুত নতুন ঠিকাদারের মাধ্যমে আবার নির্মাণকাজ শুরু হবে।

তবে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চলমান মামলার নিষ্পত্তির ওপর বলে জানিয়েছেন সুনামগঞ্জ গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, তাহিরপুর উপজেলা মডেল মসজিদ নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মামলা চলছে। মামলায় তাঁরা জয়ী হলে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করে অন্য কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হবে। দ্রুত কাজ শুরুর আশাও প্রকাশ করেন তিনি।

তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিপামনি দেবী বলেন, তিনি এ উপজেলায় নতুন যোগদান করেছেন। তাঁর বাসভবনের সামনেই মসজিদটির নির্মাণকাজ হচ্ছে। কাজ বন্ধ থাকতে দেখে তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাঁকে জানানো হয়েছে, দ্রুত আবার নির্মাণকাজ শুরু হবে।

কিন্তু আশ্বাস আর অপেক্ষার মধ্যেই কেটে যাচ্ছে সময়। ছয় বছর আগে যে মসজিদে নামাজ আদায়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন তাহিরপুরের মুসল্লিরা, সেটি এখনো নির্মাণাধীন। মামলা নিষ্পত্তি, নতুন দরপত্র কিংবা ঠিকাদার নিয়োগ যে পথেই হোক, দ্রুত কাজ শেষ করে মসজিদটি চালু হবে, এমন প্রত্যাশাই এখন স্থানীয়দের।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর