প্রভিশন ঘাটতিতে ব্যাংক খাত, ১৫ ব্যাংকের ঘাটতি ২ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা
বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:২১ PM

প্রভিশন ঘাটতিতে ব্যাংক খাত, ১৫ ব্যাংকের ঘাটতি ২ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা

অর্থনীতি ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০/০৯/২০২৬ ০৯:১৮:০৪ AM

প্রভিশন ঘাটতিতে ব্যাংক খাত, ১৫ ব্যাংকের ঘাটতি ২ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা


খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে ব্যাংকগুলোর আর্থিক চাপও বাড়ছে। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারায় চলতি বছরের জুন শেষে সরকারি-বেসরকারি ১৫টি ব্যাংকের সম্মিলিত প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৯ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ব্যাংক খাতের ইতিহাসে এত বড় ঘাটতি আর্থিক দুর্বলতার একটি বড় সংকেত।

ব্যাংক খাতে অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের ঘটনায় তৈরি সংকটের প্রভাব এখন সরাসরি পড়ছে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতার ওপর। নামে-বেনামে নেওয়া বিপুল ঋণের একটি বড় অংশ ফেরত না আসায় খেলাপি ঋণ লাগামহীনভাবে বেড়েছে। ফলে এসব ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন রাখার প্রয়োজনও বেড়েছে। কিন্তু আয় কমে যাওয়ায় অনেক ব্যাংক সেই প্রয়োজনীয় অর্থ সংরক্ষণ করতে পারছে না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি পাঁচটি ব্যাংকে মোট প্রভিশন ঘাটতি ৭৮ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘাটতি জনতা ব্যাংকের—৫০ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের ঘাটতি ১২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকে এই ঘাটতির পরিমাণ ১০ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংকে ৫ হাজার ৪৭ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে প্রায় ৩৩ কোটি টাকা।

রাষ্ট্রায়ত্ত এসব ব্যাংক খেলাপি ঋণের বিপরীতে বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় ঝুঁকির মাত্রা আরও বাড়ছে। পর্যাপ্ত ব্যাকআপ তহবিল না থাকায় আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন। এর ফলে ব্যাংকগুলোর মূলধন ভিত্তিও ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ১০টি বেসরকারি ব্যাংকের সম্মিলিত প্রভিশন ঘাটতি ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

এই তালিকায় সবচেয়ে বেশি ঘাটতি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে। একক ব্যাংক হিসেবে তাদের প্রভিশন ঘাটতি ৮২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। ন্যাশনাল ব্যাংকের ঘাটতি ২৩ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা এবং আইএফআইসি ব্যাংকের ২১ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা।

এ ছাড়া বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ঘাটতি ৬৪৫ কোটি টাকা, মার্কেটাইল ব্যাংকের ২ হাজার ৯৫ কোটি টাকা, এনআরবি ব্যাংকের ১৩০ কোটি টাকা, এনআরবিসি ব্যাংকের ৮২০ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংকের পবিসং ঘাটতি ১১ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৫ হাজার ৫ কোটি টাকা এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ২ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিস্থিতি পুরো বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে।

ব্যাংক খাতের সংকটের মূল কারণ হিসেবে খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত শিথিলতাকে চিহ্নিত করেছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তাঁর মতে, খেলাপি ঋণই মূল সমস্যা এবং খেলাপি ঋণ না থাকলে প্রভিশন ঘাটতিরও প্রয়োজন হতো না।

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, খেলাপিদের বারবার নীতিগত ছাড় দেওয়া এবং প্রভিশন ঘাটতি থাকার পরও লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ রাখার মতো সিদ্ধান্ত ব্যাংকিং খাতে ভুল বার্তা দিচ্ছে। তাঁর সতর্কতা, এ ধরনের আত্মঘাতী নীতির শেষ পরিণতিতে আমানতকারীদের অর্থ চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। সংকট কাটাতে ক্ষতিকর নীতিমালা বাতিলের পাশাপাশি ঋণ আদায় ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব বলছে, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই খেলাপি। সহজ হিসাবে, ব্যাংক থেকে ১০০ টাকা ঋণ দেওয়া হলে তার মধ্যে ৩৩ টাকা ৭৮ পয়সাই খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। এর সিংহভাগই আদায় অযোগ্য।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজ’-এর নির্বাহী পরিচালক ও মানারত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমানও ব্যাংক খাতের বর্তমান অবস্থার পেছনে অনিয়ম ও খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধিকে দায়ী করেছেন।

তাঁর ভাষ্য, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকা এক শ্রেণির প্রভাবশালী ব্যবসায়ী মূলত লুটপাটের উদ্দেশ্যেই ঋণ নেন এবং বছরের পর বছর তা পরিশোধ করেন না। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক এসব খেলাপিকে বারবার নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়ায় ঋণ পরিশোধ না করার একটি অপসংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।

ড. মো. মিজানুর রহমানের মতে, ব্যাংক খাতকে রক্ষা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় বড় খেলাপিদের তোষণ বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঋণের মান অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট হারে প্রভিশন রাখা বাধ্যতামূলক। সাধারণ ঋণের ক্ষেত্রে দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশ, নিম্নমানের খেলাপি ঋণে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক ঋণে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা লোকসানি ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়।

প্রভিশন ঘাটতি থাকলে ব্যাংক লভ্যাংশ দিতে পারে না। প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হলে ব্যাংক মূলধন ঘাটতির ঝুঁকিতেও পড়ে এবং ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘাটতি কমানোর কার্যকর পথ হলো খেলাপি ঋণ কমানো এবং ঋণ আদায়ের পরিমাণ বাড়ানো।

আজকের সিলেট/ডিপি/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর