বাহুবলে জি-নাইন কলায় সাফল্য, বাণিজ্যিক চাষে আগ্রহী কৃষকেরা
বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০৬ PM

বাহুবলে জি-নাইন কলায় সাফল্য, বাণিজ্যিক চাষে আগ্রহী কৃষকেরা

বাহুবল (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৩/০৯/২০২৬ ০৯:৩৫:০৭ AM

বাহুবলে জি-নাইন কলায় সাফল্য, বাণিজ্যিক চাষে আগ্রহী কৃষকেরা


উন্নত জাতের জি-নাইন (জি-৯) কলা চাষ করে সাফল্যের মুখ দেখেছেন হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার মিরপুর ইউনিয়নের পশ্চিম জয়পুর গ্রামের কৃষক মো. মতিন মিয়া। কৃষি বিভাগের কারিগরি সহায়তায় ৩০ শতক জমিতে করা তার প্রদর্শনী প্লট এখন স্থানীয় কৃষকদের আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ফলন, পরিচর্যা ও বাজারজাতকরণ সম্পর্কে জানতে প্রতিদিনই আশপাশের কৃষকেরা তার খেত দেখতে আসছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়ির সামনের প্রায় ৩০ শতক জমিতে সারিবদ্ধভাবে বেড়ে উঠেছে জি-নাইন জাতের কলাগাছ। অধিকাংশ গাছেই বড় বড় কলার ছড়া ঝুলছে। কয়েকটি গাছে আবার নতুন করে মোচাও বের হয়েছে। খেতের এমন দৃশ্য দেখে স্থানীয় কৃষকেরা এ জাতের কলার সম্ভাবনা সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছেন।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ফ্রিপ প্রকল্পের আওতায় গত বছরের নভেম্বর মাসে ওই জমিতে ৮০টি জি-নাইন কলার চারা রোপণ করেন মতিন মিয়া। জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে কলাগাছের পাশাপাশি সাথি ফসল হিসেবে মাসকালাই চাষ করেন তিনি। পরে মাসকালাই সংগ্রহ করে একই জমিতে লেবুর চারা রোপণ করেন।

কৃষক মো. মতিন মিয়া জানান, কৃষি অফিসের সহযোগিতাতেই তিনি নতুন এই জাতের কলা চাষ শুরু করেন। প্রয়োজনীয় চারাও কৃষি অফিস থেকে পেয়েছেন। পরিচর্যা, সারসহ অন্যান্য কাজে এ পর্যন্ত তার প্রায় ৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে গাছে গাছে কলার ছড়া এসেছে এবং কিছু কলা বিক্রিও শুরু করেছেন। এ জাতের চারা নিতে অনেকেই তার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। চলতি মৌসুমে কলা ও চারা বিক্রি করে লক্ষাধিক টাকা আয়ের আশা করছেন তিনি।

নতুন জাত হওয়ায় চাষের শুরুতে কিছুটা শঙ্কা কাজ করলেও পরে কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শ ও তদারকিতে কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি বলে জানান মতিন মিয়া। বিশেষ করে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শামিমুল হক শামীম নিয়মিত খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন।

উচ্চ ফলনের সম্ভাবনা জি-নাইনে

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শামিমুল হক শামীম বলেন, দেশে জি-নাইন জাতের কলা তুলনামূলক নতুন হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এটি জনপ্রিয়। বাহুবলের মিরপুর ইউনিয়নে প্রথমবারের মতো এ জাতের কলার প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে।

তিনি জানান, কৃষকের জন্য টিস্যু কালচারের চারা সংগ্রহ করে দেওয়া হয়েছে। চাষ শুরুর সময় থেকেই কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

শামিমুল হক বলেন, জি-নাইন উচ্চ ফলনশীল ও রফতানিযোগ্য জাতের কলা। অনুকূল পরিবেশে একটি ছড়ার ওজন আড়াই মণ পর্যন্ত হতে পারে। প্রতিটি ছড়িতে প্রায় ২০০ থেকে ৫০০টি কলা ধরে। যথাযথ পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে প্রচলিত অনেক জাতের তুলনায় জি-নাইন চাষ করে কৃষকেরা বেশি লাভবান হতে পারেন।

তবে টিস্যু কালচারের চারা নির্বাচনে বয়সের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, ল্যাবে চারা বেশি বয়সী হয়ে গেলে জমিতে রোপণের পর গাছ নির্ধারিত সময়ের আগেই ফলন দিতে শুরু করতে পারে। এতে প্রত্যাশিত উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই মানসম্মত এবং সঠিক বয়সের চারা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

বিটল পোকা ঠেকাতে ব্যাগিংয়ের পরামর্শ

বাহুবল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা চিন্ময় কর অপু বলেন, মিরপুর ইউনিয়নে জি-নাইন কলার প্রথম প্রদর্শনী সফল হওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে এ জাত চাষের আগ্রহ বেড়েছে। ইতোমধ্যে অনেক কৃষক জি-নাইন চাষের বিষয়ে কৃষি অফিসে যোগাযোগ করছেন। তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

তিনি জানান, কলা চাষে বিটল পোকার আক্রমণ একটি পরিচিত সমস্যা। এ পোকা কচি কলার ত্বক কুরে খাওয়ার কারণে পরে সেখানে কালো দাগ তৈরি হয়। এতে কলার গুণগত মান নষ্ট না হলেও বাহ্যিক সৌন্দর্য কমে যায়। ফলে অনেক সময় কৃষকেরা বাজারে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হন।

এ সমস্যা মোকাবিলায় কলায় ব্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন চিন্ময় কর অপু। তিনি বলেন, মোচা বের হওয়ার পর বিশেষ ব্যাগ দিয়ে কলার ছড়া ঢেকে দিলে বিটল পোকার আক্রমণ থেকে কলাকে সুরক্ষিত রাখা যায়। এতে অতিরিক্ত কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না। পাশাপাশি ব্যাগিং করা কলা দেখতে আকর্ষণীয় হওয়ায় বাজারে ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে।

নতুন জাত চাষে আগ্রহ বাড়ছে

স্থানীয় কৃষকেরা জানান, মো. মতিন মিয়ার খেতে জি-নাইন কলার ফলন ও গাছের অবস্থা দেখে তারা উৎসাহিত হয়েছেন। তাদের অনেকেই আগামী মৌসুমে নিজেদের জমিতে এই জাতের কলা চাষের পরিকল্পনা করছেন।

কৃষি বিভাগের কারিগরি সহযোগিতা ও পরামর্শ অব্যাহত থাকলে বাহুবল উপজেলায় জি-নাইন কলার বাণিজ্যিক চাষ আরও সম্প্রসারিত হবে বলে আশা করছেন স্থানীয় কৃষকেরা।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর