সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় সাত বছর বয়সী শিশু জাকিয়া আক্তার নিহাকে হত্যার পর মরদেহ সুরমা নদীতে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার সৎমা আম্বিয়া বেগমের (৫০) বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় পুলিশ আম্বিয়া বেগমকে আটক করেছে। নিহত শিশুটির বাবা তাজ উদ্দিন বাদী হয়ে আম্বিয়া বেগমসহ অজ্ঞাতনামা আরও দুই-তিনজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিকেলে উপজেলার কুরবাননগর ইউনিয়নের গোদারগাঁও এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়।
মামলার এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গোদারগাঁও গ্রামের রাজমিস্ত্রি তাজ উদ্দিনের প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি আম্বিয়া বেগমকে বিয়ে করেন। দ্বিতীয় বিয়ের পর থেকেই প্রথম পক্ষের সন্তানদের সঙ্গে আম্বিয়া বেগমের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিরোধ ছিল। তার বিরুদ্ধে শিশুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।
গত ১৭ আগস্ট সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয় শিশু নিহা। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, ওই সময় আম্বিয়া বেগম তাকে জোর করে সুরমা নদীতে গোসল করানোর কথা বলে নিয়ে যান। কিন্তু পরে নিহা একা বাড়িতে ফিরে না আসায় স্বজনদের মধ্যে সন্দেহ দেখা দেয়।
ঘটনার পরদিন ১৮ আগস্ট সুনামগঞ্জ সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল সুরমা নদীতে তল্লাশি শুরু করে শিশুটির সন্ধানে অভিযান চালায়। এর একদিন পর ১৯ আগস্ট সকাল ৬টার দিকে গৌরারং ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের কাছাকাছি সুরমা নদী থেকে ভাসমান অবস্থায় নিহার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের ডান উরুর ওপর ও নিচের অংশে দুটি গুরুতর কাটা জখমের চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনাস্থলে জিজ্ঞাসাবাদের সময় আম্বিয়া বেগম শিশুটিকে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেও আম্বিয়া তার সৎমেয়ে নিহাকে হত্যার পর বাড়ির পাশের সুরমা নদীতে ফেলে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে শিশুটিকে হত্যার পেছনে প্রকৃত কারণ কী ছিল, ঘটনার সঙ্গে আর কেউ জড়িত কি না এবং হত্যাকাণ্ডটি ঠিক কীভাবে সংঘটিত হয়েছে, এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। বর্তমানে আম্বিয়া বেগম সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানা পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। তাকে আদালতে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
সাত বছর বয়সী নিহার এমন মৃত্যুতে সুনামগঞ্জে আবারও শোক ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এর মাত্র এক সপ্তাহ আগেও পারিবারিক বিরোধের জেরে এক বাবার বিরুদ্ধে তার দুই শিশুসন্তানকে হত্যার অভিযোগ উঠেছিল।
পুলিশের তথ্যমতে, দিরাইয়ের চরনারচর ইউনিয়নের পেরুয়া মধুপুর গ্রামের কামরুল হাসান তার দুই সন্তান, সাড়ে তিন বছর বয়সী তুলনা আক্তার ও ছয় বছর বয়সী মুহাদ্দিসকে নিয়ে সিলেট থেকে দিরাই যাচ্ছিলেন। পথে তিনি পানির সঙ্গে শিশু দুটিকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ান বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে শান্তিগঞ্জের ডাবর এলাকায় ঘুমন্ত অবস্থায় মেয়ে তুলনাকে হাওরে ফেলে দেন তিনি। এরপর দিরাই সড়ক মোড় পার হয়ে একই হাওরে ছেলে মুহাদ্দিসকেও ফেলে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে শান্তিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ সদর থানা পুলিশ পৃথক স্থান থেকে দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে।
পুলিশের কাছে জিজ্ঞাসাবাদে কামরুল দাবি করেন, স্ত্রী আফরোজা বেগমের সঙ্গে পারিবারিক বিরোধের জের ধরেই তিনি নিজের দুই সন্তানকে হত্যা করেছেন। চার সন্তানের মধ্যে দুই শিশুকে হারানোর ঘটনায় ওই এলাকায় গভীর শোক নেমে আসে।
মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে সুনামগঞ্জে একাধিক শিশুর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু শিশুদের নিরাপত্তা, পারিবারিক বিরোধ এবং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্থানীয়দের মতে, শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পারিবারিক বিরোধ যাতে ভয়াবহ পরিণতিতে না গড়ায়, সে জন্য সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি 








