রক্তাক্ত আগস্টের দুই বছর: বিচার ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অপেক্ষায় সাত শহীদের পরিবার
বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ০১:২৪ PM

রক্তাক্ত আগস্টের দুই বছর: বিচার ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অপেক্ষায় সাত শহীদের পরিবার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৫/০৮/২০২৬ ১১:৪৪:৪৭ AM

রক্তাক্ত আগস্টের দুই বছর: বিচার ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অপেক্ষায় সাত শহীদের পরিবার


সময় গড়িয়েছে দুই বছর। কিন্তু গোলাপগঞ্জের সাতটি পরিবারের কাছে যেন ক্যালেন্ডার এখনও থমকে আছে ২০২৪ সালের সেই রক্তাক্ত আগস্টে। যে প্রিয়জনেরা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বুকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন, তারা আর ফেরেননি। দুই বছর পরও তাদের স্বজনদের চোখে একই প্রশ্ন— বিচার কবে, আর রাষ্ট্র কবে যথাযথভাবে স্মরণ করবে সাত শহীদের আত্মত্যাগকে? বিচার, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আর স্মৃতি সংরক্ষণের প্রত্যাশায় দুই বছর ধরে অপেক্ষা করছেন তারা। কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ কোথায় এ প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা।

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের উত্তাপে রক্তাক্ত হয়ে ওঠে সিলেটের গোলাপগঞ্জ। সেদিন সংঘর্ষে প্রাণ হারান ছয়জন। পরদিন ৫ আগস্ট সরকার পতনের দিন সিলেট নগরের ক্বীন ব্রিজ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান গোলাপগঞ্জের আরও এক তরুণ। মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় সাতটি প্রাণহানির এই ঘটনা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে গোলাপগঞ্জকে একটি রক্তাক্ত অধ্যায়ে পরিণত করেছে।

বুধবার সেই ঘটনার দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। সময়ের ব্যবধানে অনেক কিছু বদলালেও শহীদ পরিবারের চোখের জল, অপূর্ণ স্বপ্ন আর বিচারের আকাঙ্ক্ষা আজও একইভাবে রয়ে গেছে।

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে গোলাপগঞ্জের ঢাকা-দক্ষিণ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের সামনে থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। মিছিলটি লঞ্চঘাট, বাজার ও ইউনিয়ন সড়ক হয়ে গোলাপগঞ্জ চৌমুহনীর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। এর আগেই কলেজসংলগ্ন এলাকায় পুলিশ ও বিজিবি অবস্থান নেয়। মিছিল আটকে দেওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্র্যাক অফিস সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান নিয়ে পুলিশ ও বিজিবি আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি, টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এ সময় স্থানীয় মসজিদগুলো থেকে মাইকিংয়ের মাধ্যমে মানুষকে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হলে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মিছিলটি ঢাকা দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে আবারও নির্বিচারে গুলির ঘটনা ঘটে। এতে নিজ বাড়ির সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন তাজ উদ্দিন ও নাজমুল ইসলাম। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান জয় আহমদ ও সানি আহমদ।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দা ব্যবসায়ী ইমন বলেন, পুলিশ অতর্কিতভাবে হঠাৎ গুলির ছুঁড়ে। গুলির শব্দ শোনা মাত্র চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ জীবন বাঁচাতে দৌড়াতে শুরু করে। কয়েকজনকে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে থাকতে দেখি। সেই দিনের ভয়াবহ দৃশ্য আজও ভুলতে পারিনি। সেদিনকার হামলায়  নিহতরা হলেন- নাজমুল ইসলাম (২৪), জয় আহমদ (১৮), সানি আহমদ (২২), তাজ উদ্দিন (৩৯), মিনহাজ আহমদ (২৩) ও গৌছ উদ্দিন (৩৫)। ৪ আগস্টের রক্তাক্ত সংঘর্ষে ঢাকাদক্ষিণ ও গোলাপগঞ্জ চৌমুহনী মিলিয়ে প্রাণ হারান ছয়জন। পরদিন ৫ আগস্ট সিলেট নগরের ক্বীন ব্রিজ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন গোলাপগঞ্জের আরেক যুবক পাবেল আহমদ কামরুল। দুই দিনের সহিংসতায় গোলাপগঞ্জের মোট সাতজনের প্রাণহানি ঘটে, যা ওই সময়ের আন্দোলনের সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায়গুলোর একটি হিসেবে স্মরণ করা হয়।

দুই বছর আগে ঝরে যাওয়া সাতটি প্রাণের শোক আজও বয়ে বেড়াচ্ছে গোলাপগঞ্জ। শহীদ পরিবারের স্বজনদের একটাই প্রশ্ন—যে আত্মত্যাগ নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তার বিচার কবে মিলবে?

তাজ উদ্দিনের মা সুফিয়া বেগম বলেন, ছেলে আর ফিরবে না। শুধু চাই, তার হত্যার বিচার দেখে যেন মরতে পারি।

শহীদ গৌছ উদ্দিনের ভাই আবুল কালাম বলেন, দুই বছর পরও অপেক্ষার শেষ হয়নি। আমরা শুধু চাই, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত হোক। বিচারই হবে শহীদদের আত্মত্যাগের প্রকৃত সম্মান।

দুই বছর পেরিয়ে গেলেও শহীদ পরিবারের সদস্যদের কাছে সময় যেন থমকে আছে। ঈদ আসে, উৎসব আসে; কিন্তু ঘরের খালি চেয়ার আর প্রিয়জনের অনুপস্থিতি প্রতিনিয়ত তাদের মনে করিয়ে দেয় সেই রক্তাক্ত আগস্টের কথা।

শহীদ জয় আহমদের ভাই মনোয়ার হোসেন জানান বলেন, দুই বছর পার হলেও মামলার চার্জশিট হয়নি। অনেক আসামি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমরা প্রতিশোধ চাই না, শুধু সুষ্ঠু বিচার চাই। একই সঙ্গে সাত শহীদের স্মরণে গোলাপগঞ্জে একটি স্থায়ী স্মৃতিচত্বর নির্মাণের দাবি জানাই।

তিনি বলেন, আমার ভাই আর ফিরে আসবে না। কিন্তু বিচার হলে অন্তত মনে হবে তার রক্ত বৃথা যায়নি।

শহীদ পাবেল আহমদ কামরুলের বড় ভাই পিপলু আহমদ বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিহত সব শহীদের বিচার চাই। দ্রুত আসামিদের আইনের আওতায় আনা হোক। পাশাপাশি প্রতি বছর প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহীদদের কবর জিয়ারত ও স্মরণ কর্মসূচির উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

তিনি বলেন, রাষ্ট্র যদি শহীদদের সম্মান দেয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের আত্মত্যাগ সম্পর্কে জানতে পারবে।

তদন্তের অগ্রগতি, চার্জশিটের অপেক্ষা

ঘটনার পর একাধিক মামলা হলেও তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে নিহতদের স্বজনদের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় পার হলেও বিচারিক প্রক্রিয়া প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। তবে পুলিশ বলছে, জুলাই আন্দোলন সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।

এ ব্যাপারে সিলেট জেলা পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেক বলেন, জুলাই আন্দোলন সংশ্লিষ্ট ঘটনায় সিলেট জেলায় মোট ৩৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি হত্যা মামলা এবং ২৬টি অন্যান্য মামলা রয়েছে।

তিনি বলেন, ১১টি হত্যা মামলার মধ্যে জেলা পুলিশ তিনটি মামলার তদন্ত করছে। বাকি আটটি মামলা তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ২৬টি অন্যান্য মামলার মধ্যে ইতোমধ্যে ছয়টি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়েছে। বাকি ২০টি মামলার তদন্ত কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে। জেলা পুলিশের তদন্তাধীন তিনটি হত্যা মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, একটি মামলায় ১৫৫ জন, আরেকটি মামলায় ৭৫ জন এবং অপর একটি মামলায় ৫৫ জন এজাহারনামীয় আসামি রয়েছেন। এছাড়া প্রতিটি মামলায় ১৫০ থেকে ২০০ জন পর্যন্ত অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা ইতোমধ্যে অধিকাংশ মামলার তদন্ত অনেকটাই গুছিয়ে এনেছি। আশা করছি, আগামী দেড় মাসের মধ্যে হত্যা মামলাগুলোর তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে পারব। এরপর যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে তা আদালতে দাখিল করা হবে।

স্থানীয়দের দাবি, গোলাপগঞ্জের সাত শহীদের স্মৃতি সংরক্ষণে স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। নতুন প্রজন্মের কাছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস তুলে ধরতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, গবেষণা ও তথ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন তারা

এ বিষয়ে সিলেট-৬ (গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট গোলাপগঞ্জে সাত শহীদের আত্মত্যাগের পর এলাকার মানুষ ধীরে ধীরে সেই বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ করেছে। এ ঘটনায় একাধিক মামলা হয়েছে এবং সেগুলোর তদন্ত চলছে। সাতজন নিহত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মামলাগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হলে বিচার আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে বলে আমি আশা করি। শহীদদের স্মরণে গোলাপগঞ্জে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কাজ চলছে। এটি সম্পন্ন হলে প্রতি বছর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো সহজ হবে। পাশাপাশি সাত শহীদের প্রত্যেকের বাড়িতে যাওয়ার সড়ক তাদের নামে নামকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে এ কার্যক্রমের কিছু অংশ শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। তাদের কবর জিয়ারত, পরিবারের খোঁজখবর নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর