ষড়যন্ত্র গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকল্প হতে পারে না
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ০৭:২১ AM

ষড়যন্ত্র গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকল্প হতে পারে না

আজকের সিলেট ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০/০৭/২০২৬ ১০:৪৫:৩১ AM

ষড়যন্ত্র গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকল্প হতে পারে না


বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদেশি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ নতুন নয়। রাজনৈতিক নেতারা প্রায়ই এমন বক্তব্য দিয়ে জাতীয়তাবাদী আবেগকে উসকে দেন। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের সাম্প্রতিক বক্তব্য-বাংলাদেশের রাজনীতি ‘দিল্লির রিমোট কন্ট্রোলে’ চলছে-তেমন বক্তব্যেরই আরেকটি উদাহরণ। বক্তব্যটি রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে, তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এমন বক্তব্য এখন কেন দেওয়া হচ্ছে?

মাত্র কয়েক মাস আগেই জামায়াত বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোর অধীনে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছে। নির্বাচনী ফলাফল ও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাও মেনে নিয়েছে দলটি। অথচ এখন দলটি এমন এক বয়ান সামনে আনছে, যা সেই ব্যবস্থার বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে নয়াদিল্লি থেকে নিয়ন্ত্রিত হিসেবে চিত্রিত করার মাধ্যমে দলটি পরোক্ষভাবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের স্বায়ত্তশাসন এবং বৈধতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সম্ভবত এই বাগাড়ম্বরের মধ্যেই নিহিত রয়েছে দলটির রাজনৈতিক বার্তা।

মিয়া গোলাম পরওয়ারের বক্তব্য অনুযায়ী, যদি দেশের রাজনৈতিক গতিপথ সত্যিই কোনো বিদেশি শক্তি দ্বারা নির্ধারিত হয়ে থাকে, তাহলে এর অর্থ দাঁড়াল, নির্বাচিত সরকারের প্রকৃত ক্ষমতায়নের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। এ ধরনের বয়ান রাজনৈতিক দলের ওপর জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন করে।

জামায়াতের এই বয়ান এতটাই স্ববিরোধী, যা পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার দাবি রাখে। ভারতের নীতির সমালোচনা করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী হিসেবে ভারত তার ভৌগোলিক অবস্থান, বাণিজ্য, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং কূটনীতির মাধ্যমে অনিবার্যভাবে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং উপসাগরীয় দেশগুলোসহ অন্য বড় শক্তিগুলোর ব্যাপারেও তাদের প্রতিবেশীরা এমন অভিযোগ তুলতে পারে। প্রতিটি সার্বভৌম রাষ্ট্রই তার জাতীয় স্বার্থ পূরণের লক্ষ্যে বাহ্যিক পরিবেশকে নিজের মতো করে গড়ে তুলতে চায়।

তবে প্রভাব বিস্তার করা আর নিয়ন্ত্রণ করা এক জিনিস নয়। বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, বাণিজ্য ও সংস্কৃতি সবই নয়াদিল্লি থেকে পরিচালিত হয়-এমন দাবি কোনো সাধারণ দাবি হতে পারে না। এমন দাবির পক্ষে সমানভাবে জোরালো প্রমাণ প্রয়োজন। উদ্দেশ্যপূর্ণ রাজনৈতিক স্লোগান সমর্থকদের মনে অনুরণন তুলতে পারে, কিন্তু তা বাস্তবতার বিকল্প হতে পারে না।

নির্বাচনের পর থেকে জামায়াতের ইঙ্গিতপূর্ণ বিভিন্ন কথাবার্তাও সমানভাবে লক্ষণীয়। মাত্র পাঁচ মাস হলো বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। অথচ জামায়াতের বক্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে-তারা সাংবিধানিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের অবস্থান থেকে সরে আসছে। তারা বারবার আন্দোলন ও রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দেওয়ার দিকে ঝুঁকেছে। বিক্ষোভ প্রদর্শন এবং সরকারি নীতিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার বিরোধী দলগুলোর আছে। কিন্তু একটি নির্বাচিত সরকারকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে রাজপথে কর্মসূচি দিয়ে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।

যখনই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সংসদ থেকে রাজপথে, অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র থেকে নির্বাচনী কারসাজির দিকে মোড় নিয়েছে, তখনই বাংলাদেশকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। দশকের পর দশক ধরে চলা সংঘাত দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে, শাসনব্যবস্থাকে ব্যাহত করেছে এবং রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরো গভীর করেছে। গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ জানানোর পরিবর্তে সরকারগুলোকে যেখানে ক্রমাগত অস্থিতিশীলতার শিকার হতে হয়, সেই ধরনের রাজনীতিতে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে সবার সতর্ক থাকা জরুরি।

যদি কোনো রাজনৈতিক দল বিশ্বাস করে, তারা জনগণের আস্থা অর্জন করেছে, তা প্রমাণের জন্য ব্যালট বাক্সই চূড়ান্ত পরীক্ষা। গণতন্ত্রে গণসংহতির একটি স্থান আছে, কিন্তু তা নির্বাচনী বৈধতার বিকল্প হতে পারে না।

এখানে একটি পরিহাসও রয়েছে, যা উপেক্ষা করা যায় না। জামায়াত প্রায়ই বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্ক করে। কিন্তু কার্যত অন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মতো জামায়াতও সক্রিয়ভাবে আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা চায়। দলটি বিদেশে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। আংকারা, ইসলামাবাদ থেকে শুরু করে ওয়াশিংটন পর্যন্ত বিভিন্ন রাজধানীতে কূটনৈতিক বোঝাপড়া চেয়েছে। এ ধরনের সম্পৃক্ততা মোটেই অস্বাভাবিক বা আপত্তিকর নয়। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করে।

এই নীতি সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রয়োগ করা উচিত। যদি বিদেশি সরকার এবং আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে বৈধ হয়, তবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা বৈদেশিক সম্পর্ক বজায় রাখলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হয়ে উঠতে পারে না।

জামায়াতের সমসাময়িক রাজনীতিকেও তার ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাদের বিরোধিতা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অনস্বীকার্য অংশ হয়ে রয়েছে। সেই অবস্থান বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আদর্শের প্রতি দলটির অঙ্গীকার সম্পর্কে জনমতকে প্রভাবিত করে চলেছে। শুধু ইতিহাসই একটি দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, আবার তা জনস্মৃতি থেকে মুছেও ফেলা যায় না।

অর্থনৈতিক চাপ, সুশাসনের ঘাটতি, জননিরাপত্তার উদ্বেগ, সাংবিধানিক সংস্কার দাবি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বাংলাদেশকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে। এগুলো চ্যালেঞ্জ করার জন্য প্রয়োজন সারগর্ভ নীতিগত বিতর্ক এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্ব।

এই জটিল বিষয়গুলোকে বাহ্যিক কোনো ‘রিমোট কন্ট্রোল’-এর অভিযোগে অভিযুক্ত করা হলে তা দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। জোরালো সমালোচনা, তথ্য-প্রমাণভিত্তিক বিতর্ক এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গণতন্ত্র বিকশিত হয়। যখন বিশ্বাসযোগ্য যুক্তির পরিবর্তে ষড়যন্ত্রমূলক আখ্যান স্থান করে নেয়, অথবা যখন বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়া নির্বাচনী বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তখন গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে।

সব শেষে বলা দরকার, সরকার তার ক্ষমতা লাভ করেছে দেশের জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট থেকে। সেই ম্যান্ডেটকে চ্যালেঞ্জ করা, নবায়ন করা বা প্রত্যাহার করার মাধ্যম হলো নির্বাচন। কোনো ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বা সংঘাতের রাজনীতির মাধ্যমে নয়।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর